সুব্রত ধর, শিলিগুড়ি: ঘটনা-১: দুলাল শেখ (নাম পরিবর্তিত)। চটহাটে তাঁর বাড়ি। পেশায় কৃষক। তিনি পুলিসের কাছে জানান, কোনও দিন কেরলে যাননি। তা হলেও তাঁর কাছে হাজির কেরল পুলিসের সমন! তাতে চমকে ওঠেন তিনি। দিশাহারা হয়ে তিনি ফাঁসিদেওয়া থানার পুলিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন সইদুলের কীর্তি। তাঁর নামে খোলা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সইদুল অন্যত্র ভাড়া খাটাচ্ছে বলে অভিযোগ। গোটা ঘটনা নিয়ে পুলিসের কাছে সইদুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানান তিনি।
ঘটনা-২: মহম্মদ সোয়েল (নাম পরিবর্তিত)। নয়ারহাটে বাড়ি। পেশায় ছোট ব্যবসায়ী। তিনি জানান, ঘরে বসেই মাসে মিলবে ৫ হাজার টাকা। প্রায় বছর খানেক আগে এমন আশ্বাস দিয়ে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলায় সইদুল। প্রথম কয়েক মাস হাতে হাতে কড়কড়ে নোটও মেলে। কিছুদিন পরই সইদুলের ডেরায় হানা দেয় পুলিস। অভিযুক্ত সইদুল গা ঢাকা দেয়। এরপরই পুলিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি জানতে পারেন- তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টেও প্রচুর লেনদেন হয়েছে। সে সম্পর্কে তিনি পুরোপুরি অন্ধকারে। তাই তিনি সইদুলের বিরুদ্ধে পুলিসের কাছে অভিযোগ করেন।
চটহাটের বাসিন্দাদের এভাবে টোপ দিয়ে প্রতারণার জালে ফাঁসিয়েছে ধৃত মহম্মদ সইদুল। টানা এক সপ্তাহ ধরে ধৃতের বিরুদ্ধে তদন্তে চালিয়ে এমন তথ্য পেয়েছে দার্জিলিং জেলা পুলিস। ইতিমধ্যে ফাঁসিদেওয়া থানায় ছ’জন গ্রামবাসী ধৃতের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছেন। আরও কিছু গ্রামবাসী থানায় যোগাযোগ করেছেন। তাঁরাও অভিযোগ জানাতে পারেন। আবার কেউ কেউ সতর্ক থাকার জন্য থানায় যোগাযোগ করে ধৃতের গ্যাংয়ের কার্যকলাপ সম্পর্কে খোঁজ খবর নিচ্ছেন।
তদন্তকারী পুলিস অফিসাররা বলেন, বিনা পরিশ্রমে মাসে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা করে পাইয়ে দেওয়ার টোপ দিয়েই গ্রামবাসীদের আধারকার্ড, প্যানকার্ড সহ বিভিন্ন বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করত ধৃত। এরপর সেগুলি দিয়ে ‘সারোগেটেড’ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলত। অ্যাকাউন্টগুলি বিদেশে ঘাঁটি গেড়ে থাকা প্রতারণা চক্র ও মানি লন্ডারিং সিন্ডিকেটের কাছে ভাড়া দিত ধৃত। সেই অ্যাকাউন্টগুলি নিয়ন্ত্রণ করত। এজন্য সে অ্যাকাউন্ট পিছু মাসে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা করে ভাড়া পেত। তা থেকে অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের মাসিক টাকা দিত। কোনও গ্রামবাসী ভিনরাজ্যের পুলিসের কাছ থেকে সমন পেলে তাও সে টাকা দিয়ে মেটানোর চেষ্টা করত বলে অভিযোগ। দার্জিলিংয়ের পুলিস সুপার প্রবীণ প্রকাশ বলেন, টাকার টোপ দিয়ে নিরীহ গ্রামবাসীদের বিপদগামী করেছে ধৃত।
এই অবস্থায় সংশ্লিষ্ট প্রতারণা চক্রের ফাঁদ থেকে গ্রামবসীদের রক্ষা করতে সচেতনতামূলক অভিযানে নামার পরিকল্পনা নিয়েছে পুলিস। তারা বিভিন্ন গ্রামে, স্কুলে, বাজারে সভা করে বিষয়টি নিয়ে প্রচার চালাবে। গ্রামবাসীদের উদ্দেশ্যে পুলিস সুপার বলেন, কেউ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়ার জন্য আধারকার্ড, প্যানকার্ড সহ কোনও নথি চাইলে দেবেন না। কারণ, অ্যাকাউন্ট খুলে তা ভাড়া খাটাচ্ছে প্রতারকরা। কাজেই, প্রতারকদের ফাঁদ এড়ানোর জন্য নিজেই ব্যাঙ্কে গিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলুন। তা নিজেই নিয়ন্ত্রণ করুন। শীঘ্রই এবিষয়ে প্রচার অভিযানে নামা হবে।
এদিকে ধৃত সইদুলের আইনজীবী অলোকেশ চক্রবর্তীর দাবি, তাঁর মক্কেল নিদোষ। তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীদের দিয়ে মিথ্যা অভিযোগ করাচ্ছে পুলিস।