কাঠমাণ্ডু: ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর কেটে গিয়েছে তিনদিন। উত্তর নেপালের ভোটেকোশী নদীর দু’ধার জুড়ে এখনও শুধুই প্রকৃতির ধ্বংসলীলার শিউরে ওঠা ছবি। দুর্যোগে বিপর্যস্ত মানুষদের উদ্ধার ও নিখোঁজদের সন্ধানে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে নেপালের পুলিশ ও সেনাবাহিনী। তার মধ্যেই ফের খবর আসে, তিব্বত সীমান্তের জিরং সীমান্ত বন্দরের উজানে অবস্থিত একটি হ্রদের জলস্তর বেড়ে গিয়েছে প্রায় ২.৫ মিলিয়ন কিউবিক মিটার। বাঁধ উপচে জল ঢুকেছে লেহেন্দে খোলায়। সেই বাঁধ যে কোনো মুহূর্তে ভেঙে যেতে পারে। ভোটেকোশী নদীর পর এবার ত্রিশূলী নদীতে ফের হড়পা বানের আশঙ্কা নিয়ে নেপালকে সতর্ক করে চীন। তড়িঘড়ি উদ্ধারকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। নদী তীরবর্তী এলাকা থেকে সব বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে চলে যেতেও মাইকিং করা হয়। পরে অবশ্য চীনের তরফে জানানো হয়, এখনই বিপদের আশঙ্কা নেই। প্রায় তিন ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর ফের নেপাল ও তিব্বতে শুরু হয় উদ্ধারকাজ।
শুক্রবার রাত পর্যন্ত ৫৭৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে নেপাল পুলিশ। আহত শতাধিক। হড়পা বানে নেপালের মতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সীমান্তের ওপারে থাকা তিব্বতও। সেদেশের সরকারি সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, চীনে কমপক্ষে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। দুই দেশ মিলিয়ে এখনও পর্যন্ত ১২০০ জনের কোনো খোঁজ মেলেনি। নিখোঁজদের মধ্যে একটা বড়ো অংশই ভারতীয়। এদিন বিদেশ মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, প্রায় ১০০ ভারতীয়ের হদিশ মেলেনি। এছাড়াও ৩২০ জন ভারতীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। একের পর এক দুঃসংবাদের মধ্যেও বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের সাংবাদিক সম্মেলনে মিলেছে আশার এক চিলতে আলো। তিনি জানিয়েছেন, চীনে প্রায় ৪০০ ভারতীয় নিরাপদে রয়েছেন। বেজিংয়ের ভারতীয় দূতাবাসের তরফে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। দেশে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে ৯৬ জনকে চীন থেকে নেপালে আনা হয়েছে। এরপর তাঁদের দেশে ফেরানো হবে। পাশাপাশি, বৃহস্পতিবার নেপালের বন্যাবিধ্বস্ত এলাকা থেকে ২১ জন ভারতীয়কে উদ্ধার করে কাঠমাণ্ডুতে নিয়ে আসা হয়েছে। প্রত্যেকেই তামিলনাড়ুর বাসিন্দা। এদিন তাঁদের দিল্লিতে নিয়ে আসা হয়।
প্রশাসন সূত্রে খবর, হিমবাহ ধসের কারণে বিপর্যয়ের পর তুষার, পাথর, কাদামাটি পাহাড়ি নদীগুলির খাতে এসে জমা হয়েছে। পাথর, কাদামাটি অনেক জায়গায় স্তূপ হয়ে পড়ে। ফলে নদীগুলির স্বাভাবিক প্রবাহ থমকে গিয়েছে। এই মুহূর্তে ওই নদীখাতগুলি অস্থায়ী বাঁধের মতো কাজ করছে। উজান থেকে জলরাশি আছড়ে পড়লে ওই ‘অস্থায়ী বাঁধ’ ফেটে ফের পাথর, তুষার, কাদামাটির স্রোত নীচের দিকে নেমে আসতে পারে। সেই কারণে গোটা পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে চীন ও নেপাল প্রশাসন।
ইতিমধ্যে চীনের জলসম্পদ দপ্তর সতর্কতা জারি করে জানিয়েছে, পাথর, কাদা, তুষার জমে তিব্বতের দুই নদী ছোকেন খোলা ও পুরেপি সাংপোর সংযোগস্থলে একটি কৃত্রিম হ্রদ তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার ওই হ্রদ থেকে জল উপচে পড়তে থাকে। শুক্রবার সকালে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে ওই এলাকায় একটি সামরিক ড্রোন পাঠায় চীন। ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, হ্রদটিতে ৫০ হাজার কিউবিক মিটার বরফের স্তূপ জমা হয়েছে। ওই কৃত্রিম হ্রদ থেকে অবিরাম জল উপচে পড়ায় নতুন করে হড়পা বান আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। পরে সরকারি সংবাদমাধ্যমের তরফে জানানো হয়, আপাতত হ্রদ ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তারপরই ফের উদ্ধার অভিযান শুরু হয়।
নেপাল বিপর্যয়ের ভয়াবহতার ছবি ধরা পড়েছে ভারতেও। স্থানীয় সূত্রে খবর, নেপাল সীমান্তবর্তী উত্তরপ্রদেশের গণ্ডক নদীতে সাতটি দেহ ভেসে এসেছে। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার মহারাজগঞ্জে চারজন অজ্ঞাতপরিচয়ের মরদেহ ভেসে এসেছিল। শুক্রবার কুশীনগর জেলায় আরও তিনটি দেহ উদ্ধার হয়েছে। নেপালের ত্রিশূলী নদী ভারতে এসে গণ্ডকের সঙ্গে মিশেছে। সেই কারণে দেহগুলি সীমান্তের ওপার থেকেই যোগীরাজ্যে এসেছে বলে অনুমান বিশেষজ্ঞদের।