সংবাদদাতা, নবদ্বীপ: নরম প্রকৃতির মানুষ বৈষ্ণবরা সাধারণত হরিনাম সংকীর্তন, পরিক্রমা, পূজা-পাঠ নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। তাঁদের জীবনযাত্রা ভক্তি আর প্রেমকে ঘিরে আবর্তিত। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, বৈষ্ণবরা হয়তো দুর্বল প্রকৃতির মানুষ। কিন্তু, রাসবিহারী বসুর সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছিলেন নবদ্বীপের এক গোঁসাই বৈষ্ণব। স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পিছপা হননি তিনি। তাঁর মনের ভিতর ব্রিটিশবিরোধী আগুন দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন খোদ রাসবিহারী বসু।
সাল ১৯১৫। চন্দননগরে আত্মগোপন করে রয়েছেন রাসবিহারী বসু। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা তাঁকে গ্রেপ্তার করার জন্য চতুর্দিকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। যেকোনও মুহূর্তে গোরা সেনারা তৎকালীন ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগরে আক্রমণ করতে পারে। আত্মগোপনের জন্য দ্রুত স্থান পরিবর্তনের প্রয়োজন রাসবিহারীর। কিন্তু, যাবেন কোথায়? এই বিষয়ে জোর চিন্তাভাবনা চলছে। হঠাৎ খবর এল, নবদ্বীপের এক গোঁসাই ব্রিটিশ সরকারের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ স্বাধীনতা সংগ্রামী রাসবিহারী বসুর আত্মগোপনের ব্যবস্থা করতে প্রস্তুত। প্রথমটা শুনে খানিকটা বিস্মিত হলেন রাসবিহারী। তারপরে চিন্তা করলেন, একবার গিয়ে দেখে আসা যাক সেই বৈষ্ণবকে। সংবাদ পেলেন, কলকাতায় এক শিষ্যের বাড়ি ভাগবত পাঠ করছেন ওই গোঁসাই। কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে এক সাধারণ শ্রোতার বেশে সেই পাঠের আসরে গিয়ে হাজির হলেন রাসবিহারী। দেখলেন, উজ্জ্বল গৌরবর্ণের এক বৈষ্ণব সুমধুর কণ্ঠে ভাগবত ব্যাখ্যা করে চলেছেন। একসময় পাঠ শেষ হল। ধীরে ধীরে শ্রোতারা চলে গেলেন। রাসবিহারী তখনও বসে আছেন। সেই বৈষ্ণব তাঁর শিষ্যকে বললেন, ‘দরজাটা বন্ধ করে দাও।’ হঠাৎ এহেন কথায় সচকিত হলেন রাসবিহারী। ওই বৈষ্ণব তখন তাঁকে কাছে আসতে বললেন। ‘আপনিই তো বিপ্লবী রাসবিহারী বসু। আমি আপনাকে ঠিকই চিনতে পেরেছি। চিন্তা করবেন না। বিশুদ্ধ বৈষ্ণবের বেশ ধারণ করে নবদ্বীপে চলে আসুন। আমার মন্দিরে অবস্থান করুন। আশা করি, আপনার অসুবিধা হবে না।’ এই বৈষ্ণব হলেন শ্রীচৈতন্য-পার্ষদ নিত্যানন্দের একাদশতম অধস্তন পুরুষ প্রভুপাদ প্রাণগোপাল গোস্বামী। তাঁর শিষ্য ও গুণগ্রাহীবৃন্দের মধ্যে অন্যতম ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। রাসবিহারী বসু এই বৈষ্ণবের দৃঢ়তা এবং ব্যক্তিত্ব দেখে অভিভূত হলেন।
নির্দিষ্ট দিনে বিশুদ্ধ বৈষ্ণবের ছদ্মবেশে ট্রেনে নবদ্বীপে পৌঁছলেন রাসবিহারী বসু। পরম বৈষ্ণব, কপালে সুদৃশ্য তিলক, গলায় রয়েছে তুলসীর মালা। দেখে কে বলবে, ইনি একজন বিপ্লবী? বাবাজি বেশ ধারণ করে তৎকালীন নবদ্বীপের বৈষ্ণবপাড়ায়(বর্তমানে ব্রজানন্দ গোস্বামী রোডে) প্রাণগোপাল সেবিত মদনমোহন মন্দিরে এসে উপস্থিত হলেন রাসবিহারী। ১৭দিন অবস্থান করেছিলেন সেই মন্দিরে। অবস্থানকালে মন্দিরের নিয়ম ভেঙে বিপ্লবীদের জন্য তাঁর শিষ্যের বাড়ি আমিষ রান্না করিয়ে ভোজনের ব্যবস্থাও করিয়েছিলেন প্রাণগোপাল। বলেছিলেন, ‘দেশরক্ষা করা প্রতিটি মানুষের কর্তব্য। যাঁরা দেশ স্বাধীন করার কাজে যুক্ত, তাঁদের সেবা মহৎ কর্তব্য।’ মন্দির থেকে যাত্রাকালে রাসবিহারী বসু বলেন, ‘বৈষ্ণবদের সম্বন্ধে আমার ধারণার পরিবর্তন হল। এতদিন বৈষ্ণবদের মেরুদণ্ডহীন প্রজাতি ভাবতাম।’ উত্তরে প্রভু প্রাণগোপাল বলেন, ‘আমার কৃষ্ণকে শুধু বাঁশি বাজাতেই দেখলে? প্রয়োজনে তিনি যে সুদর্শন চক্র ধারণ করেন, সেটা জানো না?’
মদনমোহন মন্দিরের সেবাইত নিত্যগোপাল গোস্বামী বলেন, আমার ঠাকুমা এবং বাবার মুখে শুনেছি, প্রভু প্রাণগোপাল অনুশীলন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য ছিলেন। তাঁর বহু শিষ্য এই অনুশীলন সমিতির মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামের সেবা করে গিয়েছেন। রাসবিহারী ছাড়াও কত বিপ্লবী যে এই মন্দিরে আত্মগোপন করেছিলেন, তার সংখ্যা গুনে শেষ করা যাবে না। এই মন্দিরে স্বাধীনতা সংগ্রামের বহু গুপ্ত মিটিংও হয়েছে।