সংবাদদাতা, পুরুলিয়া: গাছের বীজ পোঁতা হয়েছিল অনেক আগেই। সেই গাছ এখন ফুল-ফলে ভরপুর। আর সেই ফল খাচ্ছে অন্য লোকেরা। অথচ, আমরা যাঁরা প্রথম গাছটা পুঁতে ছিলাম, তাঁদেরই এখন কোনও গুরুত্ব নেই। আসলে, ওঁরা বুঝতে পারছেন, আমদের সামনে রাখলে অনেকের মুখোশ খুলে যাবে।—পুরুলিয়া জেলায় বিজেপির ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীকে নিশানা করে এমনই বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন পুরুলিয়া জেলার আরএসএসের অন্যতম বরিষ্ঠ কর্মী তথা জেলা বিজেপির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম সদস্য শঙ্করকুমার। তবে, একাংশ নেতার ওপর এভাবে ক্ষোভ উগরে দিলেও জেলায় বিজেপির সাফল্য নিয়ে আশাবাদী তিনি।
জেলায় বিজেপির আদি-নব্যদের দ্বন্দ্ব অনেক দিনের। ভোট আসতে সেই দ্বন্দ্ব ফের মাথাচাড়া দিয়েছে। পুরনো নেতা-কর্মীদের একটা বড় অংশ কাজ না করিয়ে বসিয়ে রাখা হচ্ছে বলে রাজ্য শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে নালিশ ঠুকেছে। সেই সঙ্গে বিধানসভা ভোটের আগেই কাজে লাগানোর দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা। তা নিয়ে পুরুলিয়ার গেরুয়া শিবিরের অন্দরে এখন তোলপাড় চলছে। তার মধ্যেই বাঘমুন্ডির বাসিন্দা সংঘনেতার বক্তব্য গেরুয়া শিবিরের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিল বলে মনে করা হচ্ছে।
শঙ্করবাবু পেশায় টিউবয়েল সারানোর মিস্ত্রি। ৬১ বছরের এই সংঘনেতা বরাবরই বিজেপির আদি নেতাদের পাশেই থেকেছেন। পুরুলিয়ায় গেরুয়ার বাড়বাড়ন্তে তাঁর সদর্থক ভূমিকা সর্বজনবিদিত। কিন্তু, সেভাবে শঙ্করবাবুকে প্রকাশ্যে ঢাকঢোক পেটাতে শোনা যায়নি। আত্মপ্রচারেও বিমুখ তিনি। এবারও তিনি বিজেপির পুরনো কর্মীদের গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করে চলেছেন। নিজেই জানিয়েছেন, ‘ওঁদের লেখা চিঠিতে আমি স্বাক্ষর করেছি।’ একই সঙ্গে তাঁর সমযোজন, ‘বর্তমানে বিজেপি পুরুলিয়া জেলাতে বড় হয়েছে। কিন্তু বিজেপির শুরুর সময়ে আমরা তিনজন ছিলাম। তৎকালীন আরএসএসের পদাধিকারী মোহনলাল চৌবে। তিনি পরে বিজেপির লোকসভার প্রার্থী হয়েছিলেন। ছিলেন হীরালাল শর্মা। বিশ্বহিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি)-এর দায়িত্বে ছিলেন তিনি। পরে হীরালালবাবু বিজেপিতে আসেন। আমরা এই তিনজন ছাড়া বিজেপি করার তেমন আর কেউ ছিলেন না।’
শঙ্করবাবু বলছিলেন, ‘নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিধানসভা ভোটে পুরুলিয়ার ১১টি আসনেই বিধানসভার প্রার্থী দিয়েছিল বিজেপি। বাইকে গোটা জেলা চষে বেড়িয়েছিলাম। জেলায় বিজেপির বীজ ওই সময়গুলিতেই পোঁতা হয়েছিল। সেই গাছই এখন বড় হয়েছে। ফুল-ফল ধরছে। কিন্তু, এখন গাছটি ফল দেওয়ার উপযুক্ত হয়েছে। আর ফল খাচ্ছে অন্যরা। যারা বীজ পুঁতেছিল, গাছকে জল, সার দিয়ে বড় করেছিল, তাঁদের এখন সাইড করে রাখা হয়েছে। ২০১১ সালে বিধানসভার প্রার্থী হয়েছিলাম। ২০২১ সালেও বাঘমুন্ডিতে মনোনয়ন জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু পরে আরএসএস থেকে জানানো হয় এনডিএ জোটপ্রার্থীর জন্য আসন ছাড়তে হবে। তাই সরে এসেছিলাম।’
তবে শুধু শঙ্করবাবুই নন, জেলা বিজেপিতে একসময় লড়াই করে আসা অনেকেই এখন ব্রাত্য। বলরামপুরের বিজেপির একসময় জেলা পরিষদের সদস্য গোপীনাথ গোস্বামী বলেন, ‘যারা বিজেপি ছেড়ে কোথাও যাবে না। আমৃত্যু দলটাই করবে। তাঁদেরকেই আশ্চর্যজনকভাবে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। আমিও জেলা পরিষদের সদস্য হয়েছিলাম। তারপর ধীরে ধীরে আমাকে সাইড করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পুরনো কর্মীদের সামনে রাখলে হয়তো কারও কারও মুখোশ খুলে যাবে।’ যদিও শঙ্করবাবু ও গোপীনাথবাবুর অভিযোগ নস্যাৎ করে দিয়েছেন জেলা বিজেপির সভাপতি শঙ্কর মাহাত। তিনি এদিন বলেন, ‘সবাই কাজ করছেন। সবাইকেই দায়িত্ব দেওয়া রয়েছে। তারপরও কে, কী বলছেন, বলতে পারব না।’