Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

উন্নয়নের গেরুয়া সংজ্ঞা

রাষ্ট্রের ভূমিকা কী? সুশাসন দেওয়া। সুশাসন হল সেই ব্যবস্থা, যা আইন মাফিক পাওয়া যায়। আইন মানুষই তৈরি করেছে।

উন্নয়নের গেরুয়া সংজ্ঞা
  • ২২ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

রাষ্ট্রের ভূমিকা কী? সুশাসন দেওয়া। সুশাসন হল সেই ব্যবস্থা, যা আইন মাফিক পাওয়া যায়। আইন মানুষই তৈরি করেছে। মানবসমাজের সার্বিক কল্যাণই তার উদ্দেশ্য। সার্বিক কল্যাণ হল সেই অবস্থা, যেখানে সবাই ভালোভাবে বেঁচে থাকে। অর্থাৎ দল মত ধর্ম সম্প্রদায় লিঙ্গ ভাষা উপভাষা অঞ্চল সংস্কৃতি নির্বিশেষে সবাই পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য পায়। প্রত্যেকের জন্য স্বাস্থ্যকর গৃহে এবং পরিবেশে বসবাস করার বন্দোবস্ত হয়েছে। উন্নত চিকিৎসা, শিক্ষা, বিনোদন প্রভৃতিতেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রত্যেকের অধিকার। সর্বোপরি পূর্ণবয়স্ক প্রতিটি নাগরিকের জন্য উপযুক্ত চাকরি বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার বা নির্যাতন চলে না। কোনোরকম অন্যায় অপরাধ বা অঘটন ঘটে গেলে আইনের রক্ষকরা আক্রান্তের পাশে থাকেন। আইন মেনে চলা নাগরিকের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা হয়েছে। আইন এবং বিচারালয়ের দরজা সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত। এই পরিবেশে রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ, বাকস্বাধীনতা এবং মানবাধিকার কোনোভাবেই বাধাপ্রাপ্ত হয় না।

Advertisement

কিন্তু বেশিরভাগ রাষ্ট্র নিজ নিজ দেশে এই আদর্শ পরিবেশ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। তার মধ্যে ভারত অন্যতম। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের স্বীকৃতি থাকার পরেও এটা বাস্তব। ভারত পরিচালিত হয় যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় এবং বহুদলের অংশগ্রহণে গঠিত সংসদীয় গণতন্ত্র অনুসারে। কিন্তু তারপরেও ভারত আদর্শ গণতন্ত্র উপহার দিতে পারেনি। এখানে নির্বাচন এবং গণতন্ত্র অনুশীলনে ফাঁকফোকর এতটাই বেশি যে পশ্চিমি দুনিয়া আমাদের ইলেক্টোরাল অটোক্রেসির ঊর্ধ্বে গুরুত্ব দিতে নারাজ। কিন্তু আমাদের এই অমর্যাদার কারণ কী? তলিয়ে ভাবলে এটাই বেরিয়ে আসে যে, এর জন্য দায়ী সামাজিক বঞ্চনা ও বৈষম্য। স্বাধীনতার আটদশক পূর্তি সামনেই। স্বাধীনতার শতবর্ষে ‘অমৃতকাল’ উদযাপন করা হবে বলে মোদি সরকার এখন থেকেই গাওনা-বাজনা শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু তার জন্য জরুরি কোনটা? দেশের মানুষের বঞ্চনা ও বৈষম্য দূর করা। তার কোনো লক্ষণ ধরা পড়ে কি? না। বরং বঞ্চনা এবং বৈষম্য বৃদ্ধিই এই পোড়ার দেশের ভবিতব্য বললে অত্যুক্তি হবে না। এখনও দেশের বেশিরভাগ মানুষ গরিব। তার মধ্যে একটা বড়ো অংশের অবস্থান দারিদ্র্যসীমার নীচে। বঞ্চনা ও বৈষম্য কবে দূর হবে, স্বয়ং ভগবানও জানেন বলে মনে হয় না। বরং এই ক্রনিক ব্যাধি ক্রমবর্ধমান। এসব হ্রাসের কোনো চেষ্টাই নেই। প্রতিবছর কিছু ধনাঢ্য ব্যক্তির ধনসম্পদবৃদ্ধির খতিয়ান নিয়েই আহ্লাদ করে চলেছে দেশ।

