পালামৌয়ের জঙ্গল আর অরণ্যে ঘেরা দুর্গ হতেই পারে আপনার শীতভ্রমণের সেরা ঠিকানা।
পালামৌয়ের জঙ্গল আর অরণ্যে ঘেরা দুর্গ হতেই পারে আপনার শীতভ্রমণের সেরা ঠিকানা।
উত্তর-পশ্চিম ঝাড়খণ্ডের পালামৌ জেলায় বেতলা জাতীয় উদ্যান থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বে ঔরঙ্গা নদীর তীরে ষোড়শ শতাব্দীতে গড়ে তোলা হয়েছিল দু’টি অসাধারণ দুর্গ। জনসাধারণের কাছে যেটি পালামৌ দুর্গ নামেই পরিচিত। যদিও উপজাতি সম্প্রদায়ের হাতে নির্মিত বলে একশো কুড়ি মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট এই দুর্গটি স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে পরিচিত ‘উপজাতীয় দুর্গ’ নামে। বর্তমানে দু’টি দুর্গেরই ধ্বংসাবশেষ পড়ে রয়েছে। তবে পর্যটকরা বেতলা অভয়ারণ্য ভ্রমণে গেলে ঘন সবুজ গাছগাছালির মধ্যে অবস্থিত দুর্গ দু’টি দেখেতে ভোলেন না।
ঐতিহাসিক গবেষণা থেকে জানা যায়, ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে প্রথম দুর্গটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় রাকসেল রাজবংশের সময়। এটি চেরো রাজাদের ঠিক অগের রাজবংশ। পরে, সপ্তাদশ শতাব্দীতে, ১৬২৮ থেকে ১৬৫৮ সালের মধ্যে দুর্গটি পুনর্নির্মাণ করিয়েছিলেন চেরো রাজবংশের রাজা প্রতাপ রায়। আরও পরে প্রথম দুর্গটির কাছেই একটা উঁচু টিলার উপর তৈরি হয় দ্বিতীয় দুর্গ। ১৬৫৮ থেকে ১৬৭৪ সালের মধ্যে সেটি নির্মাণ করিয়েছিলেন চেরো রাজবংশের অন্যতম শাসক মেদিনী রায়। তিনি ১৬৬২ থেকে ১৬৭৪ সাল পর্যন্ত, দীর্ঘ তেরো বছর রাজত্ব করেছিলেন। একসময় চেরো রাজাদের ক্ষমতার কেন্দ্রভূমিই হয়ে উঠেছিল এই দুর্গ দু’টি। কালের করালগ্রাসে আজ তা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও এর অতীত গরিমা একটুও ম্লান হয়নি।
রাঁচি থেকেই শুরু করতে পারেন এই সফর। যদি কলকাতা থেকে যান তাহলে হাওড়া স্টেশন থেকে ধরতে পারেন ক্রিয়াযোগ এক্সপ্রেস। রাঁচি পৌঁছবেন পরদিন ভোরে।
স্টেশনের বাইরে এসে পছন্দমতো কোনও হোটেলে উঠে ক্ষণিক বিশ্রাম নিয়েই বেরিয়ে পড়ুন রাঁচি দর্শনে। একটা গাড়ি ভাড়া করে একে একে দেখে নিন রাজরাপ্পায় দেবী ছিন্নমস্তা মন্দির এবং বিখ্যাত হুড্রু ও জোনহা ফলস। প্রায় ৭৪৫টি সিঁড়ি ভাঙতে হবে জলপ্রপাতগুলো পৌঁছতে। তবে সিঁড়ি বেশ চওড়া ও বাঁধানো। সবুজে ঘেরা এক অসাধারণ নৈসর্গিক পরিবেশে বহু উঁচু থেকে তিনটি ধারায় সজোরে ঝরে পড়ছে জোনহা ফলস। হাতে সময় থাকলে দেখে নিতে পারেন সীতা ফলস ও গীতাসুদ বাঁধ।
পরদিন সকালেই রওনা দিন বেতলার পথে। দেখবেন শহর ছাড়াতেই গাড়ি উঠবে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে। কোথাও বা পথের দু’ধারের বিস্তীর্ণ শালবন আপনাকে সাদর অভ্যর্থনা জানাবে। যেতে যেতে একসময় পেরিয়ে যাবেন বাঙালিদের অতি প্রিয় জায়গা কলাস্কিগঞ্জ। তারপর টানা চলবে গাড়ি। বেতলা পৌঁছতে পৌঁছতে হয়তো বেলা খানিকটা পড়ে আসবে।
রাতটা হোটেলে কাটিয়ে পরদিন ভোরেই অরণ্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে বেরিয়ে পড়ুন বেতলা অরণ্য ভ্রমণে। হাতির পিঠে চড়ে কিংবা খোলা জিপে করে এই অরণ্য সফর করতে পারেন। আঁকাবাঁকা অরণ্যপথে চলতে চলতে এক ঘণ্টা কখন পেরিয়ে যাবে টের পাবেন না। এই সফরে পথের দু’পাশে তাকালে দেখবেন ঘন সবুজ প্রান্তরে কেমন নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে হাতি, সম্বর, হরিণ, বাইসন, নীলগাই, ময়ূর, বানর ছাড়াও অন্যান্য বন্যপ্রাণী।
এবার অরণ্য ভ্রমণ সেরে বেরিয়ে পড়ুন পালামৌর পথে। পথে পড়বে কমলদহ ঝিল। অরণ্য ঘেরা প্রকৃতির মাঝে অপরূপ জলাশয়। দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। ওখানে রয়েছে একটা উঁচু টাওয়ার। টাওয়ারের মাথায় উঠে চারপাশটা তাকিয়ে দেখুন। মুগ্ধ হয়ে যাবেন। এরপর চলুন ঔরঙ্গা নদীর তীরে পালামৌ দুর্গের কাছে। মাত্র মিনিট পাঁচেকের পথ। গাড়ি থেকে নেমে দেখবেন ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও আজও কেমন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দুর্গের সুদীর্ঘ তোরণটি। ভিতরে ঢুকে দেওয়াল থেকে খসে পড়া চুন সুরকির গাঁথনি দেখতে দেখতে চলে আসুন দ্বিতীয় দুর্গটির কাছে। দেখবেন বিস্তীর্ণ প্রান্তর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা কারুকার্যমণ্ডিত এই দুর্গটির ভিতরে রয়েছে অস্ত্রাগার, শস্যভাণ্ডার, বিভিন্ন ধর্মের উপাসনাস্থল, এমনকী ঝরনার জলে নিরিবিলিতে রানিদের স্নান করার জন্য সুড়ঙ্গ পথ।
পালামৌ দুর্গ দেখে হোটেলে ফেরার পথে দেখে নিন কোয়েল ও ঔরঙ্গা নদীর মিলিত স্থান কেচকি সঙ্গম। প্রশস্ত নদীতট। একটু দূরে তাকালে দেখবেন নদীপথের দু’প্রান্ত জুড়ে রয়েছে একটি বৃহৎ সেতু। ট্রেন চলছে উপর দিয়ে। এরপর রওনা দিন শাল, সেগুন, পাইনে ঘেরা নেতারহাটের পথে। ঘণ্টা তিনেকের মধ্যেই পৌঁছে যাবেন সেই মায়াময় অরণ্যভূমিতে।
সমীর কুমার ঘোষ