বাগদেবীর আরাধনার দিন আগত। বিদ্যার দেবী নানারূপে বন্দিত। দক্ষিণে তিনিই পুজো পান সারদম্বা রূপে। সরস্বতী থেকে সারদম্বার অর্চনা প্রসঙ্গে জানালেন পূর্বা সেনগুপ্ত।
বাগদেবীর আরাধনার দিন আগত। বিদ্যার দেবী নানারূপে বন্দিত। দক্ষিণে তিনিই পুজো পান সারদম্বা রূপে। সরস্বতী থেকে সারদম্বার অর্চনা প্রসঙ্গে জানালেন পূর্বা সেনগুপ্ত।
এক দশক আগের কথা। বদ্রীনাথ দর্শনের শেষে চলেছি ভারতের শেষ গ্রাম মানা দেখতে। তার চেয়েও বেশি আকর্ষণ সরস্বতী নদীর উত্স দর্শন। দেবী সরস্বতী নদীই প্রবাহিনীর মধ্যে শ্রেষ্ঠা। সেই মানা গ্রামে পাণ্ডব পুত্র ভীমের তৈরি পাথরের ব্রিজ (ভীম পুল) বা পাথরখণ্ডের তলদেশ থেকে বেরিয়ে আসছে শ্বেতশুভ্র জলের স্রোত। দেবী শুধুমাত্র এখানেই দৃশ্যমান। তারপর গুপ্ত পথে গোপন অভিসারে চলবেন নিজ ভঙ্গিতে। চিরকালই রহস্যাবৃতা তিনি। সেই ফেনিল জলরাশি দেখে দেবী সরস্বতীর স্তবগাথা স্মরণে এসেছিল, ‘যা কুন্দেদু তুষারধবলা’। অর্থাৎ কুন্দ ফুলের মতোই তুষার ধবল তিনি। সত্যিই সেই স্রোত একেবারে এই স্তবের সার্থক বাগরূপ। ঋষি কি তবে এই দৃশ্য দেখেই স্তবগাথায় বন্দনা করেছিলেন দেবীকে? প্রকৃতিতে যখন কুন্দ ফুল ফোটে, পলাশ ফুলে গাছ যখন রাঙা হয়ে ওঠে, আমের মুকুলের তীব্র মিষ্টি সুবাস যখন পাই তখনই দেবী পলাশপ্রিয়া বা সরস্বতীর আগমন। তিনি শ্বেতশুভ্র কিন্তু তাঁর পূজায় হরিদ্রাবর্ণ এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। তিনি আমাদের বিদ্যার দেবী।
ইতিহাস বলে কোনও একসময় সিন্ধু নদীর আশপাশ দিয়েই বয়ে যেত সরস্বতী। সেই জলবাহী নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ বৈদিক সভ্যতা। এরপর প্রকৃতির হঠাৎ খেয়ালেই হয়তো তা জলহীন শুষ্ক ধারায় পরিণত হল। তীরবর্তী জনপদ নিজেদের জলকষ্ট নিবারণের জন্য আশ্রয় নিল অন্যত্র। কিন্তু সেই নদীর প্রতি কৃতজ্ঞতা রয়ে গেল তাঁদের অন্তরে। তাঁরা সেই নদীরই দেবীরূপ প্রদান করলেন। তারপর তাঁর পূজা শুরু হল। দেব-দেবীর উত্পত্তির ইতিহাস জানায়, বৈদিক দেবী শ্রী দুইভাগে বিভক্ত হয়ে ধনের দেবী লক্ষ্মী আর বিদ্যার দেবী সরস্বতীতে পরিণত হন। তাই দুই দেবীর আরাধনার তিথিই হল পঞ্চমী।
বসন্ত পঞ্চমীতে আমরা যে দেবীর আরাধনা করি তিনি কখনও ব্রহ্মচারিণী, কখনও বা বিষ্ণুর পত্নী। পুরাণ এই দেবীর সম্বন্ধে এক একসময় এক এক কাহিনি ব্যক্ত করেছে। যে কাহিনিতে কখনও তিনি ব্রহ্মার কন্যা হয়েও ব্রহ্মার সৃষ্টিকার্যে অংশগ্রহণ করেন আবার তখন তাঁর স্ত্রী রূপে আবির্ভূত হন। কখনও বা বিষ্ণুর তিন পত্নীর অন্যতম তিনি।
