হিমাংশু সিংহ: গেরুয়া পাগড়ি, পাল্লা দিয়ে গেরুয়া জহর কোট, গলায় তেরঙ্গা উত্তরীয়, মুখে মৃদু হাসি ঝুলিয়ে দীর্ঘ দু’ঘণ্টার যে ভাষণটা প্রধানমন্ত্রী দিলেন তা রাষ্ট্রবাদী চিন্তার প্রতিফলন না স্রেফ গদি বাঁচানোর প্রয়াস? অবশ্যই লালকেল্লাকে সাক্ষী রেখে সাম্প্রতিক কালে তাঁর দীর্ঘতম একাঙ্ক অভিনয়! সেখানে অপারেশন সিন্দুরের কৃতিত্ব জাহির থেকে শুরু করে কৃষকদের স্বার্থে দেওয়াল হয়ে দাঁড়ানোর আশ্বাস আছে। অনুপ্রবেশ রুখে দেওয়ার কথা আছে। ছত্রে ছত্রে সমৃদ্ধ ভারতের ব্লুপ্রিন্ট উচ্চারিত হয়েছে কর্পোরেট বিপণনের ভঙ্গিতে। আছে স্টার্ট আপের রঙিন স্বপ্ন ফেরি। কিন্তু সব ছাপিয়ে আছে কুর্সি দখলে রাখার আন্তরিক তাগিদ। নাহলে যাবতীয় পরম্পরা ভেঙে স্বাধীনতা দিবসে গেরুয়ায় সজ্জিত হয়ে আরএসএসকে বিশ্বের বৃহত্তম এনজিও ঘোষণা করেন! এত তোষামোদ কেন? সঙ্ঘ কর্তাদের খুশি করতে? অবসরের গুঞ্জন দূরে সরাতে? সবাই জানে আরএসএসের শতবর্ষ সমাগত। কিন্তু একইসঙ্গে একমাস বাদেই ১৭ সেপ্টেম্বর মোদিজির জন্মদিন। ৫৬ ইঞ্চির ৭৫ বছরে পদার্পণ। এই সমাপতন স্রেফ নিয়ম ভাঙার ব্যতিক্রমী ক্ষণ না সঙ্ঘের অনুশাসনকে সম্মান জানানোর অখণ্ড মুহূর্ত, তা সময়ই বলবে। কিছুদিন আগেই সঙ্ঘ প্রধান মোহন ভাগবত জানিয়ে দিয়েছেন, ৭৫ বছরের পর আর সংগঠন কিংবা সরকারের কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা উচিত নয়। তাঁর লক্ষ্য স্পষ্ট। পিছন থেকে সঙ্ঘের চিন্তাধারাই বিজেপিকে চালিত করে। মোদিজি যতই লম্ফঝম্প করুন, সরকারি পয়সায় দেশে দেশে ঘুরে বেড়ান, বর্তমান সরকারের অন্তরাত্মা নাগপুরের দেরাজেই আজও সুরক্ষিত। তাই দেশজুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন, মোদিজি কি সরে দাঁড়িয়ে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে ব্যাটন তুলে দেবেন? তবে ৭৯তম স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ যদি কোনও ইঙ্গিত হয়, তাহলে বলতেই হবে বিরাট কোনও অঘটন ঘটে না গেলে সে গুড়ে বালি। নরেন্দ্র মোদি আপাতত সরছেন না। সেরকম কোনও ইচ্ছা তাঁর নেই।
বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবার কাকে প্রধানমন্ত্রী রাখবেন তা একান্তভাবেই তাঁদের নিজস্ব ব্যাপার। যদি দল ঘোষণা করে পিছুটানহীন মোদিজিই ২০৪৭ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী থাকবেন এবং সেই পর্যন্ত সাধারণ নির্বাচনে যদি গেরুয়া শিবিরই দেশের মানুষের সমর্থন জিতে ক্ষমতায় থাকে তাহলেও কিছু বলার নেই। বেঁচে থাকলে ৯৭ বছরের ‘যুবক’ প্রধানমন্ত্রী দেখব আমরা! অমৃতকালে নেহরুর প্রতি বাৎসরিক বিষোদ্গার শুনব! গিরগিটির মতো রং বদলাবে দু’শো জুমলা! কিন্তু তাবলে ডাহা মিথ্যাচরণ? এতে আরএসএসের গরিমা কি বাড়ল? পৃথিবী দূর অস্ত, আমরা বাঙালিরা প্রাণ থাকতে মানতে পারব না, আরএসএস এদেশের বৃহত্তম এনজিও। রাজনীতিকে দূরে সরিয়ে বিচার করতে বসলে শুধু বাংলা কেন গোটা দেশের হিন্দু সমাজই রামকৃষ্ণ মিশনকে অনেক উচ্চ আসনে স্থান দেয়। ভবিষ্যতেও দেবে। সেবার আদর্শের ফাঁকে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল ও আদর্শের পৃষ্ঠপোষকতা রামকৃষ্ণ মিশন করে না। কিন্তু ঝড়, তুফান, বন্যা, ধস, ভূমিকম্প সহ যে কোনওরকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় এদেশে রামকৃষ্ণ মিশনের আগে কেউ নেই। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রসারেও আজ স্বামী বিবেকানন্দের এই প্রতিষ্ঠান অপ্রতিদ্বন্দ্বী। শিব জ্ঞানে জীব সেবার যে ধ্রুবপদ বেঁধে দিয়ে গিয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দ, শতবর্ষ পেরিয়েও তা আজও সঞ্চারিত সংগঠনের রক্তে মজ্জায়। মোদিজিও তা বিলক্ষণ জানেন। সব জেনেও স্রেফ নিজের আসন বাঁচাতে এই চরম সত্যের অপলাপ করলেন কেন প্রধানমন্ত্রী, তাও স্বাধীনতা দিবসের সকালে। রামকৃষ্ণ মিশনের এই অবমাননা, এই অপমান মেনে নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এটা ঠাকুর-স্বামীজির আদর্শ এবং বাঙালি অস্মিতায় বড় আঘাত নয়?
রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠা ১৮৯৭ সালের ১ মে। ১৮৮৬ সালের ১৬ আগস্ট ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দেহ রাখার প্রায় ১১ বছর পর। আজ প্রতিষ্ঠানের ১২৮ বছর চলছে। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবধারা, তাঁর আধ্যাত্মিক প্রকাশের ব্যাপ্তি আরও অন্তত কয়েক দশক জুড়ে বিস্তৃত। কাশীপুর উদ্যানবাটিতে শ্রীরামকৃষ্ণের পদার্পণ ১৮৮৫ সালের ডিসেম্বরে। বছর ঘুরতেই তাঁর কল্পতরু রূপ দেখেছে মানবজাতি। ‘তোমাদের চৈতন্য হোক’ এই বাক্যবন্ধে ধন্য হয়েছে বাংলার মাটি। শিকাগোর ধর্মসভায় স্বামীজির বিশ্বজয় করা ভাষণ ১৮৯৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। স্বামী বিবেকানন্দ দেহ রেখেছেন ১৯০২ সালের ৪ জুলাই। এরও ২৩ বছর পর যে সঙ্ঘ পরিবারের জন্ম তার সঙ্গে রামকৃষ্ণ মিশনের তুলনা! আজও সারা পৃথিবীতে শুধু সনাতন বৈদিক নয়, উদার আধুনিক হিন্দু ধর্মের একমাত্র প্রতীক ঠাকুর স্বামীজির ভাবধারা। অথচ তার কথা মনে পড়ল না কেন হিন্দুত্বের ‘পোস্টার বয়’ মোদিজির? কারণ রামকৃষ্ণ মিশনের হিন্দুধর্ম বিদ্বেষ, বিভাজন, বিভেদের কথা বলে না। ভোটের কথা বলে না। ঠাকুর স্বামীজির আদর্শ সব অর্থেই ‘ইনক্লুসিভ’, সবাইকে নিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করাই একমাত্র লক্ষ্য। ক্ষমতা দখলের ভোটের কড়ি কেনার জন্য নয়। তাই সবজান্তাদের ‘চৈতন্য’ হয়েও হয় না। আমাদের মতো নির্বোধদের শিক্ষিত করতেই যুগে যুগে শ্রীরামকৃষ্ণদের আর্বিভাব জরুরি। লোকশিক্ষার আড়ালে ‘চৈতন্য’ জাগরণ আর যাই হোক রাজনীতির কারবারিদের কাজ হতে পারে না!
মোদিজির এবারের ভাষণের মূল্যায়ন করার আমি কেউ নই। ইন্দিরা গান্ধীর মেয়াদ ছাপিয়ে তিনি এখন দেশের সবচেয়ে বেশি সময়ের প্রধানমন্ত্রীর দৌড়ে। কিন্তু তাবলে তিনি দু’হাতে জুমলা বিতরণ করবেন আর বিনা বাক্যব্যয়ে দেশবাসী তা মেনে নেবে এটাও গণতন্ত্রে নৈব নৈব চ। ক্ষমতায় আসার আগে তিনি বছরে দু’কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দেশ জানে, যুব সমাজ জানে তার একবর্ণও রক্ষা করা হয়নি। দশ লক্ষ সরকারি পদ ফাঁকা। রেলের একটা বড় কাজ আউটসোর্সিং হয়ে বেসরকারি হাতে। বেকারত্ব ৪৫ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে। তাঁর নোট বাতিলের কুনাট্য কালো টাকা খতম করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবু লালকেল্লায় দাঁড়িয়ে তিনি জেনেশুনে আবার একটা গুগলি দিলেন। জানালেন, আগামী দিনে কেউ বেসরকারি চাকরি পেলে এবং তার নাম ইপিএফওতে নথিভুক্ত হলেই ১৫ হাজার টাকা দেবে সরকার। এই টাকা দেওয়া হবে দুই কিস্তিতে। প্রথমটা ইপিএফওতে নথিভুক্তির ৬ মাস পর আর দ্বিতীয়টি বছর ঘুরলে। যিনি চাকরি দেবেন তার জন্যও কিছু সুবিধার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এই প্রকল্পের গালভরা নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্রধানমন্ত্রী বিকশিত ভারত রোজগার যোজনা’। সবচেয়ে তাজ্জবের ব্যাপার, এতে নাকি দু’বছরে সাড়ে তিন কোটি নতুন চাকরি হবে। আচ্ছা বলুন তো, এর চেয়ে বড় জুমলা এই পঁচিশ সালে আর কী হতে পারে। সরকার যেখানে হাল ছেড়ে দিয়েছে, বাজার যেখানে মন্দা সেখানে বিকশিত ভারত রোজগার যোজনায় কোনও বেসরকারি নিয়োগ কর্তা লাইন দিয়ে ছেলে নিতে যাবে কোন আহ্লাদে? এতে বেকার সমস্যার সুরাহা হবে! আসলে স্কিমটাই পুরনো। আগেই ফ্লপ হয়েছে। এখন নাম বদলে বাজার গরম করার চেষ্টা মাত্র!
