Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

দিগনগরে ছড়িয়ে রবীন্দ্রকাব্যের মণিমুক্তো

কৃষ্ণনগরকে অনেকেই দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জন্মভূমি হিসাবেও চেনেন। কিন্তু এই জনপদেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিও ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করে।

দিগনগরে ছড়িয়ে রবীন্দ্রকাব্যের মণিমুক্তো
  • ১৮ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: কৃষ্ণনগরকে অনেকেই দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জন্মভূমি হিসাবেও চেনেন। কিন্তু এই জনপদেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিও ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করে। নদনদী-বেষ্টিত নদীয়া জেলার গ্রামীণ জীবন, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং সংস্কৃতি বারবার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে কবিগুরুর সাহিত্য সাধনায়। কবিগুরু এসেছিলেন কৃষ্ণনগর শহর ছাড়িয়ে দিগনগর, শান্তিপুর, রানাঘাট, বাদকুল্লা-সহ একাধিক জায়গায়। জানা গিয়েছে, এই জেলার অনেক কবিতাই এই দিগনগরেই কবির কলমে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল। 

Advertisement

১৮৮৯ সালের ৩০ জুন সরলা রায়কে লেখা এক চিঠিতে কবিগুরু উল্লেখ করেন—‘আমি... বাংলার সমস্ত প্রদেশের ছড়া সংগ্রহ করতে প্রবৃত্ত হইয়াছি। কতক কতক সংগ্রহও হইয়াছে।...’  জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ ৮১টি কবিতা, ছড়া, প্রবাদ প্রবচন সংগ্রহ করেছিলেন। সেই ছড়া সংগ্রহের সূচনা হয়েছিল এই দিগনগর থেকেই। রবি ঠাকুরের একটি বিখ্যাত ছড়া— ‘সুবল সুবল ডাক ছাড়ি, সুবল আছে বাড়ি/আজ সুবলের অধিবাস, কাল সুবলের বিয়ে/সুবলকে নিয়ে যাব দিগনগর দিয়ে।’
১২ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশেই অবস্থিত এই দিগনগর গ্রাম। কথিত আছে, নদীয়ার রাজা রাঘব রায় এক বিশাল দীঘি খনন করেছিলেন, যার প্রেক্ষিতেই গ্রামের নাম হয় ‘দিগনগর’। এই গ্রামেই ছিল রবীন্দ্রনাথের বড়দিদি সৌদামিনীর শ্বশুরবাড়ি। সেই সুবাদে কবিগুরুর বহুবার আগমন ঘটেছিল এই গ্রামে। দীঘির পাড়, পোড়ো মন্দির, বটবৃক্ষসবকিছুই কবির কল্পনায় ও কবিতায় হয়ে উঠেছিল জীবন্ত। রবীন্দ্রনাথ এই দিগনগরেই লিখেছিলেন— ‘দিগনগরের মেয়েগুলি নাইতে বসেছে/ মোটামোটা চুলগুলি গো পেতে বসেছে/ চিকন চিকন চুলগুলি ঝাড়তে নেগেছে...’
কৃষ্ণনগরের উপকণ্ঠে, দিগনগর গ্রামকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত এই সাহিত্যভূমি ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের গ্রাম ও নদীতীরে। যেখানে রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতা ও ছড়ার ডালি সাজিয়েজীবন্ত করে তুলেছেন প্রকৃতি, মানুষ ও সংস্কৃতির মিলনকে। দিগনগর থেকে একটু দূরেই বহমান অঞ্জনা নদী। এই নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে আড়বান্দি, পাটুলী, চন্দনদহ ও গোপালপুরের মতো গ্রাম। 
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অঞ্জনা নদীকে স্মরণ করে লিখেছেন, ‘অঞ্জনা নদীতীরে চন্দনী গাঁয়ে/ পোড়ো মন্দিরখানা গঞ্জের বাঁয়ে।’ এই অঞ্জনাই এককালে কৃষ্ণনগর শহরের প্রাণসঞ্চারী শিরা ছিল। 
শোনা যায়, কবিগুরু নদীয়ার বাদকুল্লায় এক খামারবাড়িতে রাত কাটিয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা হয়তো ছায়া ফেলেছিল তাঁর ‘পণরক্ষা’ গল্পে। শান্তিপুরেরও উপস্থিতি রয়েছে রবীন্দ্রসাহিত্যে। এক ছড়ায় তিনি লিখেছেন— ‘উলোর মেয়ের কলকলানি শান্তিপুরের খোঁপা/‌নদের মেয়ের নথ নাড়া কলিকাতার চোপা।’ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নদীয়ার আত্মিক যোগ আরও স্পষ্ট হয় দিগনগরের পাশের কুমোরপাড়ার প্রসঙ্গে। সেখানকার রাঘবেশ্বর মন্দিরের উত্তরে অবস্থিত এই পাড়ার সঙ্গে কবির পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। শোনা যায়, কুমোরপাড়ার কাছেই ছিল কবিগুরুর বড় জামাইবাবু সারদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়ি। সেই পাড়ার চিত্র উঠে এসেছে তাঁর ছড়ায়— ‘কুমোরপাড়ার গোরুর গাড়ি, বোঝাই করা কলসি হাঁড়ি...।’
নদীয়ার প্রবীণ নাগরিক সঞ্জিত দত্ত বলেন, পল্লীকবিরূপে রবীন্দ্রনাথের আত্মপ্রকাশের অন্যতম উৎসস্থল ছিল এই নদীয়া। তাই দিগনগর নামটি রবীন্দ্রকাব্যে অমলিন হয়ে আছে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