Bartaman Logo
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

পাহাড়ের টানে সান্দাকফু

সান্দাকফু নামটার সঙ্গে প্রথম পরিচিত হই বহু বছর আগে। তখন আমি সদ্য মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছি। ১৯৮৬ সাল। সমরেশ মজুমদারের লেখা ‘গর্ভধারিণী’ উপন্যাসটি ধারাবাহিক হিসেবে বেরচ্ছে। সেই উপন্যাসে প্রথম সান্দাকফু জায়গাটার সঙ্গে আমার পরিচয়।

পাহাড়ের টানে সান্দাকফু
  • ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কাঞ্চনজঙ্ঘার অবিস্মরণীয় ও সম্পূর্ণ রূপ যদি এক ফ্রেমে দেখতে হয় তবে উত্তরবঙ্গের সীমান্ত ঘেঁষা সান্দাকফুর বিকল্প নেই। সান্দাকফু পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ।

Advertisement

কীভাবে যাবেন: শিয়ালদহ বা হাওড়া থেকে ট্রেনে নিউ জলপাইগুড়ি অথবা বিমানে বাগডোগরা বিমানবন্দরে নামতে হবে। সেখান থেকে গাড়িতে প্রথম পৌঁছাতে হবে মানেভঞ্জন। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৮৫ কিলোমিটার। মানেভঞ্জন থেকে সান্দাকফু যাওয়ার দুটো উপায়। অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীরা সিঙ্গালীলা জাতীয় উদ্যানের মধ্যে দিয়ে ট্রেকিং করে যেতে পারেন। শারীরিক পরিশ্রম এড়াতে চাইলে মানেভঞ্জন থেকে বুক করে নিতে পারেন ল্যান্ড রোভার গাড়ি।

