Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

রোমার আচমকা প্রত্যাবর্তন ও গুঞ্জন ঘোষ, মুক্তিপণের দাবি অস্বীকার, ২০ লক্ষ টাকা গেল কোথায়?

মুক্তিপণের দাবি অস্বীকার করেছিল রোমার পরিবার। সেটা আরও বেশি ধন্দের। কারণ, যে সব লোকেশন থেকে ফোন এসেছিল, পুলিস সেখানে পৌঁছেও কিছু হদিশ করতে পারেনি।

রোমার আচমকা প্রত্যাবর্তন ও গুঞ্জন ঘোষ, মুক্তিপণের দাবি অস্বীকার, ২০ লক্ষ টাকা গেল কোথায়?
  • ২০ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ঘটনাবহুল জীবন। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে আমাদের চারপাশে কিছু না কিছু ঘটে চলেছে। বহু ঘটনা হারিয়ে যায় মুহূর্তের ভিড়ে। কোনও ঘটনা উঠে আসে শিরোনাম হয়ে। আর তার মধ্যে কিছু রেখে যায় দাগ। রক্তের দাগ। এমনই সাড়া ফেলে দেওয়া কয়েকটি ঘটনা ফিরে দেখল বর্তমান। সোহম করের কলমে।

Advertisement

মুক্তিপণের দাবি অস্বীকার করেছিল রোমার পরিবার। সেটা আরও বেশি ধন্দের। কারণ, যে সব লোকেশন থেকে ফোন এসেছিল, পুলিস সেখানে পৌঁছেও কিছু হদিশ করতে পারেনি। ফলাফল স্রেফ শূন্য। এখানেই প্রশ্ন, মুক্তিপণ দিয়ে না থাকলে রোমা মুক্তি পেল কীভাবে? মুক্তিপণের দাবি পরিবার অস্বীকার করল কেন? পুলিস প্রথমিকভাবে অনুমান করছিল, ব্যবসায়িক শত্রুতাতেই এই অপহরণ। সেটাই যদি হবে, তাহলে মুক্তিপণ ছাড়া রোমাকে মুক্তি দিল কেন? ততক্ষণে অবশ্য রাজনৈতিক চাপানউতোর পশ্চিমবঙ্গের আনাচে কানাচে আছড়ে পড়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কাছে রোমার বাবা সত্যনারায়ণ ঝাওয়ারের মেয়েকে ফিরিয়ে দেওয়ার কাতর আর্জি জানিয়েছিলেন। আবার ঝাওয়ার-বাড়িতে ভিড় জমিয়েছিলেন স্থানীয় তৃণমূল কাউন্সিলাররা। গিয়েছিলেন প্রতিবেশী সঙ্গীতশিল্পী শিবাজি চট্টোপাধ্যায়ও। ছেলে-মেয়েদের স্কুল-কলেজে পাঠানো যে কতখানি উদ্বেগজনক, তা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারপরই হঠাৎ পাওয়া গেল রোমাকে। অপহরণের ঠিক পরের দিন... শনিবার ভোররাতে। 
বাতাসে যেন ‘খেলা’ ঘোরার গন্ধ। রহস্য কেমন যেন মেঘের আড়াল নিচ্ছে। আর মেঘ গর্জন করে সকলকে বলছে, আইন-শৃঙ্খলার মরূদ্যানেই রয়েছে রাজ্য। কিন্তু যে মেঘ বেশি গর্জায়, তত কি বর্ষায়? আসলে অপহরণের কাহিনিটাই যে ভোজবাজির মতো উবে যাচ্ছিল। শনিবার ভোররাতে রোমাকে ফুলবাগানের কাছে একটি গ্যারাজের সামনে পাওয়া গেল। ওইখানেই পুলিস টহল দিচ্ছিল। রোমাকে দেখতে পেয়েই পুলিস ও আত্মীয়স্বজনরা সল্টলেকের বাড়িতে নিয়ে যায়। পুলিস ও পরিবারের দাবি ছিল, কোনও মুক্তিপণ দেওয়া হয়নি। প্রশ্ন ওঠে, পাঁচবার ফোন করে মুক্তিপণ চাওয়া অপহরণকারীরা এমনি এমনি রোমাকে নিয়ে গেল, আর ১৫ ঘণ্টার মধ্যে ছেড়েও দিল? মহাকরণে রাজ্য পুলিসের আইজি (আইন-শৃঙ্খলা) চয়ন মুখোপাধ্যায় সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, ‘দুষ্কৃতীরা মুক্তিপণ চেয়েছিল। কিন্তু পুলিসি টহলদারির চাপে তারা রোমাকে ছেড়ে দিয়েছে।’ তখনও কিন্তু দুষ্কৃতীদের খোঁজ বন্ধ করেনি পুলিস। অপহৃত রোমার জবানবন্দি অনুযায়ী, তাঁকে নিয়ে প্রথমে শ্যামবাজার, তারপর বিটি রোড ধরে দক্ষিণেশ্বর ব্রিজ হয়ে হাওড়ার বালিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নির্মীয়মাণ একটি ফ্ল্যাটে রোমাকে রাখা হয়েছিল তাঁকে। রোমার বয়ান দিয়েছিলেন, শ্যামবাজারের কাছে গাড়িতে বসেই রোমার ফোন থেকে অপহরণকারীরা কল করে বলেছিল, ‘২৫ লাখ আমাদের। ২৫ লাখ অন্য পার্টিকে দিতে হবে।’ পুলিস রোমার ফোনের কানেকশন বন্ধ করে দিতেই এসটিডি বুথ ব্যবহার শুরু করে দুষ্কৃতীরা। 
