নিতাই সাহা, পুরুলিয়া: ইউটিউব ইউনিভার্সিটিকে যাঁরা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেন, পুরুলিয়ার আদ্রার চিরঞ্জিৎ বাউরির ঘটনা শুনলে তাঁদের চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। বছর তিরিশের চিরঞ্জিৎ গত দশ বছর ধরে ইউটিউব দেখে বক্সিং শিখছেন। তাতে সাফল্যও এসেছে। একাধিক বক্সিং প্রতিযোগিতায় তিনি প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করে চাম্পিয়নশিপ জিতেছেন। তাঁর টালির ছাউনি দেওয়া ছোট্ট মাটির ঘরটি ভরে উঠেছে একাধিক স্বর্ণপদক ও ট্রফিতে। তাঁর কোনও প্রশিক্ষক নেই। অনেকবার অনেক প্রশিক্ষকের কাছে গিয়েছেন ট্রেনিং নিতে কিন্তু অর্থের অভাবে সম্পূর্ণ করতে পারেননি ট্রেনিং। তবে হার মানেননি তিনি। চিরঞ্জিতের এখন স্বপ্ন ওলিম্পিকসে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা।
তবে সে স্বপ্ন আদৌ পূরণ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ী তিনি। কারণ, মুন্সির কাজ করে উপার্জন করা অর্থে সংসার চালানোই দায়। বক্সিংয়ের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা দূরের বিষয়। এখন চিরঞ্জিতের একমাত্র উপায় সরকারি সাহায্য। তার আশায় তিনি চাতকের মতো অপেক্ষারত।
রেল শহর আদ্রার জ্যোতিমোড় এলাকায় বাস চিরঞ্জিতের। টালির ছাউনি দেওয়া ছোট্ট মাটির বাড়িতে মা বন্দনা বাউরিকে নিয়ে থাকেন। ২০১৬ সালে তাঁর বাবা জীবন বাউরির মৃত্যু হয়। আর্থিক অনটনের জেরে সে বছরই পড়াশোনার পাট চুকিয়ে দেন। মাধ্যমিক পাশ করেই সংসারের হাল ধরতে দিনমজুরি শুরু করেন। তবে পাশাপাশি বক্সিং অনুশীলনও চলতে থাকে। এখন তিনি এক ঠিকাদারের অধীনের মুন্সির কাজ করেন। আয় খুব সামান্য। তবে, আর্থিক প্রতিবন্ধকতা স্বপ্নের পথ চলার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ইচ্ছাশক্তিতে ভর করে প্রতিদিন নিয়ম করে ইউটিউবে ভিডিও দেখে অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছেন। সেইসঙ্গে স্থানীয় বেশকিছু যুবক-যুবতীকেও প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। সবটাই বিনে পয়সায়। স্থানীয় একটি ক্লাব চত্বরে অনুশীলনের জন্য একটি বক্সিং রিং তৈরি করেছেন। বক্সিং রিং তৈরি করতে আয়ের একটা অংশ খরচ করেছেন। সেইসঙ্গে স্থানীয় কিছু শুভানুধ্যায়ীর সাহায্যও পেয়েছিলেন।
একটা সময়ে দূর দূরান্তে জনা কয়েক প্রশিক্ষকের কাছে গিয়ে অনুশীলন নেওয়ার চেষ্টা শুরু করেছিলেন। কিন্তু আর্থিক প্রতিবন্ধকতায় তা থমকে গিয়েছে। সেইসঙ্গে চিন্তা বাড়ছে বক্সিং অনুশীলনের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও নিয়মিত পুষ্টিকর খাবারের জোগান নিয়েও। যদিও তিনি লড়াই জারি রেখেছেন। সম্প্রতি সম্প্রতি রাঁচির বিরসা মুন্ডা অ্যাথলেটিক্স স্টেডিয়ামে আয়োজিত ইস্ট ইন্ডিয়া টাইটেল-২০২৫ চ্যাম্পিয়নশিপে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে জয় নিশ্চিত করেন।
চিরঞ্জিত বলেন, দেশের হয়ে ওলিম্পিকসে অংশগ্রহণ আমার জীবনের লক্ষ্য। আর্থিক প্রতিবন্ধকতায় সে স্বপ্ন পূরণ হবে কি না তা জানা নেই। তবে আমি আমার মতো করে পথ চলছি। জারি রয়েছে লড়াই। সরকারিভাবে যদি সহযোগিতা পেতাম, তবে পথ খানিকটা হলেও মসৃণ হতো। দেশের হয়ে স্বর্ণপদক অর্জন করতে পারলেই আমার জীবন স্বার্থক হবে।