সান্দাকফু নামটার সঙ্গে প্রথম পরিচিত হই বহু বছর আগে। তখন আমি সদ্য মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছি। ১৯৮৬ সাল। সমরেশ মজুমদারের লেখা ‘গর্ভধারিণী’ উপন্যাসটি ধারাবাহিক হিসেবে বেরচ্ছে। সেই উপন্যাসে প্রথম সান্দাকফু জায়গাটার সঙ্গে আমার পরিচয়।
 বিশিষ্ট সাহিত্যিকের বর্ণনায় সে জায়গা আমার কিশোরী মনে দাগ কেটেছিল এতটাই যে বহু বছর পর সান্দাকফু যাওয়ার পরিকল্পনা হতে গা ব্যথা, পা ব্যথা, মাথা ঘোরা বা গা-বমির মতো কোনো প্রতিবন্ধকতা আমাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। 
 ওই উপন্যাসে পড়েছিলাম ক্লিওপেট্রার চোখের মতো নীল আকাশ। তাই সান্দাকফু ভ্রমণের পরিকল্পনা হতেই আমার মনে বারবার ওই লাইনটা উঁকি মারছিল ‘ক্লিওপেট্রার চোখের মতো নীল আকাশ।’ সেই নীল আকাশকে নিজে চাক্ষুষ করব সেটা ভাবতেই যে 
রোমাঞ্চ আর চূড়ান্ত উন্মাদনা সে কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। 
 হিমালয় পর্বতমালা বরাবরই মানুষের চিরন্তন আকর্ষণের নাম। ট্রেকিং, ঘন কুয়াশা, দুর্গম পাহাড়ি চড়াই রাস্তা সব নিয়ে বুক ধুকপুকানি যথেষ্ট ছিল।
কিন্তু কাঞ্চনজঙ্ঘার এক অবিস্মরণীয় ও সম্পূর্ণ রূপ যদি এক ফ্রেমে দেখতে হয় তবে উত্তরবঙ্গের সীমান্ত ঘেঁষা সান্দাকফুর কোনো বিকল্প নেই এ কথা বারবার শুনে পড়ে ও জেনে সান্দাকফু রওনা দিয়েছিলাম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১,৯২৯ ফুট (৩,৬৩৬ মিটার) উঁচুতে অবস্থিত সান্দাকফু পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ।
  আমাদের মূল সফর শুরু হয় মানেভঞ্জন থেকে। মানেভঞ্জন হল এই সফরের মূল প্রবেশদ্বার বা বেস ক্যাম্প। এখান থেকেই গাড়ি বুক করে নিতে হয়। অথবা যেসব পর্যটক ট্রেক করে যাবেন তাঁরা এখানে বড়ো বাজার থেকে সমস্ত রসদ নিয়ে নেন। আর গাড়ি হচ্ছে ব্রিটিশ আমলের সেই ল্যান্ড রোভার।
ল্যান্ড রোভারের চাকা যখন পাথুরে খাড়া চড়াই বেয়ে উঠতে শুরু করে তখন চারপাশে দৃশ্য দ্রুত পালটাতে থাকে। বেশ কিছুটা চড়াই পেরিয়ে চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ শান্ত  সবুজ উপত্যকা।
 প্রথম বড়ো স্টপ পাহাড়ি জনপদ চিত্রে। গুণী শিল্পীর তুলিতে নিপুণভাবে আঁকা ছবির মতো নিঃসঙ্গ পাহাড়ি জনপদ। পাইন বনের সোঁ সোঁ আওয়াজ আর গবাদি পশুর গলায় ঘণ্টার টুং টাং মিঠে আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ আমি পাইনি।
 এখানে রয়েছে একটি ছোট্ট তিব্বতি মনাস্ট্রি। প্রকৃতির সবুজ ক্যানভাসের মাঝে মঠের চূড়া এবং বাতাসে উড়তে থাকা বর্ণময় ধর্মীয় পতাকাগুলো অপূর্ব আধ্যাত্মিক শান্তির কথা বলে। পাহাড়ি পাইন আর ফার গাছের ফাঁক গলে যখন কুয়াশার মখমলি চাদর ভেসে আসে, মনে হয় এক অলৌকিক জগতে প্রবেশ করছি। এখানে সারাক্ষণই মেঘ কুয়াশার লুকোচুরি দেখলাম।
তবে নৈঃশব্দ্য কাকে বলে জানলাম চিত্রেয় দু’দিন থেকে। যান্ত্রিক ব্যস্ত পৃথিবী থেকে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। 