মোদিজি কোনওদিন চমক দিতে পিছপা হন না। এটাই ওনার ইউএসপি। এবারও তার অন্যথা হয়নি। আসন্ন দেওয়ালিতে তিনি দেশবাসীকে ডাবল ধামাকা উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বিলিয়েছেন। খুব ভালো কথা। কিন্তু তাও কি নতুন। গত আট ন’মাস ধরে জিএসটি’র দুটি ধাপ চালুর প্রস্তাব বিবেচনাধীন। পাঁচ ও আঠারো শতাংশ। এনিয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর উপর ৫ শতাংশ জিএসটি চালুর ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী কতবার বিবৃতি দিয়েছেন, কে মনে রেখেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের সরকার শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি। গত কয়েক বছর ধরে বলা হচ্ছে মেডিকেল ইনসিওরেন্সের উপর ১৮ শতাংশ জিএসটি সম্পূর্ণ অনৈতিক এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থের পরিপন্থী। আজ জিএসটি চালুর ৮ বছর পরও কর কাঠামো সরল হওয়ার পরিবর্তে জটিলই থেকে গিয়েছে। নিত্যপণ্যের দাম কমেছে বলে সরকারের কেষ্টবিষ্টুদের দাবি নস্যাৎ করে দিয়েছে খোদ বাজারই। পেট চালাতে সাধারণের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়। এবার দেওয়ালির দু’মাস আগে থাকতে ঢাক পিটিয়ে দেওয়া হল দাম কমবে। সত্যি কমবে তো! নাকি বিহারের ভোট চলে গেলেই আবার যে কে সে! আবার পরের নির্বাচনের অপেক্ষা! আবার নতুন পোশাক, পাগড়ি, বর্ণচ্ছটার রামধনু, আবার স্বাধীনতার শতবর্ষের ললিপপ ঝোলানো!
সাক্ষাৎ বহুরূপীরা এভাবেই রং বদলে বদলে যান! মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে কার্যোদ্ধারই তাঁদের মূল মন্ত্র। মাননীয় নরেন্দ্র মোদিও কখনও গেরুয়া বস্ত্র মুড়ে ধ্যানে বসেন কেদারনাথ, কিংবা কন্যাকুমারীতে। কখনও আবার দামি হ্যাট, জংলা টি-শার্ট আর কার্গো প্যান্টে জঙ্গলসাফারিতে গিয়ে বয়স সাঁইত্রিশের ‘ওয়াইল্ডলাইফ ফোটোগ্রাফার’ বনে যান। দেওয়ালিতে সীমান্তের সেনাশিবিরে যান পাক্কা ফৌজির বেশে। ফি বছর স্বাধীনতা দিবসে তাঁর নিত্যনতুন পাগড়ি সজ্জা নিয়েও আলোচনা হয়েছে বার বার। চর্চায় উঠে এসেছে দশ লাখি স্যুট। এবার তিনি সঙ্ঘকে ছুঁতে চান। সঙ্গে নিজের রাজ্য গুজরাত। তাই গুজরাতি ঘরচোলা কাপড়ের পাগড়িতে রাঙিয়েছেন নিজেকে। কিন্তু বর্ণাঢ্য সেই রংবাহার কি দু’দণ্ড শান্তি দিল, আশ্বস্ত করল, আনন্দ দিল আমাদের। ঢেউ তুলল তাঁর অনুগামীদের বুকে। নাকি কোনও নতুন ছবির ট্রেলার বলে এক ঝলক দেখেই দূরে সরিয়ে দিল দেশবাসী। একই চমক বারবার চলে না। বহু ব্যবহারে ক্লিশে হয়ে যায়। নরেন্দ্র মোদিকে একটাই নিবেদন, বাস্তবের মাটিতে নেমে আসুন আটপৌরে সাজে। দেশবাসী আসলটা দেখতে চান, অনুভব করতে চান, বাহারি পুতুল নাচ বন্ধ হোক।