কিন্তু দেবী সরস্বতী যখন জ্ঞানের দেবী তখন তিনি এক শক্তিময়ী অস্তিত্ব। কারণ, জ্ঞানই জীবের পরিচালিকা শক্তি। কেবল তাই নয় তিনি বাগদেবী। যে বাক শক্তি সমগ্র পৃথিবীকে পরিচালিত করে। দেবী সরস্বতীর এই শক্তিময়ী রূপটি আমরা দেখি দক্ষিণ ভারতের শৃঙ্গেরী নগরে। এখানে তিনি দেবী সারদম্বা নামে পূজিতা।
ভারতের প্রাচীন নগর শৃঙ্গেরী। রামায়ণে আছে রাজা দশরথ পুত্রসন্তানের জন্য তপস্যা করেছিলেন। এই সময় ঋষি ঋষ্যশৃঙ্গ তাঁর জন্য একটি পুত্রেষ্টি যজ্ঞ করেন। এই ঋষির শৃঙ্গ বা হরিণের মতো শিং ছিল। যজ্ঞজাত চরু বা পায়েস খেয়ে রাজা দশরথের চার পুত্র জন্মায়। ঋষ্যশৃঙ্গ ঋষির নামেই এই জায়গাটি নামকরণ হয় শৃঙ্গেরী। এই শৃঙ্গেরীতেই প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন দেবী সরস্বতীর আরেক প্রতিমূর্তি দেবী সারদম্বা।
কথিত আছে আদি শঙ্করাচার্য যখন সদলবলে দক্ষিণ ভারত পরিভ্রমণ করছিলেন তখন তুঙ্গা নদীর তীরে এসে এক শিবমন্দিরের পাশে অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পান। তিনি দেখেন একটি ব্যাঙ প্রখর রোদে প্রসব বেদনায় ছটফট করছে। ব্যাঙটি যাতে নির্বিঘ্নে ডিম প্রসব করতে পারে তাই তার মাথার উপর ফণা তুলে বসে আছে এক বিষধর সাপ। শঙ্করাচার্য এই দৃশ্য দেখে চিন্তা করলেন, খাদ্য-খাদক সম্পর্কের উপর নির্দিষ্ট দুই বিপরীত জীবের একত্রে অবস্থান যেখানে হয় সেই স্থান সাধারণ নয়। এই স্থান নিশ্চয়ই অলৌকিক শক্তিকে ধারণ করে রয়েছে। তিনি এখানেই তাঁর তৈরি করা চারটি মঠের প্রথমটি প্রতিষ্ঠা করলেন। এবং এই মঠের দেবী হলেন সারদম্বা। তিনি সরস্বতীর প্রতিমূর্তি। মূর্তিটি শ্রী শঙ্করাচার্য চন্দন কাঠে নির্মাণ করে তা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তীকালে দক্ষিণ ভারতের বিশেষ ধাঁচে এই দেবীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়। আর দেবীমূর্তির উপরে সোনার আচ্ছাদন দেওয়া হয়। দেবী হংসবাহনা, চতুর্ভুজা। উত্তর ভারতে, বিশেষ করে কালীকুলের আরাধনা যেখানে প্রচলিত, সেখানে দেবীর বিশেষ বার হল মঙ্গল ও শনি। কিন্তু দক্ষিণ ভারতে শনি ও শুক্রবার দেবী আরাধনার জন্য নির্দিষ্ট। এদিক দিয়ে সারদম্বা ও ব্যতিক্রম নন। তাঁর হাতে প্রতি শুক্রবার তুলে দেওয়া হয় বীণা। হংসবাহনা, বীণাবাদনরতা দেবীর অপর হাতে অক্ষমালা ও পুস্তক। দেবী বিশেষ বিশেষ সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের আরাধ্যা। সারদম্বা হলেন একমাত্র দেবী যিনি সন্ন্যাসীদের আরাধিত। আর তিনিই দেবী সরস্বতী।