চিত্রে পেরিয়ে মেঘ রোদের খেলা দেখতে দেখতে গাড়ি এগিয়ে চলে লামাদুরা ও মেঘমা হয়ে টুমলিং গ্রামের দিকে। এটি মূলত ভারত ও নেপাল সীমান্তের ওপর অবস্থিত একটি ছোটো গ্রাম। এখানে রাত কাটানোর জন্য বেশ কিছু সুন্দর হোমস্টে রয়েছে। 
টুমলিংয়ের রাতগুলো যেন এক হিমশীতল নীরবতা দিয়ে ঘেরা। পাহাড়ের বুক চিরে হাড়কাঁপানো কনকনে হাওয়ায় ঘরের ভিতরেও অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দেয়। রাতে পাহাড়ের নিস্তব্ধতায় মেঘমুক্ত আকাশে উজ্জ্বল লক্ষ তারার মেলা দেখা এক মায়াবী ও অপার্থিব অভিজ্ঞতা বটে! 
 পরদিন সকালে টুমলিং থেকে যখন যাত্রা শুরু হয় তখন দূর দিগন্তে প্রথম সূর্যের আলো কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় পড়ে চকচক করে ওঠে। মনে হয় যেন রূপালি জরির চাদর কেউ পাহাড়ের চূড়ায় মেলে দিয়েছে। এতটাই ঝকমকে।
টুমলিং থেকে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য কালিয়াপোখরি। পথে সিঙ্গালীলা জাতীয় উদ্যানের মূল ফটক পেরিয়ে গাড়ি এগিয়ে চলে ঘন বাঁশঝাড় আর রডোডেনড্রন অরণ্যের বুক চিরে। এই জঙ্গলে বিরল প্রজাতির রেড পান্ডার দেখা না মিললেও নানা পরিযায়ী পাখিদের কনসার্ট কানে নিয়ে কালিয়াপোখরি পৌঁছানোর পর চোখে পড়ে এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য। মেঘ কুয়াশার চারণভূমি। 
  পাইন, ফার আর বার্চ দিয়ে ঘেরা ছোট্ট জলাশয়। চারপাশে সারিবদ্ধভাবে লাগানো তিব্বতি প্রার্থনা পতাকা। হ্রদের জল কিছুটা কালচে দেখলাম। 
নেপালি ভাষায় ‘কালী’ মানে কালো আর ‘পোখরি’ মানে জলাশয়, পুকুর বা হ্রদ। স্থানীয় মানুষের কাছে এটা অত্যন্ত পবিত্র। কালিয়াপোখরির উচ্চতা প্রায় ১০,৪০০ ফুট। এখানে এসে ঠান্ডা যেন আরও আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরল। কোনো গরম জামাই যথেষ্ট নয় বলে মনে হচ্ছিল। এমন ঠান্ডা যা শরীরের অন্তঃস্থল পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেয়। 
শুধু ঠান্ডাই নয়, এত সহজে এ জায়গা থেকে ওই জায়গা লেখা যেমন সহজ কিন্তু পাহাড়ি পথের ল্যান্ড রোভার করে বেড়ানোটা তেমনই কষ্টসাধ্য। খাড়া পাহাড় আর দু’পাশে অতলান্ত খাদ পেরিয়ে ইপ্সিত গন্তব্যে পৌঁছানো। 
 কালিয়াপোখরি থেকে সান্দাকফুর দূরত্ব মাত্র ৬.৫ কিলোমিটার হলেও এই পথটুকু পুরো সফরের সবচেয়ে কঠিন এবং খাড়া চড়াই। কালিয়াপোখরি থেকে রওনা দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছানো যায় বাইকেভঞ্জন নামক একটি জায়গায়।
 এখান থেকে সান্দাকফু চূড়ার দিকে তাকালে বুক কেঁপে ওঠে। প্রায় ৯০ ডিগ্রি খাড়া পাথরের রাস্তা সাপের মতো এঁকেবেঁকে উপরে উঠে গেছে। ল্যান্ড রোভার গাড়ি যখন গর্জন করে সেই খাড়া চড়াই ভাঙতে শুরু করে তখন রোমাঞ্চ আর ভয় একসঙ্গে ভর করে। চারপাশের গাছপালা ধীরে ধীরে কমতে থাকে।
 শীতকালে এই পুরো রাস্তা বরফের কার্পেটে ঢাকা থাকে। তাতেও উৎসাহী পর্যটকের ভিড় কমে না।
 অবশেষে গাড়ি এসে থামে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১১,৯২৯ ফুট উঁচু সান্দাকফুর চূড়ায়।
