মানুষের মন মস্ত একটা জিনিস। ঠাকুরের মতের মতো মায়েরও মত: “মনেতেই সব।” সেকথা সারদাদেবী নিজের জীবন দিয়ে দেখিয়েছেন। একদিন সন্ধ্যার পরে শ্রীমা শুয়ে রয়েছেন। তাঁর পায়ে (হাঁটুতে) বাতের তেল মালিশ করছে কামিনী ঝি। মা বলে উঠলেন: “দেহ একটি, দেহী একটি। দেহী সব শরীর জুড়ে রয়েছেন। তাই পায়ে ব্যথা। যদি এখান (হাঁটু) থেকে মন তুলে নিই, তা হলে আর বেদনা নেই।” সেজন্য সারদাদেবী আবার বলেন বৈষ্ণবদের কথা: “বৈষ্ণবেরা মন্ত্র দিয়ে বলে, ‘এখন মন তোর।” বলেই বললেন একটি ছড়া:
“মানুষ গুরু মন্ত্র দেন কানে।/ জগদগুরু মন্ত্র দেন প্রাণে।।”
মা মনকে সর্বদা সাবধানে সুন্দর, সোৎসাহী ও শুদ্ধ করে রাখতে উপদেশ দিয়েছেন। কেননা মা মনে করেন: “মন শুদ্ধ না হলে কিছুই হয় না।” এবার একথায়ও একটি সুন্দর ছড়া কাটলেন করুণাময়ী
মা:“গুরু, কৃষ্ণ, বৈষ্ণব, এ তিনের দয়া হল।
একের দয়া বিনে জীব ছারেখারে গেল।।”
এখানে “একের” মানে মনের। সেজন্য সারদা মা বলছেন: “একের—কিনা মনের। নিজ মনের কৃপা হওয়া চাই।” এজন্য এই মনকে মা গুরুর গুরুত্ব দিতে চাইছেন। একবার জয়রামবাটীতে জননী সারদাদেবী সকাল থেকেই অসুস্থ বোধ করায় মনে করেছিলেন যে, সেদিন আর স্নান করবেন না। কিন্তু সন্তানরা সেসব কথায় কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়বে ভেবে শেষ পর্যন্ত তিনি স্নান করেই ফেললেন। ফলে সন্ধ্যার পরে পড়লেন তিনি জ্বরে। এখন একথার প্রসঙ্গে মা মহেশ্বরানন্দকে তাঁর কাছে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উপদেশ দিয়ে বললেন: “বাবা, প্রথমে মনের কথা শুনবে। প্রথম মনই গুরু। এই দেখ না, আজ সকালে ঘুম থেকে উঠতেই মনে হলো যে, শরীরটা খারাপ, আজ আর নাইব না। আবার নানারকম ভেবে শেষে নেয়েই ফেললুম। এখন ভুগছি।” অতএব অমান্য করা চলবে না মনকে। এই মনের কথা না শুনলে শেষে ভুগতে হবে।
এখন এই মন যাতে কৃপা ভাল বুদ্ধি দেয়, সেজন্য সেটিকে সদা সোৎসাহী ও খুশী করে রাখতে হবে। এবং এজন্য একবার সাদা পেড়ে কাপড় পরা দু’জন অল্পবয়সী মানুষকে মা বলেছিলেন: “একি! সাদা পেড়ে কাপড় কেন পরেছ? তোমরা ছেলেমানুষ, পাড় দেওয়া কাপড় পরবে। নইলে মন বুড়ো হয়ে যাবে। মনে সর্বদা উৎসাহ রাখতে হয়।” আবার এই মন কিসে শুদ্ধ বা ভাল রাখা যায়, সে সম্বন্ধে সারদাদেবী সুন্দর কয়েকটি কথা বললেন: “ক্ষুদ্র জায়গায় থাকলে মনও ক্ষুদ্র হয়, খোলা জায়গায় দিলও খোলা হয়।”এই কথামৃতে মা পরিবেশন করেছিলেন কাশীতে। ১৯১২ সালের ৫ই নভেম্বর, মঙ্গলবার বেলা একটা নাগাদ মা কাশীর অদ্বৈত আশ্রমে আসেন। সেখানে কিছুক্ষণ থেকে পরে পৌঁছান কিরণ দত্তদের “লক্ষ্মীনিবাস” নামে নতুন বাড়ীতে।
পরিমল চক্রবর্তী ও অপর্ণা চক্রবর্তীর ‘শ্রীশ্রীমা সারদা কথামৃত’ থেকে