এই সমস্যার সমাধান নিহিত প্রকৃত উন্নয়নের ভিতরে। ইটপাথর, লোহালক্কড়ের কিছু ঝাঁচচকচকে নির্মাণই একমাত্র উন্নয়ন নয়। বরং আরো বেশিকিছু। উন্নয়ন আরো বড়ো ব্যাপার এবং তার তাৎপর্য সুগভীর। যে বৃদ্ধি সমাজের সবচেয়ে নীচে অবস্থানকারী মানুষটিকে ছোঁয় না, তা প্রকৃত উন্নয়ন নয়। এই বোধ দেশের অভিভাবকদের হল না বলেই উন্নয়নের নামে জাঁকজমকই চলেছে দেশজুড়ে। গরিব মানুষ গরিবই থেকে যাচ্ছে। তাদের জন্য বরাদ্দ অর্থ নয়ছয় হচ্ছে দশকের পর দশক যাবৎ। এই চরম সত্যটা বহু বছর আগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন। ওড়িশার কালাহান্ডিতে আদিবাসী সমাজের চরম দুর্দশা দেখার পর তিনি অকপটে জানিয়েছিলেন যে, সরকার গরিব মানুষের জন্য যত অর্থ বরাদ্দ করে তার অতিসামান্য অংশ প্রকৃত বেনিফিসিয়ারি পর্যন্ত পৌঁছায়, বাকিটা বারো ভূতে খায়। তারপর ভারতেশ্বরের কুর্সিতে বেশ কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী এসেছেন গিয়েছেন। কিন্তু সেই ট্র্যাডিশন বদলায়নি একচুলও। যেমন এবার আবিষ্কার হল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভায় শুধু শিঙাড়া খাওয়া হয়েছে ২ কোটি টাকার! তাও আবার কোন তহবিল ভেঙে? আদিবাসী উন্নয়নের বরাদ্দ ঘুচিয়ে! এই কাণ্ড হয়েছে গতবছর ১৫ নভেম্বর গুজরাতের নর্মদা জেলায়। বিরসা মুন্ডার জন্মসার্ধশর্তবর্ষ উপলক্ষ্যে জনজাতীয় গৌরব দিবসে ওই সভার আয়োজন করা হয়। ওই সভায় আদিবাসী উন্নয়ন তহবিল থেকে মোট ৫০ কোটি টাকা খরচ করে বিজেপি-শাসিত রাজ্য সরকার। এর মধ্যে ভিআইপিদের স্রেফ শিঙাড়া খাওয়ানো হয়েছে ২ কোটি টাকার! কেলেঙ্কারিটা ফাঁস হয়েছে আরটিআই সূত্রে। না-হলে কারো গোচরে আসত না। সোজা কথায়, মোদির পার্টি উন্নয়ন এবং আদিবাসী উন্নয়নের নতুন সংজ্ঞা লিখেছে। যে টাকায় এই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য স্কুল, জলপ্রকল্প, বিদ্যুৎ, রাস্তা প্রভৃতি তৈরি করাই ছিল দস্তুর, সেই অর্থ বাস্তবে জলাঞ্জলি গিয়েছে। এ কোনও হাসি-মশকরার বিষয় নয়, অত্যন্ত নিন্দনীয় এক কেলেঙ্কারি। এই কাণ্ড যাঁরা ঘটালেন অবিলম্বে তাঁদের বিচারের আওতায় আনা জরুরি। আদিবাসী সমাজের কাছে জবাবদিহি করা উচিত গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রীর এবং দেশের প্রধানমন্ত্রীর। নতুবা আগামী দিনে অন্যরাও উন্নয়নের এই নয় সংস্কৃতিতে গা ভাসাতে পারেন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