Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

রেড অ্যালার্ট

কিছুদিন আগের কথা। সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল ভাইরাল কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি। সেই ছবি অবশ্য আমাদের বহু চেনা শ্বেতশুভ্র শৃঙ্গের নয়।

রেড অ্যালার্ট
  • ৮ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ডঃ স্বাতী নন্দী চক্রবর্তী: কিছুদিন আগের কথা। সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল ভাইরাল কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি। সেই ছবি অবশ্য আমাদের বহু চেনা শ্বেতশুভ্র শৃঙ্গের নয়। কারণ সেখানে বরফের দেখা নেই বললেই চলে। যা দেখে অনেকেই বলছেন, জীবনে কখনও কাঞ্চনজঙ্ঘাকে এভাবে দেখিনি। বরফহীন কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। কেউ আবার লিখেছেন, পুরো পাহাড়টা যেন একেবারে কালো রঙের। শুধু কিছু রেখার মতো বরফ দেখা যাচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘার গায়ে।

Advertisement

বিশ্বের তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা। সারা বছরই বরফে ঢাকা থাকে এই মহাশৃঙ্গ। সেখানেই দেখা দিয়েছে কালো পাথর। বরফের পরিমাণ প্রায় নেই বললেই চলে। এই ঘটনার জন্য বিশ্ব উষ্ণায়নের দিকেই আঙুল তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, গত কয়েক দশক ধরেই হিমালয়ের তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে দ্রুত হারে গলছে হিমবাহ। ফলে শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘা নয়, গোটা হিমালয়ের পরিবেশই বিপন্ন। এই বিষয়টিকে রীতিমতো ‘রেড অ্যালার্ট’ হিসেবে দেখছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এই ‘পরিবর্তন’ রুখতে যদি এখনই কোনও ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতের জন্য আরও বড় বিপর্যয়ের জন্য আমাদের তৈরি থাকতে হবে। আর তার ফল ভুগতে হবে গোটা বিশ্বকে।
জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে কতই না অদ্ভুত ঘটনা ঘটে চলেছে আমাদের চারপাশে। যেমন সাইবেরিয়ার দাবানল! বছরের বেশিরভাগ সময় যে জায়গাটি বরফে ঢাকা থাকে, সেই সাইবেরিয়ার বিস্তীর্ণ অংশে প্রচণ্ড দাবানল ছড়িয়ে ২০২০ সালে। ওই দাবানল এতটাই তীব্র ছিল যে, তার ধোঁয়া আর্কটিক সার্কেল পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। এই পরিবর্তন প্রভাব ফেলেছিল বন্যপ্রাণীদের খাদ্য ও খাদক সম্পর্কের উপরেও। একটা ঘটনার কথা বলি। তাহলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। হঠাৎ একদিন রাশিয়ার নভায়া জমলিয়া দ্বীপে খাবারের খোঁজে বহু শ্বেত ভালুক একসঙ্গে শহরে ঢুকে পড়ে। এই ঘটনার নেপথ্য কারণ কী জানেন? আসলে ক্রমাগত বরফ গলতে থাকায় তারা তাদের স্বাভাবিক শিকারস্থল হারিয়ে ফেলেছিল। তাই খাবারের সন্ধানেই শহরে হানা দিয়েছিল শ্বেত ভালুক বাহিনী।
ছোট ছোট কীটপতঙ্গের উপরের প্রভাব পড়ছে এই জলবায়ু পরিবর্তনের। মনার্ক প্রজাপতিরা প্রতি বছর মেক্সিকোতে আসে। কিন্তু আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে তাদের চলার পথ ও সময়সূচি বদলে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে প্রজনন এবং বাস্তুতন্ত্রেও। ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর জীবের উপরেও উষ্ণায়নের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। করোনা ভাইরাসের মারণ প্রভাব দেখার পর সেই তথ্য যে কোনও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কারণ একদিকে সাইবেরিয়ায় যখন বরফ গলছে, তেমনই মাথাচাড়া দিচ্ছে প্রাচীন নানা ভাইরাস ও জীবাণু। কিছুদিন আগে বিজ্ঞানীরা হিমবাহের নিচে ৩০ হাজার বছরের পুরনো ভাইরাসও আবিষ্কার করেছেন, যা ভবিষ্যতে জীববৈচিত্র্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণের প্রভাবে পাল্টে যাচ্ছে জীবাণু ও ভাইরাসের বিস্তারের চরিত্রও। জিকা, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া—এসব ব্যাধির জন্য দায়ী মশার প্রজননের অনুকূল আবহাওয়া তৈরি হচ্ছে আগের চেয়ে অনেক বেশি এলাকায়। শুধু তাই নয়, আন্টার্কটিকায় এক বিশাল অঞ্চলে বরফ অপ্রত্যাশিতভাবে গলে যাওয়ায় হাজার হাজার পেঙ্গুইনের ডিম বরফে চাপা পড়ে ধ্বংস হয়ে যায়। একটি কলোনির প্রায় ১০,০০০ বাচ্চা পেঙ্গুইনের জন্ম হয়নি। 
