নিজস্ব প্রতিনিধি, আসানসোল: পশ্চিম বর্ধমান জেলাজুড়েই ছড়িয়ে পড়েছে শুনানি আতঙ্ক। প্রায় প্রতি বাড়ির দরজাতেই কড়া নাড়ছেন বিএলওরা। নোটিস গ্রহণ করে শুনানি কেন্দ্রে হাজির হতে হচ্ছে ভোটারদের। প্রথম দফায় এক লক্ষ ৪৫ হাজার ভোটারের শুনানি করার পর এখন ডাক পড়েছে ২ লক্ষ ৮১ হাজারের। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, শুনানিতে ডাক পাওয়া ভোটারদের মধ্যে প্রায় দু’লক্ষ ভোটারের তথ্যে সামান্য বানান ভুল! বাংলা সহ দেশের ১২ রাজ্যে একসঙ্গে এসআইআর শুরু হয়েছে। অভিযোগ, বাংলা ছাড়া অন্য রাজ্যে এধরনের ভুল ইআরওরাই যাচাই করে নিষ্পত্তি করছেন। বাংলার ক্ষেত্রেই প্রতি ভোটারকে হাজির হতে হচ্ছে শুনানি কেন্দ্রে। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, বিজেপির কাছে বাঙালি বশ্যতা স্বীকার করেনি বলেই তাঁদের উপর অত্যাচার করা হচ্ছে। দেশের অন্য কোথাও মাইক্রো অবজার্ভার নিয়োগ করা হয়নি। শুধুমাত্র বাংলার ক্ষেত্রেই কেন করা হয়েছে? দেশের সর্বত্র এক নিয়ম পালিত না হওয়ায় প্রশাসনিক মহলেও ক্ষোভ বাড়ছে। অভিযোগ উঠছে, ইআরওদের ক্ষমতা অলিখিতভাবে খর্ব করা হয়েছে।
রাজ্যের আইনমন্ত্রী মলয় ঘটক বলেন, দেশের সংবিধান, নির্বাচন কমিশনের নিয়ম সব রাজ্যের জন্যই এক। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের দু’টি রূপ দেখা যাচ্ছে। অন্য রাজ্যে মাইক্রো অবজার্ভার নিয়োগ করা হয়নি। বাংলার ক্ষেত্রে করা হয়েছে। অন্য রাজ্যের ভোটারদের বানান ভুল সংশোধন করাতে শুনানি কেন্দ্রে যেতে হচ্ছে না। বাংলার ক্ষেত্রে যেতে হচ্ছে। আমরা জানতে চাই বাঙালি হওয়া কী অপরাধ?
বিজেপি জেলা সহ সভাপতি প্রশান্ত চক্রবর্তী বলেন, নির্বাচন কমিশনের সর্বদলীয় বৈঠকে তৃণমূল কংগ্রেসেরও প্রতিনিধি থাকে। সেখানে তাঁরা কেন সরব হননি। প্রয়োজনে তাঁরা আদালতে যাক। শুধু অভিযোগ করে মানুষকে বিভ্রান্ত করে কী লাভ।
মকর সংক্রান্তিতে জয়দেবে আশ্রমে থাকেন দুর্গাপুরের বাসিন্দা মদন কর্মকার। তিনি ডিএসপির স্থায়ী শ্রমিক ছিলেন। ২০০৯ সালে অবসর নেওয়া ধর্মপ্রাণ মানুষটি প্রতি বছর এই সময়ে জয়দেবে থাকেন। মকর সংক্রান্তির দিনই নির্বাচন কমিশন শুনানিতে ডেকে ছিল। তিনি অবশ্য নিজের ধর্মীয় ভাবাবেগকে বিসর্জন দেননি। বলছিলেন, এত বছর কেন্দ্রীয় সংস্থায় কাজ করেছি। সব নথি রয়েছে। এখন আমাকে প্রমাণ করতে হবে আমি ভারতীয়! মকরের দিন শুনানিতে যেতে পারিনি। কী হবে জানি না। শুধু মদনবাবুই নন, জেলার লক্ষ লক্ষ ভোটার ঘোর অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে—তাঁদের নাম থাকবে তো চূড়ান্ত ভোটার তালিকায়। পরিবারের কোনও বা একাধিক সদস্যের ঠাঁই হবে না তো ডিটেনশন ক্যাম্পে? স্বাভাবিকভাবেই আসানসোল থেকে দুর্গাপুর— বাড়িতে বাড়িতে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির প্রতি বাড়ছে ক্ষোভ। বিশেষ করে বাংলার জন্য কেন আলাদা নিয়ম হবে, তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন।
তৃণমূল নেতা ভি শিবদাসন দাসুর মা কেরলে থাকেন। অসুস্থতার জন্য তাঁর স্ত্রীও সেখানে। তিনি বলেন, পরিবারিক কারণে প্রায় কেরলে যেতে হয়। সেখানে গিয়ে দেখছি, বানান ভুলের জন্য কাউকেই শুনানিতে ডাকা হচ্ছে না। এসআইআর নিয়ে কারও কোনও মাথা ব্যাথা নেই। যত নিয়ম কী বাংলার জন্য?
প্রশাসন সূত্রে খবর, এসআইআর শুরু করার বিজ্ঞপ্তিতে নির্বাচন কমিশন ইআরও এবং এইআরওদের ক্ষমতা দিয়েছিল। তাঁরা নথি দেখে সন্তুষ্ট হলে ভোটারকে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় যুক্ত করতে পারেন। এমনকী, তাঁরা ‘স্পিকিং অর্ডার’ও দিতে পারেন। কিন্তু প্রায় শেষের পর্যায়ে এসে ইআরও, এইআরওরা তা করতে পারছেন না। যে কোনও সন্দেহজনক ভোটারকেই শুনানিতে হাজির করতে বলা হচ্ছে।