Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

আর্থিক অনটন সত্ত্বেও মাধ্যমিকের রেজাল্টে তাক লাগাল রানাঘাটের ‘ফেরিওয়ালার মেয়ে’

ফেরিওয়ালার মেয়ে আবার কত লেখাপড়া করবে? বিয়ে দিয়ে দাও। না জানি এরকম কত কথাই শুনতে হয়েছে লক্ষ্মীর বাবা-মাকে

আর্থিক অনটন সত্ত্বেও মাধ্যমিকের রেজাল্টে তাক লাগাল রানাঘাটের ‘ফেরিওয়ালার মেয়ে’
  • ৫ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, রানাঘাট: ফেরিওয়ালার মেয়ে আবার কত লেখাপড়া করবে? বিয়ে দিয়ে দাও। না জানি এরকম কত কথাই শুনতে হয়েছে লক্ষ্মীর বাবা-মাকে। কিন্তু আর্থিক অনটন সত্ত্বেও মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ করেননি তাঁরা। অভাবের মাঝেও লক্ষ্মীর অদম্য জেদ মাধ্যমিকের ফল প্রকাশের পর রাতারাতি সাড়া ফেলে দিয়েছে রানাঘাটে। ৭টি বিষয়েই লেটার মিলিয়ে ৬১২ তার প্রাপ্ত নম্বর। ৮৭ শতাংশ নম্বর নিয়ে নিজের স্কুলে দ্বিতীয় সেই ‘ফেরিওয়ালার মেয়ে’। রানাঘাট সংলগ্ন ১২ জাতীয় সড়কের আঁইশতলার উড়ালপুল পেরিয়ে কিছুটা এগলেই ডানদিকে নেমে গিয়েছে এঁকে বেঁকে যাওয়া এক গ্রাম্যপথ। সেই রাস্তার এক প্রান্তেই চরপাড়া গ্রাম। অনেক ধার দেনা আর মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দাঁড় করানো একতলা পাকা বাড়িটা থাকলেও লক্ষ্মীদের সম্বল বলতে আর কিছুই নেই। বাবা প্রণজিৎ ঘোষ রানাঘাট শহরের বিভিন্ন জায়গায় ফেরি করে দই বিক্রি করেন। কিছুটা অধিক মুনাফা পেতে কখনওকখনও সেই ব্যবসায় হাত লাগাতে হয় মা রিতা ঘোষকেও। এক ছেলে এবং দুই মেয়ের সংসারে সুখ নয়, বরং অভাবটাই নিত্যদিনের। এর মধ্যে বড় বোনের বিয়ে দিতে গিয়েই সঞ্চয়ের প্রায় সবটা খরচ হয়ে গিয়েছে।  তবু লেখাপড়া শিখে অভাবে থমকে যাওয়া পরিবারটাকে কিছুটা সচ্ছল করতে তৎপর রামনগর মিলন বাগান শিক্ষা নিকেতনের পড়ুয়া লক্ষ্মী ঘোষ। দারিদ্র্যের কারণে বাবা একজনও গৃহশিক্ষক দিতে পারেননি। অগত্যা স্কুল শিক্ষকদের সাহায্য এবং পাড়া প্রতিবেশীদের সাহায্যেই মাধ্যমিকের পড়াশোনা তার। বই কেনার সামর্থ্য না থাকায় বছরভর পড়াশোনা করতে হয়েছে স্কুলের লাইব্রেরিতে। সেই লাইব্রেরির চার দেওয়ালের মধ্যে লক্ষ্মী যেন এ যুগের একলব্য। 

Advertisement

শুক্রবার মাধ্যমিকের ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, সেই লড়াইয়ে প্রতিবন্ধকতাকে হারিয়ে সাফল্য ছিনিয়ে এনেছে সে। লাইব্রেরিতে বসে পড়াশোনা করা সেই ছাত্রীর প্রতিটি বিষয়ে প্রাপ্ত নম্বর প্রশংসা আদায় করে। বাংলায় ৯০, ইংরেজিতে এবং অঙ্কে ৮১, জীবন বিজ্ঞান এবং ইতিহাসে ৯০, ভৌত বিজ্ঞানে ৮৬ এবং ভূগোলে ৯৪। দিনে কখনওই ৪ থেকে ৫ ঘণ্টার বেশি লেখাপড়ার সুযোগ হয়নি লক্ষ্মীর। কারণ বাবার সঙ্গে মা পাড়ায় পাড়ায় দই ফেরি করতে বেরলে হেঁসেল ঠেলতে হয় তাকেই। মেয়ের সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে চোখে জল নিয়ে মা বলেন, মেয়ের স্কুলের শিক্ষকরা খুব এত সাহায্য করেছেন। কেউ বই দিয়েছেন, কেউ বিনামূল্য পড়া দেখিয়ে দিয়েছেন। স্কুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইব্রেরির বই নাড়াচাড়া করে পড়াশোনা করতে দিয়েছেন। আমি সকলের কাছেই কৃতজ্ঞ। ভবিষ্যতে কী হতে চায় লক্ষ্মী? তার কথায়, আমাদের তো আর্থিক সমর্থ্য নেই। কম পয়সায় খরচ করে কী পড়লে চাকরি পাব, তাড়াতাড়ি সেটা বুঝতে পারছি না। আপাতত সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করি। তারপর দেখি কী করা যায়। 
অভাবের সঙ্গে লড়াই করে সাফল্য পথ খুঁজতে চাওয়া আজকের প্রতিটি পড়ুয়ার কাছেই রোল মডেল হয়ে উঠতে পারে লক্ষ্মী।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