অভিষেক পাল, বহরমপুর: স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় মুর্শিদাবাদে নলেন গুড় একসময় গোটা বাংলায় পাঠানো হত। গ্রামে-গঞ্জে এখনও শিউলিদের খেজুর রসের খাঁটি গুড়ের সুনাম অটুট। তবে ইদানীং বাজারে ভেজাল গুড়ের রমরমা বেড়েছে। ফলে সুনাম কমছে খাঁটি গুড়ের। বর্ষা কাটতেই শিউলিরা খেজুর গাছ পরিষ্কার করার কাজ শুরু করেন। অগ্রহায়ণ থেকে ফাল্গুন এই চার মাসের জন্য গাছ বায়না নিয়ে গাছে মাটির হাড়ি বেঁধে রেখে দেন তাঁরা। তারপর রস নামিয়ে জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় খাঁটি নলেন গুড়। কিন্তু কঠোর পরিশ্রম ও জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ের তুলনায় লাভ খুবই সামান্য হওয়ায় নতুন প্রজন্ম এই কাজে আগ্রহ হারাচ্ছে।
বাজারজুড়ে বেড়ে ওঠা ভেজাল গুড়ের দাপট রয়েছে। কম দামে দিতে গিয়ে চিনি মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে পাটালি। সেই গুড়ের জোগান বেশি। একসময় মুর্শিদাবাদের লালবাগ, ইসলামপুর, নবগ্রাম, দৌলতাবাদ, হরিহরপাড়ার নলেন গুড়ের সুনাম ছিল। রাজ্যের বাইরেও পরিচিত ছিল এখানকার সুগন্ধি গুড়ের। কিন্তু আজ পরিস্থিতি পাল্টে গিয়েছে। ভালো গুড় বাজারে আনলেও ক্রেতারা ভেজালের ভিড়ে চিনতে পারেন না। গুড় ব্যবসায়ী রতন ঘোষ বলেন, এখন আমরা ৮০-৯০টাকায় গুড় কিনে কলকাতায় ১২০-১৩০ টাকায় বিক্রি করছি। এত কমদামে ভালো গুড় তো দেওয়া যায় না। ভালো গুড় আমাদেরই ২০০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। পাইকার গুড় ব্যবসায়ী অমিত ঘোষ আক্ষেপ করে বলেন, বাজারে এখন সবই ভেজাল গুড়। আগে গুড়ের গন্ধেই বোঝা যেত মান। এখন নাকে ধরলেও সুবাস নেই। কেমিক্যাল দিয়ে গুড় তৈরি হচ্ছে। গন্ধ মিললেও একেবারে স্বাদ নেই। লালবাগের শিউলি হরেন বিশ্বাস বলেন, ৪০টি গাছ কেটে রস পাই মাত্র ২০-২৫ হাঁড়ি। যা জ্বাল দিলে মেলে ছ’-সাত কেজি গুড়। সেই গুড় বাজারে বিক্রি হয় ২০০-২৫০টাকা কেজি দরে। অথচ চিনি মিশিয়ে তৈরি ভেজাল গুড় ৮০-৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেই গুড় বাজারে ভরে গিয়েছে। অল্প রসে প্রচুর গুড় তৈরি হওয়ায় লাভও তুলনায় বেশি। ফলে খাঁটি গুড় উৎপাদকরা পড়ছেন লোকসানে। নবগ্রাম ব্লকের বাসিন্দা অহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা গাছ থেকে রস নিয়ে এসে নিজেরাই গুড় তৈরি করে বাজারে বিক্রি করি। ফলে একটু লাভ দেখতে পায়। দৈনিক চার-পাঁচ কেজি করে গুড় বানাচ্ছি। ভালো গুড়ের দাম ২০০ টাকা কেজি। আর চিনি মেশানো গুড়ের দাম ১২০ থেকে ১৫০ টাকা। বহরমপুরের ক্রেতা সমিত মণ্ডল বলেন, শীত পড়তেই বাজারে প্রচুর পাটালি উঠেছে। সেইসঙ্গে ঝোলা গুড়ও পাওয়া যাচ্ছে। গন্ধ ভরপুর থাকলেও খুব একটা স্বাদ মিলছে না। সব থেকে ভালো গুড়ের দাম বলছে ২৫০টাকা কেজি। কম দামেও গুড় মিলছে। তবে ভেজাল কিনা বুঝতে পারছি না। -নিজস্ব চিত্র