নিস্তব্ধ পাহাড়ি গ্রামে মেঘেদের আনাগোনা। সারা বছরই পর্যটকদের কাছে তা মোহময়। তবে শীতের শোভা যেন একেবারেই ভিন্ন ধরনের।
নিস্তব্ধ পাহাড়ি গ্রামে মেঘেদের আনাগোনা। সারা বছরই পর্যটকদের কাছে তা মোহময়। তবে শীতের শোভা যেন একেবারেই ভিন্ন ধরনের।
কুয়াশাভেজা নির্জন পাহাড়ি পথে নাম না জানা পাখিদের গান শুনে শীতের ক’টা দিন যদি কাটিয়ে দিতে চান তাহলে আপনাকে কোলাখামে একবার আসতেই হবে। শীতকাল ছাড়াও শীতের আমেজ পেতে সারা বছরই পর্যটকদের কাছে টানে কোলাখাম। তবে শীতের কোলাখাম যেন মোহময়ী। দূর পাহাড়ে মেঘেদের বাড়ি। কুয়াশায় মোড়া এক স্বপ্নপুরী। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা নির্জন, শান্ত, কোলাহলমুক্ত একটি গ্রাম এই কোলাখাম। রাত ৮.৩০ মিনিটের শিয়ালদহ-আলিপুরদুয়ার কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস নিউ মাল জংশন পৌঁছে দেয় ঠিক সকাল ন’টায়। আর সেখান থেকে গাড়িতে খুব অল্প সময়েই পৌঁছে যাওয়া যায় কোলাখাম। শিলিগুড়ি স্টেশন ছাড়ার পর থেকে ট্রেনের জানালা দিয়ে দু’চোখ হারিয়ে যায় শাল, পাইন ও সেগুনের ঘন জঙ্গলে। ট্রেনের জানালা দিয়ে সবুজে ঘেরা প্রকৃতির এক নৈসর্গিক রূপ দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম নিউ মাল জংশন। সেখান থেকে কোলাখামের দূরত্ব প্রায় ৭০ কিমি। গাড়িতে সময় লাগে মোটামুটি দুই থেকে তিন ঘণ্টা। নেওড়াভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের অন্তর্ভুক্ত ছোট্ট একটি পাহাড়ি গ্রাম এই কোলাখাম যেন কাঞ্চনজঙ্ঘার বাড়ি। প্রায় সব জায়গা থেকেই দেখা যায় শৃঙ্গ।
লাভা হয়েই যেতে হয় কোলাখাম। পথের দু’ধারের বিস্তৃত চা বাগান, নয়নাভিরাম দৃশ্য ও সৌন্দর্য দেখতে দেখতে খুব অল্প সময়েই পৌঁছে গেলাম ৭২০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত লাভায়। এখানে সারা বছরই শীত হেসেখেলে বেড়ায় বাতাসের হাত ধরে। কুয়াশাভেজা সকাল কড়া নাড়ে রোজ ভোরে। লাভায় রয়েছে বেশ বড় ও সুন্দর একটি মনাস্ট্রি। মূল রাস্তা থেকে কিছুটা ভিতরের দিকে এগলেই পৌঁছে যাওয়া যায় মনাস্ট্রিতে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন মনাস্ট্রির চত্বর। মনাস্ট্রির ভিতর বৌদ্ধ মূর্তিও অসাধারণ সুন্দর। শান্ত, নীরব প্রার্থনা ঘরে কিছু সময় অতিবাহিত করে যেন মন ভরে গেল। এরপর দেখলাম প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ও ঘন পাইন গাছের আড়াল থেকে মোহিনী কাঞ্চনজঙ্ঘা। লাভা থেকে কোলাখামের দূরত্ব ১১ কিলোমিটার। যেতে হবে নেওড়াভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের মধ্যে দিয়ে। ১৯৮৬ সালে এই উদ্যানটিকে সরকারিভাবে জাতীয় উদ্যান হিসাবে ঘোষণা করা হয়। বিস্তৃত এলাকা জুড়ে অবস্থিত এই পার্কটিতে আছে নানা গাছপালা। রয়েছে রকমারি পাখি। পাখিদের মধ্যে ওয়ার্ডস ট্রোজন দেখতেই পক্ষীপ্রেমীরা মূলত আসেন এখানে। ঘণ্টাখানেক নেওড়াভ্যালিতে কাটিয়ে কোলাখাম পৌঁছতে দুপুর গড়িয়ে গেল।
