ইতিহাসের ধারায় চিৎপুর নিজেই একটা চরিত্র। যাত্রাপাড়ায় কত শিল্পী, নটসম্রাট, নটগুরু, পালাকার, নির্দেশক এসেছেন, আবার কালের স্রোতে চলে গিয়েছেন। চিৎপুর থেকে গিয়েছে। যাত্রার বিবর্তন হয়েছে।
ইতিহাসের ধারায় চিৎপুর নিজেই একটা চরিত্র। যাত্রাপাড়ায় কত শিল্পী, নটসম্রাট, নটগুরু, পালাকার, নির্দেশক এসেছেন, আবার কালের স্রোতে চলে গিয়েছেন। চিৎপুর থেকে গিয়েছে। যাত্রার বিবর্তন হয়েছে।
রথযাত্রার আগের রাত থেকে লাইন পড়েছে শোভাবাজার ঘাটে। সেখানে কেউ বসে, কেউ চাদর পেতে শুয়ে। মধ্যরাতে গঙ্গার ফুরফুরে হাওয়া বইছে। আলোচনা চলছে যাত্রাপালা নিয়ে। সেই আলোচনার বিষয়বস্তু কখনও ‘নটী বিনোদিনী’, কখনও ‘মা মাটি মানুষ’, কখনও ‘গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম’। কিংবা আরও আগের কোনও পালা, যেমন ‘সোনাই দিঘি’, ‘বাঙালি’ কিংবা ‘বাঁশের কেল্লা’ নিয়ে। আর রাত শেষ হয়ে পূবের আকাশে আলো ফুটতেই লাইন পড়ত হরচন্দ্র মল্লিক স্ট্রিটে। নট্ট কোম্পানির অফিসের সামনে। যাত্রাপালা বুকিংয়ের জন্য এমন আগ্রহের কথা শুনলে মনে হয় কোনও রূপকথার গল্প। কিন্তু একসময় তা ছিল ঘোর বাস্তব। এমনই বাস্তব ঘটনার কথা শোনালেন যাত্রার স্বর্ণযুগের বিশিষ্ট অভিনেতা অসীমকুমার।
আসলে রথের রশিতে টান পড়ার আগেই চিৎপুর যাত্রাপাড়ায় শুরু হয় উৎসব। সেদিনটা চিৎপুরে মহরত। নতুন সিজনের শুরু। তাই সেই দিনটির তাৎপর্যই আলাদা। রথের দিনে চিৎপুর মানে এক অন্য সকাল। বিশেষ করে যাত্রার স্বর্ণযুগে। অন্য দিনগুলোয় চিৎপুরের যাত্রার গদিঘরগুলোর ঘুম ভাঙে একটু দেরিতে। দল চালু থাকলে বায়না করতে আসে লোকে মোটামুটি বারোটার পর। কিন্তু রথের দিন যাত্রার বায়না করতে আসা নায়েক বন্ধুরা সকাল আটটার মধ্যে বিভিন্ন গদিঘরে হানা দিতে থাকেন। হাতে তাঁদের সেদিনের খবরের কাগজ। তাতে পনেরো-কুড়ি পাতা যাত্রার বিজ্ঞাপনের ছবি। এক একটা বিজ্ঞাপন সব বলে দেয়। কে কোন দলের হিরো, হিরোইন, কে কোন বই খুলছে, পালাকার, সুরকার কে, সব সেদিনের বিজ্ঞাপন থেকে জানা যেত। নায়ক নায়িকাদের পাতাভরা ছবি। স্বপনকুমার, শান্তিগোপাল, শেখর গাঙ্গুলি, বীণা দাশগুপ্ত, পান্না চক্রবর্তী, তপন কুমার, মোহিত বিশ্বাস, বর্ণালী বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্তু মুখোপাধ্যায়, অনল চক্রবর্তী, কাকলি চৌধুরী সহ বিভিন্ন শিল্পীকে নিয়ে মানুষের আগ্রহ তুঙ্গে ওঠে সেদিন। বায়না করার আগে নায়করা দেখে নেন কোন দলের পালা কেমন।
ওদিকে গণেশ অপেরা, মোহন অপেরা থেকে শুরু করে গণবাণী, প্রভাস অপেরা, সত্যম্বর অপেরা, লোকনাট্য, মাধবী নাট্য কোম্পানি, তপোবন নাট্য কোম্পানি, তরুণ অপেরা, সুশীল নাট্য কোম্পানি, নব রঞ্জন অপেরা, অম্বিকা নাট্য কোম্পানি, আর্য অপেরা, রয়্যাল বীণাপাণি অপেরা অতিক্রম করে পরিক্রমণ শেষ হতো হরচন্দ্র মল্লিক স্ট্রিটে নট্ট কোম্পানির গদিঘরে।