গাড়ির দরজা খুলে বাইরে পা রাখতেই তীব্র কনকনে ঠান্ডা বাতাস শরীর শুধু কাঁপিয়ে দেয় না, যেন অবশ করে দেয়। মনে হচ্ছিল আর বুঝি পারব না। কিন্তু সামনের দিকে তাকাতেই চোখের পলক আর পড়ে না।
 সমস্ত ক্লান্তি দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, আশঙ্কা, ভয়, শারীরিক অস্বস্তি যেন এক নিমিষে কর্পূরের মতো উড়ে যায়। 
  দিগন্ত বিস্তৃত এক বিশাল পর্বতমালা চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মহিমান্বিত কাঞ্চনজঙ্ঘা পরিবার। পাহাড়ের শৃঙ্গগুলো এমনভাবে সারিবদ্ধ হয়ে অবস্থান করছে যা দূর থেকে দেখলে মনে হয় একজন মানুষ শান্তিতে আকাশের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে। এই অলৌকিক দৃশ্যকেই বলা হয় শায়িত বুদ্ধ বা স্লিপিং বুদ্ধ । 
 বাঁদিকে আরও দূরে মেঘের সমুদ্রে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট। পাশে তার সঙ্গী লোৎসে এবং মাকালু। পর্বত সম্রাটকে একসঙ্গে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখার অভূতপূর্ব অনুভূতি শরীর মনে শিহরন জাগায়!  
সান্দাকফুর আসল জাদু দেখা যায় ভোরবেলায়। ভোর চারটের সময় থার্মোমিটারের পারদ যখন মাইনাসের নীচে নেমে যায় পর্যটকরা এসে জড়ো হন ভিউ পয়েন্টে। চারদিকে তখনো নিকষ অন্ধকার। আস্তে আস্তে আকাশের কালচে নীল রং বদলে গিয়ে লালচে আভা দেখা যায়। 
 সকাল ছ’টায় সূর্যদেব উদিত হল। কাঞ্চনজঙ্ঘার সাদা বরফের উপর প্রথম সোনালি আলো এসে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে দেখলাম স্লিপিং বুদ্ধ রুপালি থেকে খাঁটি গলানো সোনায় পরিণত হচ্ছে। পাহাড়ের এই রূপবদল চোখের সামনে দেখা এক পরম আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা!  
 আরও আছে। এক অবিস্মরণীয়  দৃশ্য। পুরো নীচের পৃথিবীটা তখন সাদা তুলোর মতো মেঘের সমুদ্রে ঢেকে গিয়েছে। আমরা যেন মেঘের উপরে এক দ্বীপে দাঁড়িয়ে আছি। আর আমাদের পায়ের নীচে ভাসছে সাদা মেঘের ঢেউয়ের ভেলা।
 প্রকৃতির এই আদিম অপার্থিব রূপ দেখে একটা কথাই মনে হচ্ছিল যে এতটা পথ কষ্ট করে আসা সত্যিই সার্থক। ভাবছিলাম, প্রকৃতির শক্তির কাছে মানুষ কতটা তুচ্ছ ও ক্ষুদ্র। আগের দিনই ছিল ঘন কুয়াশা। একবারের জন্য দেখা যায়নি কোনো কিছু। অথচ বিকেল থেকেই প্রকৃতির রং বদলে গেল।
 সান্দাকফুতে আসা পর্যটকদের কাছে শুনছিলাম অনেকে পরপর দু’বছর এসে একবারও স্লিপিং বুদ্ধ দেখতে পারেনি। একে তো শারীরিক শ্রম, তারপরে মনের চাহিদা না পূরণের কষ্ট। আবার ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকলে একবারেই অমন মহিমান্বিত রূপের সাক্ষী থাকা যায়। তাই বললাম প্রকৃতির শক্তির কাছে আমরা সত্যিই তুচ্ছ আর ক্ষুদ্র।
 সান্দাকফুতেও দু’দিন কাটানোর পর যখন ফেরার সময় এল তখনও মনটা শান্তি, তৃপ্তিতে ভরে রইল। এক নির্মল অনুভব। অনেকে আরও কাছ থেকে দেখার জন্য ফালুটে যায়। 
 ফেরার পথে সাধারণত শ্রীখোলা বা গুরদুম গ্রামের মধ্যে দিয়ে নীচের দিকে নেমে যাওয়া যায়। পাহাড়ি নদী শ্রীখোলার মৃদু ও মিষ্টি স্রোতধ্বনিকে সঙ্গী করে ফিরলাম। 
তনুশ্রী কাঞ্জিলাল  মাশ্চরক

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