অফিস হোক বা বাড়ি, বসার চেয়ারের জন্যও পিঠে ও কোমরে ব্যথা ডেকে আনি আমরা। কেমন চেয়ার কিনবেন? জানালেন লাইফস্টাইল বিশেষজ্ঞ।
অফিস হোক বা বাড়ি, বসার চেয়ারের জন্যও পিঠে ও কোমরে ব্যথা ডেকে আনি আমরা। কেমন চেয়ার কিনবেন? জানালেন লাইফস্টাইল বিশেষজ্ঞ।
ইদানীং একটানা হাঁটলেই কোমর ধরে আসে বছর ৩২-এর ঈশানীর। আইটি সেক্টরের চাকরি। অফিসের চাপ, প্রেজেন্টেশন, ছোটাছুটি এসব নিত্যসঙ্গী।
সৌমকের আবার জীবনযাপন আলাদা। স্টেজের উপর দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে গিটার বাজাতে হয়। নইলে গোল ঘোরানো সিটের উপর বসে পারফর্ম করাই দস্তুর। সেদিন নিচু হয়ে গিটারের ব্যাগ তুলতে গিয়ে বুঝল, কোমরে টান লাগছে নিচু হলেই! বয়স তার মাত্র ২৫!
সকাল ৯টায় অফিসে ঢুকে চেয়ারে বসা, সন্ধের পর চেয়ার ছেড়ে বেরনো। মাঝখানে কোথা থেকে যে রোদ ঝলমলে বা মনখারাপের মেঘমাখা দিন শেষ হয়ে যায়, তা দেখার কোনও অবকাশ থাকে না। অনেকের ক্ষেত্রে আবার রাত জেগে অফিসের কাজ সারতে বাড়িতেই দীর্ঘ সময় চেয়ারে বসে কাটাতে হয়। দিনের মধ্যে ১২-১৪ ঘণ্টা বা তারও বেশি পা ভাঁজ করে চেয়ারে বসে পেশাযাপন করতে হয়, এমন মানুষও রয়েছেন। চেয়ারের ধরন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চাকা লাগানো, হেলান দেওয়ার জন্য ব্যাক রেস্ট খুব পোক্ত নয়। কোথাও আবার কোমরে সাপোর্ট মেলে না, কোমরের অংশ ফাঁকা থাকে। কেতাদুরস্ত চেয়ার দেখতে ভালো হলেও তা আদৌ কতটা হাড়ের সহযোগী, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। এসব চেয়ারে বসে একটানা কাজ সারতে গিয়ে পিঠে-কোমরে ব্যথায় ভুগছে এই প্রজন্ম। ঘাড়ে কোমরে ব্যথার ইতিহাস বাঙালির জীবনে নতুন নয়। বরং ইদানীং সেসব ব্যথার প্রকোপ বেড়েছে। যত জীবন গতিশীল হয়েছে, ততই রোজনামচায় এসব সমস্যার থাবা বড় হচ্ছে।
জীবনশৈলী উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ বা লাইফস্টাইল মডিফিকেশন এক্সপার্টরা এই সমস্যার জন্য অনেকাংশেই দায়ী করেন বসার চেয়ারকে। তেমনই একজন রাখী সমাদ্দার। তিনি জানালেন, ‘পিঠে কোমরে ব্যথা কমানোর জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লাইফস্টাইল মডিফিকেশনের উপর নির্ভর করি আমরা। বেশিরভাগ সমস্যা এতেই আয়ত্তে আসে। বিশেষ করে কোন ধরনের চেয়ারে বসছেন, কীভাবে বসছেন এগুলোকে সংশোধন করেই ব্যথা আয়ত্তে আনা হয়। সঙ্গে যোগ করা হয় পর্যাপ্ত শরীরচর্চা।’
চেয়ারের ধরনে বদল
শক্ত গদিযুক্ত চেয়ার: নরম গদির চেয়ার কোমর ও মেরুদণ্ডের হাড়ের ক্ষতি করে। তাই নরম গদির চেয়ার পরিহার করুন। শক্ত গদিযুক্ত চেয়ার শরীরের প্রাকৃতিক বক্ররেখা বজায় রাখতে সাহায্য করে। তাই বসার জন্য শক্ত গদি বাছলে স্পন্ডিলাইটিস ও কোমরে ব্যথা অনেকটাই প্রতিহত করা যায়। পায়ের ও কোমরের পেশি চেয়ারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আরাম না পেলেই যাবতীয় ব্যথা শুরু হয়।