যাত্রার পরিসর একসময় ছিল ষষ্ঠী টু জষ্ঠি। বর্ষার আগেই সিজন শেষ। ততদিনে দলবদলের পাট চুকেছে। এখন যেমন দুর্গাপুজোর থিম গোপন রাখেন পুজো উদ্যোক্তারা, তখনও পালার নাম, কাহিনি, টপের (যাত্রার নায়ক) নাম গোপন রাখা হতো। রথের দিনই সবটা প্রকাশ্যে আসত। অবশ্য পালার নাম দিয়ে বিজ্ঞাপন হলেও তখনও অনেকক্ষেত্রে যাত্রা লেখা শুরুই হতো না। বিজ্ঞাপনে নাম দিয়ে দেখা হতো, সেটা নায়েকদের কতটা আকর্ষণ করছে। রথের দিন বায়নার মেজাজ দেখেই সেটা বোঝা যেত। কত পালা বায়না হল, তার ওপরে সিদ্ধান্ত হতো এই পালা চলবে কিনা! যদি দেখা যেত পালার নাম টানছে, তবে সেটাই রাখা হতো। আবার যদি দেখা হতো, নামটা তেমন পপুলার হয়নি, তখন নামটা বদলে ফেলা হতো। শ্রাবণে পালা লেখা হতো। ভাদ্রে শুরু হতো রিহার্সাল। একমাস চলত রিহার্সাল। গোটা তিনেক পালা থাকত। কখনও কখনও একটা করে সিন লেখা হয়, আর সেটার রিহার্সাল চলে।
সে বছর উৎপল দত্ত প্রথম যাত্রায় এসেছেন। ১৯৬৮। পালার বিজ্ঞাপনও পড়ে গিয়েছে। ‘রাইফেল’। নাটক যেদিন প্রথম পড়া হল, সেটা শুনে পঞ্চু সেন বললেন, ‘এই পালা চলবে না।’ পঞ্চু সেনকে উৎপল দত্ত যাত্রার গুরু হিসাবে মানতেন। মালিকের মাথায় হাত, বিজ্ঞাপন পড়ে গিয়েছে। উৎপল দত্তের নামে ভালো বায়নাও আসতে শুরু করেছে। উৎপল বললেন, ‘চিন্তা করবেন না। আমাকে এক সপ্তাহ সময় দিন, আমি নতুন কাহিনি নিয়ে আর একটা নাটক লিখে দেব। সেটার নামও ‘রাইফেল’ থাকুক।’
এক বছর অনেক দোনামোনা করে শান্তিগোপাল নামালেন হিটলার। ভয় ছিল, পালা হিট করবে তো? দেখা গেল সেই পালা সুপার ডুপার হিট হল। এভাবেই ইতিহাস সৃষ্টি হয়। অনেক ইতিহাসের সাক্ষী চিৎপুর।
স্বপনকুমার যে দলে থাকতেন, সেই দলের মালিক সেই সিজনে ব্যবহারের জন্য প্রতি বছর তাঁকে রথের দিনে একটা করে অ্যাম্বাসাডর গাড়ি কিনে দিতেন। সেই গাড়িতে শো করতে যেতেন স্বপনকুমার। কোনও মালিকের অধিকার ছিল না, স্বপনকুমার দল ছাড়া পর্যন্ত সেই গাড়ি স্পর্শ করার। যে শেখর গাঙ্গুলি, জ্যোৎস্না দত্ত বা শান্তিগোপালের অভিনয় দেখার জন্য প্যান্ডেল ভেঙে পড়ত, তাঁরাই শেষ পর্যন্ত বাস্তব জীবনে হয়ে উঠেছিলে ট্র্যাজিক নায়ক-নায়িকা।
রথযাত্রার দিনের কথা বলতে গিয়ে অসীমকুমার বলেন, ‘ছয় বা সাতের দশকে চিৎপুরে ভোর থেকে নায়েক বন্ধুদের লাইন পড়ে যেত। কে কোন দলের পালা আগে বুকিং করতে পারেন, তাই নিয়ে চলত রেষারেষি। সেইদিনই মূলত দলের ৬০/৭০ নাইট পালা বুকিং হয়ে যেত।’
যাত্রার বিশিষ্ট পালাকার ও অভিনেতা নির্মল মুখোপাধ্যায় বললেন, ‘রথের আগে গদিঘর রং করা হতো। সকালে হতো পুজো। সেদিন নায়েকদের হাতে তুলে দেওয়া হতো দলের হ্যান্ডবিল, পোস্টার, ক্যালেন্ডার। একটা পালার রেটই ছিল আড়াই হাজার থেকে চার হাজার টাকার মধ্যে। নায়েকরা কিছু টাকা দিয়ে তারিখ এবং পালা বুক করে যেতেন। বহুক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, সকাল আটটা থেকে বুকিং শুরু হয়েছে। রাত আটটার পরেও অপেক্ষা করছেন নায়েকরা। চিৎপুরে রথের দিনের জৌলুসই ছিল অন্যরকম।’