মুক্তিপণের বিষয়টা স্বীকার করেনি পুলিসও। তবে সূত্রের দাবি, একটি মোটর সাইকেলে চেপে তিন দুষ্কৃতী কলকাতা ও উত্তর ২৪ পরগনার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে মুক্তিপণের জন্য ফোন করে গিয়েছে। প্রথমে বাইপাসের স্বভূমির সামনে টাকা নিয়ে আসতে বলা হয়। তারপর এনআরএসের সামনে। তারপর সেন্ট্রাল মেট্রো স্টেশনের সামনে। বারবার লোকেশন বদলানোর উদ্দেশ্য একটাই—পুলিস ঘাপটি মেরে বসেছিল। এরপর ‘সেফ জোন’ ঠিক করা হয় ফুলবাগান। সেখানেই নাকি রোমার পরিবার একটি ব্যাগে ২০ লক্ষ টাকা রেখে দিয়েছিল। সেই টাকা নিয়ে চলে যাওয়ার ঘণ্টা খানেক পর রোমাকে ফুলবাগানে ওই গ্যারেজের সামনে ফেলে দেওয়া হয়। 
দীর্ঘক্ষণ রোমাকে আটকে রেখে কী করেছিল দুষ্কৃতীরা? এর উত্তরও আবছা। রোমা নাকি পুলিসকে বলেছিলেন, তাঁকে দই খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। পুলিসের একটি সূত্র বলে, চড় মারা হয়েছিল। ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। এদিকে ভবানী ভবনে তখন জোর জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব চলছে। রোমার দুই বন্ধু ওসামা ও আশিসকেও ডেকে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেদিন গাড়িতে থাকা শবরীকে ডাকা হল না। রোমা জানিয়েছিলেন, মারুতির পিছনে একটি মোটর সাইকেলও ছিল। সব মিলিয়ে মোট আট জন তাঁকে অপহরণ করেছিল। 
শনিবারের পর রবিবার আবার চিত্রটা বদলে গেল। আটজনকে গ্রেপ্তার করল সিআইডি। ধৃতদের বাড়ি তল্লাশি করে মুক্তিপণের ২০ লক্ষ টাকার মধ্যে ২ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা উদ্ধার হল। বাজেয়াপ্ত করা হল দু’টি মারুতি গাড়ি। ধৃতরা হল গুঞ্জন ঘোষ, মুন্না সাউ, বিকাশ সাউ, দামোদর, দশরথ, দিলীপ, গুড্ডু ও চন্দর। এদের মধ্যে দামোদর রোমার বাড়ির দারোয়ান। পরে গুঞ্জনের বাবা অশোকপ্রদীপ ও গাড়ির চালক সুকুমারও গ্রেপ্তার হয়। যদিও মুক্তিপণের বিষয়টি তখনও পুলিস সরকারিভাবে স্বীকার করেনি। এই অপহরণকাণ্ড ‘ক্র্যাক’ করার পিছনে ‘প্রযুক্তি’র সাহায্য নিয়েছিল সিআইডি। রোমার ফোনের কানেকশন চলে যাওয়ার পর কাশীপুরের একটি দোকান থেকে সিম কিনে গুঞ্জন তার ফোনে ভরে। পরে সন্দেহ হওয়ায় সেই সিম খুলে আবার রোমার ফোনে ভরে। ওইটাই ছিল ভুল। সেই ফোনের সূত্র ধরেই গুঞ্জনের কাছে পৌঁছয় পুলিস। ‘রাজীব কণ্টকে’ বিনাশ বলা যায় কি? উত্তর বোধহয় হ্যাঁ। গুঞ্জন-মুন্নাকে বাড়ি থেকেই তুলে নেয় পুলিস। তাদের নিয়ে শুরু হয় শহরজুড়ে তল্লাশি। একে একে সকলেই গ্রেপ্তার হয়। আর তাদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল ‘তারকা’? গুঞ্জন ঘোষ।
(চলবে)

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