সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: মরেও যেন মরেন নাই চন্দনদস্যু বীরাপ্পন! ঘুরে ফিরে তাঁর নামই এসে পড়ে অপরাধ জগতে কিংবা রাজনীতিতে। এই যেমন ক’দিন ধরে বর্ধমানের মেমারির পথে ঘাটে, দোকান-বাজারে, পাড়ার মোড়ে, চায়ের আড্ডায় কান পাতলে শোনা যাচ্ছে বীরাপ্পন আর বীরাপ্পন! এমন চর্চায় ঘুম উড়েছে পুলিসেরও। কিন্তু কেন? দাক্ষিণাত্যের কুখ্যাত দুষ্কৃতী, ২০০৪ সালে এনকাউন্টারে খতম বীরাপ্পনের সঙ্গে মেমারির যোগই বা কোথায়?
মেমারি থানা এলাকার কলানবগ্রামের সরকারি ডিএলএড কলেজ। সেখানকার নিরাপত্তা বেশ আঁটোসাঁটো। পিঁপড়ে গলার জো নেই। কলেজ চত্বরজুড়ে শোভাবর্ধন করে ছিল কয়েকটি চন্দন গাছ। দামে ও ভারে একটা কুলীন কুলীন ব্যাপার ছিল। সম্প্রতি কলেজ কর্তৃপক্ষের নজরে আসে, সেগুলির মধ্যে প্রমাণ সাইজের দু’টি গাছ উধাও! কে কাটছে, কোথায় পাচার করেছে? ঘুণাক্ষরে কেউ টেরই পাচ্ছেন না। নিরাপত্তা কর্মীদের নজর এড়িয়ে এমন কাজ যে করে বেড়াচ্ছে, সে সাধারণ কোনও দুষ্কৃতী নয়। সেই কারণেই মেমারিবাসীর মগজ উস্কে দিচ্ছে বীরাপ্পনের নাম। যিনি তামিলনাড়ুর তাবড় তাবড় বনকর্তাদের ঘোল খাইয়ে চন্দনবনে থাবা বসিয়ে চন্দনদস্যু হয়ে উঠেছিলেন। নিশ্চয় তাঁর কৌশল অবলম্বনে মেমারিতে এমন কারও আবির্ভাব হয়েছে যে, কলেজের চন্দনগাছ চুরিতে যুক্ত।
স্থানীয়রা মঙ্গলবার বলছিলেন, কলেজ চত্বরে সর্বক্ষণের জন্য নিরাপত্তা রক্ষী রয়েছেন। কয়েকজন আধিকারিক এবং কর্মীও থাকেন। তারপরেও উধাও হয়ে গেল বহুমূল্যের দু’টি চন্দন গাছ। যেমন, সুমন সাধুখা, সাদ্দাম শেখদের কথায়, ‘ওই কলেজ ক্যাম্পাসে বহু পুরনো গাছ রয়েছে। এলাকার এক স্বাধীনতা সংগ্রামী নিজের হাতে গাছ রোপন করেছিলেন। সেই সমস্ত গাছ চুরি হয়ে গেলে, তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের। ফাঁকা কোনও জঙ্গল থেকে দুষ্কৃতীরা খুব সহজেই গাছ কাটতে পারে। কিন্তু কলেজ ক্যাম্পাস থেকে সেই কাজ তারা করলো কিভাবে? এটা যথেষ্টই রহস্যজনক।’
পাল্লারোড এলাকার বাসিন্দা সন্দীপন সরকার বলেন, ‘সর্ষের মধ্যে ভূত না থাকলে এই কাজ করা সম্ভব নয়। ঘটনার তদন্তের দাবিতে আমরা জেলা প্রশাসনের কাছে চিঠি করব। যে বা যারা এ কাজ করেছে তাদের কঠোর শাস্তি হওয়া দরকার। চন্দন গাছ বহু মূল্যবান। সেই কারণেই দুষ্কৃতীরা এই দুটি গাছকে টার্গেট করেছিল। অথচ, কলেজ ক্যাম্পাসে রাতেও লোকজন থাকে। কেন তারা টের পেল না! এ নিয়ে তো প্রশ্ন উঠবেই।’ কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইতিমধ্যেই বিষয়টি বনদপ্তরকে জানানো হয়েছে। তদন্তের জন্য বলা হয়েছে। মেমারি থানাতেও অভিযোগ করা হয়েছে। পুলিস ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। রাতের দিকে দুষ্কৃতীরা কলেজের পিছন দিক দিয়ে ঢুকেছিল। সেই কারণেই বিষয়টি টের পাওয়া যায়নি। বর্ধমান জেলা পরিষদের বন ও ভূমি দপ্তরের কর্মাধ্যক্ষ নিত্যানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘ঘটনার তদন্ত করে অভিযুক্তর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, কয়েকদিন আগে বর্ধমান শহরের একটি নামজাদা স্কুলেও গাছ কেটে নেওয়া হয়। সেটা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেটে ফেলা হল দামি চন্দন গাছ। সম্প্রতি শিক্ষাদপ্তর ব্যাপকভাবে গাছ রোপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রতিটি স্কুলের পড়ুয়াদের একটি করে গাছ লাগানো বাধ্যতামূলক করেছে। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চত্বর থেকে এভাবে ‘বীরাপ্পন’-এর বৃক্ষনিধনে প্রশ্নের মুখে পড়েছে সবুজ রক্ষায় নিরাপত্তা। নিজস্ব চিত্র