সংবাদদাতা, মানকর: জামতাড়া নামটা শুনলে যে কোনও সাধারণ মানুষের ভ্রু জোড়া ধনুক হয়ে যায়। সাইবার প্রতারণা আর জামতাড়া প্রায় সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর তাতেই সমস্যা বেড়েছে আউশগ্রাম-২ ব্লকের জামতাড়া গ্রামের বাসিন্দাদের। শেক্সপিয়র যতই লিখুন, নামে কী এসে যায়। নামে যে আসে যায়, তা তাঁরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। বর্ধমানের জামতাড়া গ্রামের মেহেবুব আলি সম্প্রতি কলকাতায় গিয়েছিলেন একটি বেসরকারি নার্সিং হোমে ডাক্তার দেখাতে। ডাক্তারবাবু গ্রামের নাম শুনেই জানতে চেয়েছিলেন, ওখানকার পরিস্থিতি এখন কেমন। মেহবুব আলি বললেন, তিনি বর্ধমানের জামতাড়া গ্রামে থাকেন। আর সাইবার প্রতারণার স্বর্গরাজ্য জামতাড়া ঝাড়খণ্ড রাজ্যে অবস্থিত।
আউশগ্রামের জামতাড়ার বাসিন্দাদের বক্তব্য, নাম এক হলেও ঝাড়খণ্ডের জামতাড়ার সঙ্গে আউশগ্রামের জামতাড়ার বিস্তর তফাত। ওখানে বেশির ভাগই লোক ঠকানো বা অ্যাকাউন্ট সাফের কৌশল শেখে। কিন্তু এখানে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে রোজগার করেন যুবকরা। এলাকার শিক্ষক সবিতাব্রত চক্রবর্তী বলেন, বাইরে গিয়ে জামতাড়া নাম বললে অনেকে আড়চোখে তাকান। তাই স্থানীয়রা অনেকেই বাইরে গিয়ে বাড়ি কোথায় প্রশ্নের সম্মুখীন হলে মানকর অথবা ভাল্কী বলেন। স্থানীয়রা বলেন, ওই জামতাড়ার সঙ্গে আমাদের জামতাড়ার কোনও তুলনায় হয় না। লোক ঠকিয়ে ঝাড়খণ্ডের জামতাড়া সব সময় খবরের শিরোনামে থাকে। ব্যাঙ্ক প্রতারণা, ডিজিটাল অ্যারেস্ট সহ একাধিক সাইবার অপরাধের সঙ্গে যুক্ত জামতাড়া চক্র। সম্প্রতি বর্ধমানে আলমগঞ্জের একটি ভাড়াবাড়ি থেকে তিন যুবককে গ্রেপ্তার করে দিল্লি পুলিসের সাইবার শাখা। তিন জনই জামতাড়া গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত। জলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে বলে এক ব্যক্তিকে মেসেজে জানানো হয়। সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া আটকাতে তাঁকে একটি অ্যাপ ডাউনলোড করতে বলা হয়। ওই ব্যক্তি সবই করেছিলেন। তারপর দেখেন, তাঁর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে থাকা অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা গায়েব। সেই ঘটনার তদন্তে নেমেই এই যুবকদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের জামতাড়ার অধিকাংশই কৃষক পরিবার। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায় গ্রামের যুবকরা কাজ করেন। অনেকেই সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গ্রামের মেয়ে মেহেবুবা আফরোজের বিয়ে হয়েছে বহরমপুরে। তিনি জানান, বাপের বাড়ি জামতাড়া বললে প্রায় সকলেই বিস্ময় প্রকাশ করেন। তাঁদের ভুল ভাঙানোর জন্য বলতে হয় আমি সেই জামতাড়ার মেয়ে নই। আউশগ্রামের জামতাড়া প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত নয়। এক যুবক বলেন, ১৮৭৩ সালে জামতাড়ার কর্মাটাঁড় ব্লকে এসে ওঠেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। দীর্ঘ ১৮ বছর এখানেই থেকে যান তিনি। জমি কিনে এখানে শিক্ষা প্রসারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন প্রথাগত শিক্ষার বদলে সাইবার প্রতারণায় জামতাড়া হয়ে উঠেছে সবচেয়ে কুখ্যাত। বলা ভালো সাইবার প্রতারণার আঁতুড়ঘর। আমাদের অন্তত সেই বদনাম নিয়ে বেঁচে থাকতে হয় না।