যাত্রার বিশিষ্ট অভিনেত্রী লতা দেশাই বন্দ্যোপাধ্যায় রথের দিনে চিৎপুরের কথা বলতে গিয়ে আবেগে ভাসলেন। বললেন, ‘সে এক জমজমাট দিন ছিল। কাগজে পাতার পর পাতা বড় বড় বিজ্ঞাপন বের হতো। অভিনেতা, অভিনেত্রীদের ছবি ছাপা হতো। সেই কাগজ হাতে নিয়ে নায়েকরা বায়না করতে আসতেন। এই দিনটা নায়েক, ম্যানেজার এবং শিল্পীদের একটা মিলনমেলা হয়ে উঠত। এক একটা দল প্রতি বছর দুশোর বেশি পালা অভিনয় করত। একটা দল মানে ছিল একটা পরিবার। সিজনের শেষে ছুটি হয়ে গেলে আমাদের মন খারাপ হয়ে যেত। অনেকে কেঁদে ফেলতেন।’
রথের দিনে গদিঘরে পুজো হতো। কেউ করতেন লক্ষ্মী-গণেশ, কেউ বা জগন্নাথ। ঠাকুরের পায়ের কাছে রাখা হতো পালার খাতা। সেই খাতায় তখনও হয়তো কিছুই লেখা হয়নি। সামান্য গল্পের কাঠামোটুকুই লেখা হয়েছে। রথে সারাদিন ধরে চলত খাওয়াদাওয়া, মিষ্টির প্যাকেট দেওয়া।
আজও চিৎপুরে রথযাত্রার দিন মহরত হয়। তখন যাত্রা অ্যাকাডেমি ছিল না। সবটাই হতো চিৎপুরে। এখন আবার রথের দিন বাগবাজারে ফণিভূষণ বিদ্যাবিনোদ মঞ্চে বসে যাত্রামেলা। সব অপেরা সেখানে টেবিল নিয়ে বসেন। সেখানে এসেও নায়েকরা বুকিং করে যান। এক জায়গায় সব অপেরাকে পাওয়া যায়। এখন রথযাত্রার দিন পালার পোস্টার উদ্বোধন হয়। এখন আবার প্রতিবছর যাত্রার একটা করে থিম সং হয়। সেটার উদ্বোধনও হয় রথের দিন।
মূলত নয়ের দশক থেকে যাত্রার বাজার নষ্ট হচ্ছিল। প্রথমত, ভালো পালাকার, অভিনেতা ও পরিচালকদের একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, বামফ্রন্টের যাত্রানীতি। চিৎপুরের আত্মার মধ্যে ম্লানতা আসছিল। সেই জায়গা থেকে বর্তমান সময়ে যাত্রা অনেকটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বহু দল এখন ভালো ব্যবসা করছে। তার মানে এই নয় যে, যাত্রার মানগত উন্নতি হয়েছে। সরকারি কিছু নীতির কারণে যাত্রা দলগুলি এখন বায়না পাচ্ছে।
কলকাতার বাইরেও যাত্রার বুকিং করা যেত। যেমন মেদিনীপুর, আসানসোল ইত্যাদি। সেখানেও রথের দিনে বায়না নিয়ে উন্মাদনা দেখা যেত। যাত্রাপ্রেমী বিমান সেন জানালেন, রানিগঞ্জে রানিসায়র মোড়ে যাত্রাভবন গড়ে তুলেছিলেন অনিল ভাণ্ডারী। কোলিয়ারি এলাকার বুকিং সেখানে হতো। এছাড়া উত্তরঙ্গের বায়না হতো কুচবিহার হোটেলে।
ইতিহাসের ধারায় চিৎপুর নিজেই একটা চরিত্র। চিৎপুরের যাত্রাপাড়ায় কত শিল্পী, নটসম্রাট, নটগুরু, পালাকার, নির্দেশক এসেছেন, আবার কালের স্রোতে চলে গিয়েছেন। চিৎপুর থেকে গিয়েছে। যাত্রার বিবর্তন হয়েছে। একটা অপেরার সাইনবোর্ড বদলে গিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে আর একটা অপেরা। নায়ক বদলেছে, নায়েক বদলেছে, বদলে গিয়েছে দর্শকও। থেকে গিয়েছে রথযাত্রার পুজো, আপ্যায়ন, বুকিং। চিৎপুর যাত্রাপাড়া রথযাত্রার সেই ট্রাডিশনকে আজও বহন করে নিয়ে চলেছে।
সন্দীপন বিশ্বাস