সুদীপ পাল, মানকর: মানকেশ্বর বা মানিকেশ্বর শিবের উপাসনা করে নতুন বছর শুরু করেন মানকরের বাসিন্দারা। কথিত আছে মানকেশ্বর শিবের নাম থেকে মানকর নামের সৃষ্টি। তবে শুধু মানকর নয় আউশগ্রাম ও গলসির একাধিক গ্রামে শিবের উপাসনা করে নতুন বছরে সুখ সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করেন বাসিন্দারা। এখানের শিবলিঙ্গকে কেন্দ্র করে একটি তিন ফুটের গম্ভীরা রয়েছে। নীলষষ্ঠী পুজোর দিন সকাল থেকে ভক্তরা জল, দুধ প্রভৃতি দেয় ওই গম্ভীরায়। মানকরের বাসিন্দাদের দাবি, গম্ভীরায় তখন এক ফোঁটাও জল পাওয়া যায় না। পরে গাজনের সন্ন্যাসীরা গ্রাম ঘুরে এসে গভীর রাতে হোম সম্পন্ন করেন। তারপরেই আশ্চর্যজনকভাবে গম্ভীরা জলে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। তখন সেখান থেকে যত জলই নেওয়া হোক না কেন গম্ভীরা জলপূর্ণই থাকে। গাজন উপলক্ষ্যে গ্রামের বাসিন্দারা ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন।
গলসির বেলানের বেল্লেশ্বরের গাজনে ধর্মরাজের গাজনের সঙ্গে শিবের গাজন সম্পৃক্ত হয়ে আছে। স্থানীয়রা জানান, প্রতি বছর দেড়শ জনেরও বেশি মানুষ সন্ন্যাসী হন। গাজন নিয়ে রয়েছে বিশেষ রীতি। সন্ন্যাসীরা যখন হবিষ্য গ্রহণ করেন সেই সময় কানে আওয়াজ গেলে খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। তাই গভীর রাতে কানে তুলো গুঁজে আহার করেন সন্ন্যাসীরা। গাজনের আর একটি রীতি হল কামাক্ষ্যা তোলা। গভীর রাতে গ্রামের বাইরে শ্মশানের পাশে পুকুর থেকে কামাক্ষ্যা তোলা হয়। এইসময় একটি মাগুর মাছকে পুজো করে বলি করা হয়। মাগুর মাছের রক্ত ঘটে দেওয়া হয়। তারপর সেই ঘট জলপূর্ণ করে তার মুখটি গামছা দিয়ে একটি বিশেষ কৌশলে বাঁধা হয়। ঘটটিকে উল্টো করে প্রধান সন্ন্যাসীর মাথায় তুলে দেওয়া হয়। এই সময় সবাই চুপ থাকেন। কোনও কথা বলা নিষেধ। রীতি চলার সময় শুধুমাত্র সন্ন্যাসীরাই উপস্থিত থাকেন। প্রধান সন্ন্যাসীর মাথায় ঘট চাপাতেই তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। ওই অবস্থাতেই দেবতার নাম করতে করতে তাঁকে মন্দিরে আনা হয়। স্থানীয়রা জানান, গাজন দেখতে গলসি, বর্ধমান সহ আশেপাশের বিভিন্ন এলাকার বহু মানুষ ভিড় করেন।
আউশগ্রামের কলাইঝুঁটি গ্রামের মধ্যেখানে অবস্থিত অনাথেশ্বরের মন্দির। স্থানীয় বাসিন্দা পবিত্র কোনার বলেন, এখানকার গাজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে রয়েছে আশেপাশের সর, বোলপুর, অভিরামপুর, তেলতা, আনন্দবাজার গ্রামের গাজন। সন্ন্যাসীদের এখানে ভক্ত বলে অভিহিত করা হয়। প্রধান সন্ন্যাসীকে বলা হয় সর্দার। ঐদিন রাতেই এই সমস্ত গ্রামগুলির সন্ন্যাসীরা কলাইঝুঁটি গ্রামে আসেন মিলন দেওয়ার জন্য। মিলন হচ্ছে দুই গ্রামের সন্ন্যাসীদের মুখোমুখি সাক্ষাৎকার। ঢাকের তালে তালে মুখোমুখি নৃত্য করেন দুই গ্রামের সন্ন্যাসীরা। লোকসংস্কৃতি গবেষক সৌরভ কেশ বলেন, চড়ক বা গাজন বাংলা বছরের শেষ উৎসব। গ্রাম বাংলার নিজস্ব প্রাচীন রীতি গাজন। গাজনের দেবতাকে প্রণাম করেই গ্রাম বাংলার মানুষরা নতুন বছরে পদার্পণ করে।