ওঁ স্থাপকায় চ ধর্মস্য সর্বধর্মস্বরূপিণে।
ওঁ স্থাপকায় চ ধর্মস্য সর্বধর্মস্বরূপিণে।
অবতারবরিষ্ঠায় রামকৃষ্ণায় তে নমঃ।।
স্বামী বিবেকানন্দ শ্রীরামকৃষ্ণের যে প্রণাম মন্ত্রটি রচনা করেছিলেন, তাতে আছে ঠাকুরকে তিনি বলেছেন ‘অবতারবরিষ্ঠ’। এখন এই ‘অবতারবরিষ্ঠ’ কথাটির মানে কি—আমরা সংক্ষেপে আলোচনা করছি। ‘বরিষ্ঠ’ কথাটি এসেছে ‘উরু’ শব্দ থেকে, যার অর্থ ‘বড়’। বরিষ্ঠের অর্থ ‘সবচেয়ে বড়’। তা অবতারদের মধ্যে শ্রীরামকৃষ্ণ তাহলে সবচেয়ে বড়। এখন কথাটি বলতে গেলে একটুখানি তর্কের প্যাঁচে পড়ে যাব। কেননা স্বয়ং ঠাকুর বলেছেন, ‘যে রাম, যে কৃষ্ণ, সেই ইদানীং এ দেহে রামকৃষ্ণ।’ তাহলে রাম, কৃষ্ণ এবং শ্রীরামকৃষ্ণ একই ব্যক্তি। ভগবানকে তো আর বড়-ছোট করা চলে না, সুতরাং এদিক দিয়ে বড়-ছোট করতে গেলে মুশকিলে পড়ে যাবে। তবে হ্যাঁ, আমরা প্রকাশের দিক দিয়ে যদি ধরি—ভগবান নিজেই নিজেকে বিভিন্নরূপে প্রকাশ করে থাকেন—কখনও শ্রীরামচন্দ্ররূপে, কখনও শ্রীকৃষ্ণরূপে, কখনও শ্রীরামকৃষ্ণরূপে,—এই প্রকাশের দিক দিয়ে যদি দেখি, তাহলে হয়তো বড়-ছোটর একটা আন্দাজ করতে পারি। শ্রীরামকৃষ্ণ একদিন অন্তরঙ্গ ভক্তদের সঙ্গে নিয়ে বসেছিলেন। তাদের বললেন, “দেখ তো বাইরের কেউ নেই তো—তোমাদের একটা গুহ্য কথা বলি, দেখলাম এখান থেকে, এই শরীর থেকে সচ্চিদানন্দ বেরিয়ে রূপ ধারণ করল এবং ধরে বলল, ‘যুগে যুগে অবতার, পূর্ণ অবতার, তবে সত্ত্বগুণের ঐশ্বর্য।’” শ্রীরামকৃষ্ণদেবের জীবন আলোচনা করলে আমরা দেখতে পাই তাতে সত্ত্বগুণেরই ঐশ্বর্য ছিল।
তাঁকে লড়াই করতে হয়নি, শ্রীকৃষ্ণ বা শ্রীরামচন্দ্রের মতো। অথবা কষ্টসাধ্য শারীরিক কাজ করতে হয় নি, যেমন করেছিলেন বরাহ অবতার। তাই তিনি সত্ত্বগুণেরই আধার ছিলেন এবং সত্ত্বগুণই প্রকাশ করে গেছেন। সত্ত্বগুণের বিশেষ প্রকাশ তাঁতে হয়েছিল। এই হিসাবে আমরা বলতে পারি তিনি ‘অবতারবরিষ্ঠ’।
আর একদিক থেকেও আমরা তাঁকে বলতে পারি ‘অবতারবরিষ্ঠ’, কিন্তু তার দ্বারা অন্য অবতারকে ছোট করা হয় না। ভগবান জগতের প্রয়োজনে বিভিন্ন রূপ ধারণ করে থাকেন। ছোট বড় কিনা তা তিনি হিসাব করেন না। যুগের প্রয়োজন ছিল শ্রীরামচন্দ্ররূপে আসা, যুগের প্রয়োজন ছিল শ্রীকৃষ্ণরূপে আসা, তৎ তৎ যুগের জন্য সেই সব অবতার তখনকার দিনে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। বর্তমান যুগে তিনি এলেন বর্তমান যুগপ্রয়োজনে। বর্তমান যুগের জন্য তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ। এই হিসাবেও আমরা বলতে পারি যে, তিনি ‘অবতারবরিষ্ঠ’।
স্বামী গম্ভীরানন্দের ‘কঃ পন্থাঃ’ থেকে