আবহাওয়া পরিবর্তন কীভাবে জীবজগতের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে, ২০২১ সালের ছোট একটা ঘটনার উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে। সাধারণত শীতকালে বরফ পড়ে না এমন একটি মরুভূমি হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সোনোরান মরুভূমি। কিন্তু ২০২১ সালের তীব্র শীতল ঢেউয়ে সেই মরুভূমিতেও হাল্কা তুষারপাত ও বরফ দেখা যায়। ঠিক কী ঘটেছিল? জানা যায়, উত্তর আমেরিকায় ‘পোলার ভর্টেক্স’ ঢুকে পড়ে। সেখানে তাপমাত্রা হঠাৎ মাইনাস ২ ডিগ্রি থেকে মাইনাস ৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে নেমে আসে। তারই প্রভাবে মরুভূমিতে বরফ পড়েছে।
সমুদ্রের জলস্তর ক্রমাগত বাড়ছে। এর জন্য দায়ী বিশ্ব উষ্ণায়ন। রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, গত ৫০ বছরে পৃথিবীর ৬৮ শতাংশ বন্যপ্রাণী হারিয়ে গিয়েছে। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের প্রভাব পড়েছে এ রাজ্যেও। গঙ্গায় দূষিত জল ও নির্বিচারে বালি উত্তোলনের কারণে গাঙ্গেয় ডলফিনের সংখ্যাও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। হুগলি ও জলঙ্গি নদীতে প্লাস্টিক ও অন্যান্য রাসায়নিক বর্জ্যে মাছের প্রজনন হ্ব্রাস পাচ্ছে। অবশ্য সমস্যা শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের নয়, গোটা পৃথিবী এই সমস্যায় জেরবার। 
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষ শুধু দূষণজনিত কারণে মারা যাচ্ছেন। যার মধ্যে বায়ুদূষণই প্রধান ঘাতক।
 প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রে মানুষের হস্তক্ষেপ, রাসায়নিক দূষণ ও আবর্জনার ফলে প্রতিবছর শতাধিক প্রজাতি বিলুপ্ত হচ্ছে। কিন্তু এতসবের পরও কেউ সচেতন হচ্ছে না। যেমন, চীন উন্নয়নের ঢাক পিটিয়ে চলছে। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ নদী ইয়াংৎসেতে প্রতি বছর প্রায় ১৫ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়। এটিই চীনের প্রধান অর্থনৈতিক অঞ্চল। ২০২২ সালে চীন সরকার ‘ ইয়াংৎসে রিভার প্রটেকশন ল’ চালু করলেও নদীর বাস্তুতন্ত্র ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত। তীরবর্তী মানুষজনের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। যদি আফ্রিকার দিকে তাকাই, সেখানে তো পরিবেশ আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে দিনের পর দিন। নাইজেরিয়ার নাইজার ডেল্টা অঞ্চলের মাটি ও জল বহুজাতিক তেল কোম্পানির অপচয় ও তেলের লিকের কারণে ভয়াবহভাবে দূষিত। মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকা ধ্বংস হয়েছে। বহুজাতিক সংস্থাগুলি মুনাফার চেষ্টা করছে আর তার ফল ভুগছে সমাজের প্রান্তিকতম মানুষগুলো। আর আমাদের রাজধানী দিল্লির কথা নতুন করে আর বলার অপেক্ষায় রাখে না। প্রতি বছর শীতকালে দিল্লি বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় উঠে আসে। স্কুল বন্ধ রাখা হয়, নির্মাণকাজে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। তারপর যে কে সেই পরিস্থিতি। আমরা একবারও ভাবছি না।
 লেখিকা পরিবেশবিজ্ঞানী
 কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফহীন চেহারার ছবি সৌজন্য : স্বর্ণালী সরকার ভট্টাচার্য

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