এরগোনোমিক চেয়ার: যে চেয়ারেই বসবেন, তাতে আর্মরেস্ট বা হাতল থাকা বাঞ্ছনীয়। মেরুদণ্ড ও কোমরের হাড়ের সারিবদ্ধতা ঠিকভাবে বজায় থাকবে এমন চেয়ার প্রয়োজন। এরগোনোমিক চেয়ার আজকাল নানা অফিস সেটআপে দেখা যায়। যাঁরা বাড়িতে দীর্ঘসময় ধরে কাজ করেন, তাঁদেরও এমন চেয়ার কেনাই ভালো। এমন চেয়ারে কোমরের সকল হাড়ে সমান চাপ পড়ে। তাই ব্যথা বেদনার থেকে দূরে থাকা যায়।
মাসাজ চেয়ার: আজকাল ব্যস্ত শহরাঞ্চলে বেশ কিছু সেট আপে মাসাজ চেয়ারের প্রচলন হয়েছে। এইসব চেয়ারে নানা মাসাজ মোড থাকে, ফলে পেশির ব্যথা কমে ও রক্ত সঞ্চালন উন্নত হয়।
কুশনওয়ালা হাতলযুক্ত কাঠের চেয়ার: বসার জন্য সবচেয়ে ভালো কাঠের চেয়ার। হাতল আছে, পিঠের দিকে একটা কুশন রেখে বসার সুযোগ আছে, পিঠের নীচের অংশে পর্যাপ্ত সাপোর্ট পাওয়া যাবে এমন কাঠের চেয়ার বেছে নিন।
চেয়ার বাছার শর্ত
• চেয়ারের উচ্চতা ব্যথা-বেদনা কমানোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এমন চেয়ারে বাছতে হবে যেখানে পা মাটি পর্যন্ত পৌঁছয়। নিজের উচ্চতা বুঝে সেই অনুযায়ী চেয়ারের উচ্চতা রাখুন। চেয়ারে বসলে পায়ের পাতা যেন মাটি স্পর্শ করে।
• চেয়ারের সিটটি যেন চওড়া ও সমতল হয়। কোমরের পেশি, হাড় যেন এই চেয়ারে বসলে আরাম পায়। বসার জন্য খুব অল্প পরিসর জায়গা থাকলে, কোমরের পেশিতে চাপ পড়ে। আমাদের কোমরের গঠন অনুসারে চেয়ারের সিটটি একটু নরম ও সামান্য ভিতরের দিকে ঢুকে থাকা উচিত। সম্পূর্ণ সমতল হলে এই উরু ও কোমরের চাপের সঙ্গে সেটি মানিয়ে নিতে পারে না। চেয়ারের সিট ও আর্মরেস্টের মধ্যে অনেকটা ফাঁক থাকলে সেটিও সমস্যার কারণ হতে পারে। সাবলীলভাবে বসা যাবে এমন চেয়ার বেছে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
• চেয়ারে পিঠ ও কোমরের অংশে সাপোর্ট দরকার।
• গাড়ির সিটে বসলে যেমন ঘাড়ের পিছনের অংশে ভারসাম্য রাখা যায়, অফিসের চেয়ারেও তেমন ব্যবস্থা থাকলে ভালো।
দেখেশুনে, শরীরের আরাম হবে, ব্যথাবেদনা কম থাকবে এমন চেয়ার না হয় কেনা হল। কিন্তু একনাগাড়ে একই জায়গায় বসে থাকলে ব্যথাবেদনা হবেই। চেয়ারের আকার বা প্রকৃতি ব্যথা অনেকটা দূরে রাখে ঠিকই, তবে নিত্য অভ্যাসে দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে থাকলে ব্যথা ফিরে আসা স্বাভাবিক। তাই কিছু নিয়ম মেনে চলুন।
১) দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে কাজ করার সময় মাঝেমধ্যে পায়ের নীচে কাঠের তক্তা বা উঁচু স্টুল বা পিঁড়ির মতো কিছু রাখতে পারেন। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে যাঁদের পা ফুলে যায়, তাঁরা এই পদ্ধতিতে উপকার পাবেন।
২) কম্পিউটার বা রিডিং বোর্ড যেন চোখের সরাসরি সামনে থাকে। ঘাড় উঁচু করে বা নিচু করে কাজ করবেন না।
৩) দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে কাজ হলে, প্রতি ৩০ মিনিট অন্তর উঠে কয়েক পা হেঁটে আসুন।
৪) কাজের ফাঁকে মাঝেমধ্যে পা টানটান করে পায়ের পাতাকে ভিতরের দিকে ও বাইরের দিকে টানুন।
৫) লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করুন। নিত্য শরীরচর্চা করুন।
মনীষা মুখোপাধ্যায়