দক্ষিণ ভারতে মা সারদা বা সারদম্বার গুরুত্ব অসীম। তিনি জ্ঞানের দেবী আর তাঁর কৃপায় সন্ন্যাসী সম্প্রদায় সিদ্ধিলাভ করেন। সারদা মঠের মহাবাক্য ‘অহম ব্রহ্মাস্মি’(আমিই ব্রহ্ম)। অর্থাত্ এই দেবী সরস্বতী কেবল আমাদের বিদ্যা দান করেন না, তিনি শ্রেষ্ঠ বিদ্যা প্রদান করেন। তিনি কেবল মানুষেরই নন, দেবতাদেরও পূজ্য।
এই পরম শক্তিময়ী, অজ্ঞানরূপ অসুর ধ্বংসকারী সরস্বতী মূর্তির ধারণা শঙ্করাচার্য পেলেন কোথা থেকে? কথিত আছে , শঙ্করাচার্য যখন ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে অদ্বৈত বেদান্ত প্রতিষ্ঠা করছেন তখন তিনি মিথিলার মণ্ডন মিশ্রের সঙ্গে তর্কে অবতীর্ণ হন। মণ্ডন মিশ্র ছিলেন মীমাংসা দর্শনের পণ্ডিত। কেবল তিনি নন, তাঁর স্ত্রী উভয়ভারতীও অত্যন্ত বিদুষী ছিলেন। নানা শাস্ত্রে পারঙ্গম উভয়ভারতীকে সরস্বতীর বরপুত্রী রূপে সম্মান করতেন সকলে। মণ্ডন মিশ্র শঙ্করাচার্যের সঙ্গে তর্কে পরাজিত হলে উভয়ভারতী তাঁকে তর্কে আহ্বান করেন। তর্কে তিনি কামশাস্ত্র সম্বন্ধে প্রশ্ন করতে শুরু করেন ভিক্ষু শঙ্করাচার্যকে। নিরুপায় শঙ্করাচার্য এই শাস্ত্র অধিগত করার জন্য একমাস সময় চান। তখন নাকি তিনি যোগবলে উভয়ভারতীর সত্তায় প্রবেশ করে এই শাস্ত্রে অভিজ্ঞ হন এবং একমাস পর তাঁকে তর্কে পরাজিত করেন। পরাজিত উভয়ভারতী শঙ্করাচার্যের কাছে পরাজয় স্বীকার করে অগ্নিতে প্রবেশ করেন আর মণ্ডন মিশ্র শঙ্করাচার্যের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে সুরেশ্বর নামে পরিচিত হন। দেবী সারদম্বার মূর্তি প্রতিষ্ঠার মধ্যে এই উভয়ভারতীর ছায়াও প্রভাব বিস্তার করেছিল বলে অনেকে মনে করেন। অর্থাত্ দেবী সারদম্বা কেবল পরাবিদ্যা নয়, অপরাবিদ্যা দান করেও মানবজীবনকে সার্থক করেন। তিনি কামেশ্বরী। দেবী পূজিতা হন শৃঙ্গেরী মঠের অধ্যক্ষের মাধ্যমে। ফুল, কুমকুম আর সুগন্ধীর সঙ্গে শুদ্ধ মন্ত্র উচ্চারণে হংসবাহনা এই দেবী যেন জীবন্ত হয়ে ওঠেন। যিনি সার দান করেন তিনিই সারদা। কেবল দেবীমূর্তি নয় এর সঙ্গে বিশেষভাবে দেবীযন্ত্রও প্রতিষ্ঠিত। সেই যন্ত্রেই পূজিত হন, মূর্তি সম্মুখে থাকে মাত্র। যে দেবী সরস্বতী বৈদিক সভ্যতার ধারক ছিলেন, ঋষি আরাধিত ছিলেন, তিনিই এখন ভারতীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতার ধারক হয়ে সন্ন্যাসীদের আরাধিত। সাধারণ মানুষ যেখানে শ্রদ্ধায় আনত হয়।