কোলাখামে আমাদের থাকার মেয়াদ দু’দিন। পাহাড় থেকে খানিকটা নীচে সমতল জমির উপর নির্জন সম্পূর্ণ উন্মুক্ত পরিবেশে কাঠের তৈরি দোতলা বাড়ি আমাদের থাকার জায়গা। হোমস্টে পৌঁছে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে ঝুলবারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। দূরের পাহাড়গুলো তখন ঝাপসা। মেঘে ঢেকেছে পাহাড়ের চূড়া। দোতলার বারান্দা থেকে যত দূর চোখ যায় শুধু আঁকাবাঁকা পথ ও পথের দু’ধারে ছোট ছোট বাড়িঘর। সাজানো-গোছানো কিছু দোকান। পাহাড়ের ঢাল আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে শাল, পাইন, চির, ইউক্যালিপটাস গাছ। তাদেরই মাঝে ফুলে ভরা রংবাহারি গাছের মেলা।
কোলাখাম পৌঁছতে দেরি হবে অনুমান করে লাঞ্চ পথেই করেছিলাম। বারান্দায় বসে হালকা জলখাবার খেতে খেতেই সন্ধ্যা নেমে এল। সূর্য তখন পশ্চিম গগনে গোলাপি, কমলা রঙের অপরূপ শোভায় আকাশ রাঙিয়ে তুলেছে। মেঘ ও পাহাড় সম্মিলিত হয়ে কোলাখামকে করে তুলেছে এক স্বপ্নের দেশ।
হোমস্টের বারান্দায় বসে কেটে গেল সন্ধ্যা। রাতের আড্ডায় চলল গরম-গরম পকোড়া ও কফি। সবাই ক্লান্ত, তাই তাড়াতাড়ি ডিনার সেরে শুয়ে পড়লাম। বুঝতে পারিনি যে পরদিনের সকাল আমাদের সবার কাছে হয়ে থাকবে চিরস্মরণীয়। ঘুম ভাঙতেই বারান্দা থেকে দেখতে পেলাম কাঞ্চনজঙ্ঘার মোহময়ী রূপ। উত্তরের আকাশে উন্নত ও সুব্যপ্ত তার রুপোলি মনমোহিত করা রূপ। চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার অভিজ্ঞতা বহুদিন মনে থাকবে। ন’টার আগে ব্রেকফাস্ট তৈরি হবে না, তাই ঝটপট বেরিয়ে পড়লাম ক্যামেরা নিয়ে কোলাখামের পাহাড়ি পথে পাখির খোঁজে।
কোলাখাম হল পাখিদের স্বর্গরাজ্য। শীতকালে খাবারের খোঁজে পাহাড় থেকে নেমে আসা পাখিরা ভিড় জমায় কোলাখামে। দেখতে পেলাম, গ্রিন ব্যাকড টিট, ব্লু ফ্রন্টেড রেডস্টার্ট, স্মল নিলটাভা, হিমালয়ান ব্ল্যাক বুলবুল, রুফাস সিবিয়া ইত্যাদি পাখি। ছবি তুলে ফিরে এলাম হোমস্টেতে। ব্রেকফাস্ট করে দেখে নিলাম কোলাখামের আশপাশের দ্রষ্টব্য। ঘণ্টাখানেক দুরে অবস্থিত অপূর্ব ছাংগে ফলস। সমতল থেকে প্রায় ২০০ ফুট নীচে পাথুরে পথ ধরে হেঁটে পৌঁছতে হয় এই ঝর্ণার কাছে। দেখলাম মেঘেদের কাছাকাছি সুন্দরী রিশপের পাহাড়ি চুড়ো। পরিষ্কার আবহাওয়ায় এখান থেকে দেখতে পাওয়া যায় নাথুলা পাস, গ্যাংটক ও তিব্বতের নানা পাহাড়। কোলাখাম থেকে ঘণ্টা দুই দূরত্বে লোলেগাঁওতে গুম্বাধারা মনাস্ট্রি সহ অপূর্ব অর্কিড ও ফুলের সমাহার দেখে ফিরে এলাম হোমস্টেতে।
পাহাড়ে তখন সন্ধ্যা। পাহাড়ি মেয়েরা বাড়ি ফিরছে পিঠে তাদের জ্বালানি কাঠের বোঝা। মেঘে ঢেকেছে চারিদিক, এ যেন পাখিদের সঙ্গে মেঘেদেরও বাড়ি ফেরা। রাত হতেই শুরু হল বৃষ্টি, জাঁকিয়ে পড়ল ঠান্ডা। ঝমঝম বৃষ্টি, ঘুমন্ত কোলাখাম! রাত জেগে সেই বৃষ্টির গান শুনলাম অনেকক্ষণ। নিস্তব্ধ পাহাড়ি গ্রামটা বোধহয় কিছু বলতে চাইছিল আমায়।
তপন মুখোপাধ্যায়