Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

বারুদ নয়, ফুলের গন্ধে ভরপুর লালগড় থানা! মাওবাদীদের গুলি খেয়েও বেঁচে যাওয়া সেই সঞ্জীব এখন আইসি

শীতের সকালে সূর্যের নরম রোদ চাতালে ছড়িয়ে পড়েছে। ব্যস্ততার লেশ মাত্র নেই কারও। দু’একটি রাইফেল দেওয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা।

বারুদ নয়, ফুলের গন্ধে ভরপুর লালগড় থানা! মাওবাদীদের গুলি খেয়েও বেঁচে যাওয়া সেই সঞ্জীব এখন আইসি
  • ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রদীপ্ত দত্ত, ঝাড়গ্ৰাম: শীতের সকালে সূর্যের নরম রোদ চাতালে ছড়িয়ে পড়েছে। ব্যস্ততার লেশ মাত্র নেই কারও। দু’একটি রাইফেল দেওয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা। লালগড় থানার দু’ একজন পুলিশকর্মী ফুল গাছের পরিচর্যা করছেন। গাছগুলিতে শীতকালীন ফুলের দোলা। জানান দিচ্ছে, মাওবাদী সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর লালগর এখন শান্ত। তবুও যেন মাঝে মধ্যে কানে বাজে দু’দশক আগের গুলি চলার শব্দ। কোথাও কোথাও এখনও মুছে যায়নি ক্ষতচিহ্ন! 

Advertisement

রাজনীতির কারবারিরা মনে করেন, বাংলার রাজনীতিতে লালগড় আন্দোলন দিক বদলের চিহ্ন। বাম জমানার শেষের দিকে প্রশাসনিক উদাসীনতা, নেতাদের উন্নাসিকতা, অনুন্নয়ন আর নিদারুণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে জঙ্গলমলের মানুষের মধ্যে তখন তীব্র ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। সেই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে লালগড়ে মাওবাদীরা ‘বিপ্লব’-এর প্রস্তুতি নিতে থাকে। যার প্রথম বহিঃপ্রকাশ ২০০৩ সালে বান্দোয়ান থানায়  জনযুদ্ধ গোষ্ঠীর পুলিশের উপর আক্রমণ। ওসি নীলমাধব দাস খুন হন। সেকেন্ড অফিসার সঞ্জীব ঘোষের বাম হাতে তিনটি, ডান হাত ও নাকে একটা গুলি লাগে। অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচলেও গুরুতর জখম হন। ঘটনায় ঠিক এক বছরের মধ্যে জনযুদ্ধ ও  মাওয়িস্ট কমিউনিস্ট সেন্টার মিলিত হয়ে সিপিআই মাওবাদী পার্টির জন্ম হয়। লালগড় সহ জঙ্গলমহলজুড়ে রক্তঝরার দিন শুরু হয়। ২০০৮ সালে মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কনভয়ে মাওবাদীর বিস্ফোরণ ঘটায়। আদিবাসী মানুষের আন্দোলনের রাশ সুকৌশলে কেড় নেয় মাওবাদীরা। ২০০৯ সালে লালগড়ের ধরমপুর দখল নেয়। সেই বছরের জুন মাসে সরকার কেন্দ্রীয় বাহিনী নামাতে বাধ্য হয়। জঙ্গলমহলে কর্তব্যরত পুলিশ অফিসার ও কর্মীদের মাওবাদীদের খতম রাজনীতির মুখে পড়তে হয়। 
সেদিনের সেকেন্ড অফিসার সেই সঞ্জীব ঘোষ বর্তমানে লালগড় থানার আইসির দায়িত্বে। থানায় বসে এদিন বলেন, ‘২০০৩ সালের ১১ অক্টোবর বিকেলে ঘটনাটি ঘটেছিল। মাওবাদীদের একটি গ্ৰামে বৈঠক করার খবর আসে। কনভয়েরর মধ্যে আমাদের গাড়িটা সবার আগে ছিল। বিস্ফোরণে গাড়িটা শূন্যে উড়ে যায়। আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। চারিদিক থেকে গুলি ছুটে আসছিল। দু’ হাতের তালু দিয়ে সামনে আড়াল করার চেষ্টা করছিলাম। বাম হাত দিয়ে তিনটি ও ডান হাত দিয়ে একটা গুলি বেরিয়ে যায়। নাক ছুঁয়ে বেরিয়ে যায় আর একটা গুলি। গাড়ি থেকে নিজেকে টেনে হিঁচড়ে বের করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন। তার মধ্যেই একটি গুলি লেগে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন। তারপর আর কিছু মনে ছিল না। হাসপাতালে আমার জ্ঞান ফেরে। লালগড় থানার দায়িত্বরত অফিসারদের অনেকেই সেই স্মৃতি বহন করে চলেছেন।’
অবসর নেওয়া পুলিশ অফিসার সুব্রত সামন্তর উদ্যোগে থানা চত্বরে ফুলের বাগান গড়ে তোলা হয়েছিল। শীতের মরশুমে থানাজুড়ে এখন ফুল ফুটছে। কর্তব্য পালনের সঙ্গেই থানার পুলিশ অফিসাররা ফুল ফোটাচ্ছেন। এসআই সৌমেন সিনহা মহাপাত্র বলেন, ‘সেইসময় কুইলা পাল ক্যাম্প, ঝিলিমিলি ক্যাম্পে রাইফেল  হাতে দিনের পর দিন পাহারায় থাকতে হয়েছে। মাসের পর মাস অর্ধাহারে কাটাতে হয়েছে আমাদের। 
প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও কর্তব্যপালন করাই প্রধান লক্ষ্য ছিল। থানার অপর এক পুলিশ অফিসার বলেন, ‘লালগড় এখন শান্ত । বন্দুক থেকে বাগান আমাদের সঙ্গে এখন জুড়ে গিয়েছে।’   লালগড় থানার আইসি সঞ্জীব ঘোষ।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