আনন্দ সাহা, লালবাগ: বহু কষ্টে তিল তিল করে টাকা জমিয়ে একটা বাড়ি করেছিলেন সত্তরোর্ধ্ব মুসলিম শেখ। ভেবেছিলেন বৃদ্ধ বয়সে একটু শান্তিতে থাকতে পারবেন। কিন্তু পদ্মা তা হতে দিলে তো! ধীরে ধীরে নদী এগিয়ে আসছে মুসলিম শেখের সাধের বাড়িকে গিলতে। অসহায় বৃদ্ধের তাকিয়ে দেখা ছাড়া কিছু করার নেই।
পেশায় পরিযায়ী শ্রমিক মুসলিম এখন আর কাজের আর ধকল নিতে পারেন না। পরিবারে স্ত্রী ও এক অবিবাহিতা মেয়ে রয়েছে। সরকারি রেশন এবং মাঝে মধ্যে দিনমজুরি করে কোনওমতে দিন চলে যায়। ভিন রাজ্যে রক্ত জল করে উপার্জিত পয়সায় তৈরি বাড়ি জলেই যেতে বসেছে। বছর চারেক আগে বাড়ির ছাদ ঢালাই করিয়েছিলেন। সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতে চোখে জল এসে যায়। পদ্মা তাঁর বাড়ি থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে। গ্রামবাসীদের সাহায্যে গত বুধবার ঘরের সমস্ত জিনিসপত্র এবং মেয়ে, বউকে নিয়ে তারানগর প্রাইমারি স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন। মাঝেমধ্যে এসে বাড়ি দেখে যান। বৃদ্ধ বলেন, বাপ-ঠাকুরদার ভিটে। আগে টিনের ছাউনি ছিল। বছর চারেক আগে ছাদ দিয়েছিলাম। কিন্তু যেভাবে পদ্মা ভাঙছে তাতে যে কোনও মুহূর্তে বাড়িটা তলিয়ে যাবে। ওঁর পাশেই বাড়ি শারীরিক প্রতিবন্ধী পিন্টু শেখের। বাড়ির একপাশে ছোট একটি মুদিখানা দোকান করেছিলেন। দোকানের রোজগার থেকেই সংসার চলত। তিনিও পাশের গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে চলে গিয়েছেন জিনিসপত্র নিয়ে। স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে তারানগর স্কুলে রয়েছেন।
লালগোলা ব্লকের একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম তারানগরে বর্তমানে প্রায় ৪০০ পরিবারের বাস। গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, এক দশক আগেও তারানগর থেকে দুই কিলোমিটার দূর দিয়ে পদ্মা প্রবাহিত হতো। তখন পদ্মা থেকে কিছুটা দূরে ছিল কালীনগর গ্রাম। এখন সেই কালীনগর পদ্মার গর্ভে। এবার তারানগরকে গিলতে আসছে পদ্মা। মঙ্গলবার গভীর রাতে তারানগরে কয়েকটি বাড়ি পদ্মায় তলিয়ে যায়। আরও কয়েকটি বাড়ি নদী গর্ভে যাওয়ার জন্য প্রহর গুনছে। বর্ষা বিদায় নেওয়ার পরে নতুন করে ভাঙন শুরু হওয়ায় আতঙ্ক গ্রাস করেছে তারানগরকে। বুধবার বেশ কিছু পরিবার ঘরের আসবাবপত্র থেকেশুরু করে সমস্ত জিনিসপত্র নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যায়। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ওই পরিবারগুলি নিজেরাই ঘর ভেঙে ইট, দরজা, জানালা সরিয়ে নিয়ে যান। বিলবোরাকোপরা পঞ্চায়েতের প্রাক্তন সদস্য মহম্মদ জাকারিয়ার বাড়ি থেকে পদ্মা আর ১০ ফুট দূরে। জাকারিয়া সাহেব বলেন, গত বছর থেকে পদ্মার ভাঙন শুরু হতেই ঘরের বেশিরভাগ জিনিসপত্র শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। বাকি যেটুকু পড়ে ছিল বুধবার সকাল থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছি। গ্রামবাসী শ্যামল ঘোষ বলেন, বাড়ি থেকে পদ্মা ৫০ ফুট দূরে রয়েছে। কিন্তু পদ্মার গতিপ্রকৃতিকে বিশ্বাস নেই। কয়েক মুহূর্তে বাড়ির দোরগোড়ায় পৌঁছে যেতে পারে। আতঙ্কে তিন দিন ধরে রাতে ঘুমোতে পারছি না। দল বেঁধে নদীর উপর নজর রাখছি। বিপদ বুঝলেই সকলকে সজাগ করতে হবে।