Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

অভাব জয় করে মহামেডান স্পোটিংয়ে রামপুরহাটের বৈদ্যনাথ

শৈশবেই পিতৃহারা। সংসার সামলাতে মা হয়ে যান পরিচারিকা। অভাবের সংসার। কিন্তু, লক্ষ্য স্থির আর অধ্যাবসায় থাকলে যে অভাবও একসময় হার মানে, তার সেরা উদাহরণ বৈদ্যনাথ মুর্মু।

অভাব জয় করে মহামেডান  স্পোটিংয়ে রামপুরহাটের বৈদ্যনাথ
  • ২৪ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

বলরাম দত্তবণিক, রামপুরহাট: শৈশবেই পিতৃহারা। সংসার সামলাতে মা হয়ে যান পরিচারিকা। অভাবের সংসার। কিন্তু, লক্ষ্য স্থির আর অধ্যাবসায় থাকলে যে অভাবও একসময় হার মানে, তার সেরা উদাহরণ বৈদ্যনাথ মুর্মু। 

Advertisement

বৈদ্যনাথ একজন দিনমজুর। বাড়ি রামপুরহাট পুরসভার ১১ নম্বর ওয়ার্ডে। দিনমজুরি করার ফাঁকে তার ধ্যানজ্ঞান ছিল ফুটবল। দাপিয়ে খেলতেন এলাকার মাঠে। এবার সেই মাঠ আরও বিস্তৃত, বিশাল। মহামেডান স্পোটিংয়ে সুযোগ পেলেন বৈদ্যনাথ। দলের ডিভেন্ডার হয়ে কলকাতার মাঠ কাঁপাচ্ছেন তিনি। তাঁর এই সাফল্যে উল্লসিত গোটা বীরভূম জেলা। বছর একুশের বৈদ্যনাথ এখন জেলার যুব সমাজের কাছে আইকন।
বৈদ্যনাথের বয়স তখন মাত্র চার বছর। মারা যান বাবা। একমাত্র সন্তানকে বড় করে তুলতে লড়াই শুরু হয় মা সুখমণি কিস্কুর। দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জোটাতে রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজে যোগ দেন তিনি। উদয়াস্ত পরিশ্রম। রাতে ভাঙা ঘরে শুয়ে ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন—ডানপিটে বৈদ্য একদিন বড় ফুটবলার হবে। মায়ের ছিল জহুরির চোখ। ছেলে ছোটবেলা থেকেই ফুটবল পাগল। বৈদ্যনাথের সেই পাগলামিকে মদত দিতে লাগলেন সুখমণি। 
আশোপাশে কোথাও ফুটবল প্রতিযোগীতা হলে ছুটে যেত ছোট্ট বৈদ্যনাথ। বাধা দিতেন না মা। খেলতে দিতেও মানা করতেন না। সেই সাহসে রামপুরহাট শহরের এসডিএসএ গ্রাউন্ডে প্র্যাকটিস করতে থাকেন। সেখানে সমিরুদ্দিন শেখ তাঁকে কোচিং দিতেন। সেইসঙ্গে চলতে থাকে বৈদ্যনাথের পড়াশোনাও। তবে, প্রতিদিন স্কুল যাওয়া হতো না। যেতে হতো দিনমজুরের কাজে। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পরও ফুটবল প্র্যাকটিস ছাড়তেন না বৈদ্যনাথ। এরই মাঝে দু’বছর আসানসোলের বার্নপুরে একটি ফুটবল অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণও নিয়েছেন।  বৈদ্যনাথ বলছিলেন, ‘মাস দুয়েক আগে মহামেডান স্পোটিংয়ে ট্রায়াল দিতে গিয়েছিলাম। আমার খেলা দেখে কর্তৃপক্ষ আমাকে সিলেকশন করেন। বর্তমানে কলকাতায় ভিভিশন লিগ খেলা চলছে। তাতে ডিভেন্ডার হিসেবে খেলছি। সুযোগ পেয়ে খুবই ভালো লাগছে। আমার কোচ  ও বার্নপুরের অ্যাকাডেমির কর্মকর্তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।’ রামপুরহাট কলেজে বিএ প্রথম বর্ষের পর পড়াশোনা হয়ে ওঠেনি বৈদ্যনাথের। তবে, স্নাতকস্তর সম্পূর্ণ করার ইচ্ছে রয়েছে তাঁরা। পাশাপাশি, বৈদ্যনাথের লক্ষ্য, ভারতীয় ফুটবল দলের হয়ে খেলার।  বয়স বাড়ছে সুখমণিদেবীর। এখন আর জোগাড়ের কাজে বল পান না। সংসার চালাতে বেছে নিয়েছেন পরিচারিকার কাজ। তিনি বলছিলেন, ছোটবেলা থেকেই  ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ ছিল ছেলের। দারিদ্রতার কারণে ক্রিকেট খেলায় মনোনিবেশ করতে পারেনি। শুনেছি ওই খেলার পিছনে প্রচুর খরচ করতে হয়। ছেলেও আমার অবস্থা বুঝে ফুটবলে মন দেয়। স্বপ্ন দেখতে শুরু করে ফুটবলার হওয়ার। খালি পেটে কসরত করে গিয়েছে। ভালো খাবারও জোটাতে পারিনি। আজ ওর স্বপ্নপূরণ হতে দেখে খুবই ভা঩লো লাগছে।’ স্থানীয় বাসিন্দা চয়ন মণ্ডল বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃস্থ পরিবারের ছেলে বৈদ্যনাথ। খুব কষ্ট করেই তিনি এই জায়গায় পৌঁছেছেন। আমাদের গর্ববোধ হচ্ছে।’ এসডিএসএর কোষাধ্যক্ষ পার্থপ্রতিম মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘রামপুরহাট থেকে এই প্রথম কেউ মহামেডানে খেলার সুযোগ পেলেন। বৈদ্যনাথ ভালো ডিভেন্ডার। সেই সুবাদেই এই সুযোগ মিলেছে। রামপুরহাটবাসী হিসেবে অত্যন্ত গর্বের বিষয়। আমরা চাইব, যুবকরা মোবাইল ছেড়ে মাঠে আসুক। আরও বৈদ্যনাথ তৈরি হোক।’ আদিবাসী এই যুবকের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি কামনা করেছেন এলাকার বিধায়ক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ও।   নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