নিজস্ব প্রতিনিধি, বোলপুর: নিম্নমানের খাবার দেওয়া হয়। পৌষমেলার কারণে তাও মিলবে না। বন্ধ থাকবে জেনারেল কিচেন। এমনই অভিযোগ তুলে মঙ্গলবার রাতে আন্দোলনে নেমেছিলেন বিশ্বভারতীর হস্টেলের আবাসিক পড়ুয়ারা। তার জেরেই আন্দোলনরত পড়ুয়াদের বাড়ি বাড়ি হুমকি-চিঠি পাঠানো শুরু করল বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ। পড়ুয়াদের অভিভাবকদের বার্তা, এখনই না ‘শোধরালে’ কড়া ব্যবস্থা গ্রহণের পথে হাঁটতে বাধ্য হবে কর্তৃপক্ষ। এই চিঠির বিষয়টি সামনে আসতে সমালোচনার ঝড় উঠেছে শিক্ষামহলে। ক্ষোভে ফুঁসছেন পড়ুয়ারাও।
বিশ্বভারতীর আশ্রমিক থেকে শুরু করে অধ্যাপকদের একাংশের দাবি, পড়ুয়াদের আন্দোলনের পথে হাঁটতে বাধ্য করেছে কর্তৃপক্ষই। এখন কর্তৃপক্ষের মুখ পুড়েছে দেখে সেই আন্দোলনকে যেনতেন উপায়ে দমন করতে উঠেপড়ে লেগেছে। পড়ুয়াদের সাসপেন্ডের ভয় দেখানো হচ্ছে। অভিভাবকদের হুমকি চিঠি পাঠাচ্ছে। কর্তৃপক্ষের এহেন আচরণে ধিক্কার জানিয়েছেন বিশ্বভারতীর প্রবীণ আশ্রমিক সুপ্রিয় ঠাকুর। তিনি বলেন, পড়ুয়ারা আন্দোলন করবে না তো কারা করবে? তারা তো কোনও অন্যায় দাবিতে আন্দোলন করেনি। কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল পড়ুয়াদের অভাব-অভিযোগ মন দিয়ে শুনে তার সমাধান করা। কিন্তু তা না করে হুমকি চিঠি পাঠাচ্ছে! আসলে কর্তৃপক্ষ ভয় পেয়েছে।
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার রাতে শান্তিনিকেতনের হিন্দি ভবন সংলগ্ন দ্বিতীয় গেটের কাছে থালা বাজিয়ে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন শ্রীসদন, বিড়লা, গোয়েঙ্কা-সহ একাধিক হস্টেলের আবাসিক ছাত্রীরা। তাঁদের অভিযোগ, হস্টেলে থাকায় মূলত জেনারেল কিচেনের খাবার খান তাঁরা। প্রতি মাসের শুরুতেই নির্দিষ্ট টাকা দিয়ে খাবারের কুপন সংগ্রহ করতে হয়। এমাসেও কুপন কেটেছেন। কিন্তু হঠাৎ করেই তাঁরা জানতে পারেন, পৌষমেলার কারণে ২৩ ডিসেম্বর থেকে বিশ্বভারতী ছুটি পড়ে যাচ্ছে। তাই ২২ ডিসেম্বর পর্যন্তই খাবার দেওয়া হবে। মাসের বাকি দিন খাবার মিলবে না। এই বার্তা ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষোভ ছড়ায় পড়ুয়াদের মধ্যে। প্রতিবাদে আন্দোলনে নামেন পড়ুয়ারা।
পড়ুয়াদের এভাবে আন্দোলনে নামতে দেখে ক্ষুব্ধ কর্তৃপক্ষ। পড়ুয়াদের দাবি, মঙ্গলবার রাত থেকেই তাঁদের কাছে প্রক্টর থেকে শুরু করে বিভাগীয় প্রধানদের হুমকি ফোন আসতে থাকে। এক অধ্যাপিকা মোবাইলে ভিডিও রেকর্ডিং করে ছাত্রীদের চিহ্নিত করারও উদ্যোগ নেন। সাসপেন্ডের হুমকি দেন। বৃহস্পতিবার থেকে আন্দোলনে শামিল হওয়া পড়ুয়াদের অভিভাবকদেরও চিঠি পাঠানো শুরু করেন বিভিন্ন বিভাগীয় প্রধানরা।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আপনার সন্তান হস্টেলের নিয়ম ভেঙে মেসের পরিষেবা নিয়ে আন্দোলনে নেমেছে। যা হস্টেলের নিয়মবিরুদ্ধ। শুধু তাই নয়, সাংবাদিকদের সামনে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মন্তব্য করেছে। আপনি আপনার সন্তানকে বিশ্বভারতীর নিয়ম মেনে চলতে বলুন। পরবর্তীতে ফের এই ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়ালে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্ষোভে ফুঁসলেও চিঠির বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে ভয় পাচ্ছেন আন্দোলনকারীরা। বিশ্বভারতীর জনসংযোগ আধিকারিক অতিগ ঘোষ বলেন, পড়ুয়াদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অভিভাবকদের জানানোতে তো কোনও অপরাধ নেই। কারণ, অভিভাবকরা অঙ্গীকারপত্রে সই করেই পড়ুয়াদের ভর্তি করেছেন।
শিক্ষাবিদদের মতে, রবীন্দ্রনাথ পড়ুয়াদের সরব, চিন্তাশীল, প্রশ্নপরায়ণ করে তোলার পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু তাঁরই প্রতিষ্ঠানের বর্তমান কর্তৃপক্ষ চায় প্রশ্নহীন আনুগত্য! যা মুক্তচিন্তার গোড়ায় আঘাত করে। বিশ্বভারতীর প্রাক্তন এসএফআই নেতা প্রত্যুষ মুখোপাধ্যায় বলেন, বিশ্বভারতীতে পড়ুয়াদের এভাবে হুমকি চিঠি পাঠানোর ট্রেন্ড শুরু করেছিলেন প্রাক্তন উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তী। বর্তমান উপাচার্যও সেই পথেই হাঁটছেন। বিশ্বভারতীতে থ্রেট কালচার চালাচ্ছেন।