Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

লক্ষ্যপূরণের প্রস্তুতি

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দাবি ছিল, বাংলাদেশ-পাকিস্তান-মায়ানমার থেকে আগত বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের দাপটে দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলির জনবিন্যাস বদলে যাচ্ছে।

লক্ষ্যপূরণের প্রস্তুতি
  • ২৬ মে, ২০২৬ ০৪:০০

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দাবি ছিল, বাংলাদেশ-পাকিস্তান-মায়ানমার থেকে আগত বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের দাপটে দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলির জনবিন্যাস বদলে যাচ্ছে। বাংলায় বিধানসভা ভোটের প্রচারে এই ‘ঘুসপেটিয়া’ অর্থাৎ অনুপ্রবেশকারীদের রুখতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নিদান ছিল, ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’। কেন্দ্রীয় সরকারের দুই শীর্ষকর্তার কথাকে শিরোধার্য করে বঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার কড়া পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করে বুঝিয়ে দিল, দেশজুড়ে বিজেপির অন্যতম প্রধান ইস্যু অনুপ্রবেশকারীদের আর রেয়াত করা হবে না। সাধারণভাবে বেআইনি অনুপ্রবেশের অভিযোগে কেউ ধরা পড়লে বৈদেশিক আইনে মামলার বিচারে সাজা হলে তাঁর জেল হত। সাজা শেষে সেই ব্যক্তিকে ‘পুশ ব্যাক’ করা হত। কিন্তু বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জেলমুক্তির পরেও দুই দেশের টানাপোড়েনে পুশ ব্যাক করতে বহু কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে। এবার থেকে সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীদের আটকের পর আর জেল নয়, সরাসরি পাঠানো হবে ডিটেনশন ক্যাম্পে। সরকারি ভাষায়, ‘হোল্ডিং সেন্টার’। জেলায় জেলায় সন্দেহভাজন বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের আটক করে এই সেন্টারে রাখা হবে। সেখানেই তাঁদের নাগরিকত্ব প্রমাণের কাজ সারতে হবে ৩০ দিনের মধ্যে। আটক ব্যক্তিরা সেই প্রমাণে ব্যর্থ হলে পুশ ব্যাকের জন্য সরাসরি তাদের বিএসএফ-এর হাতে তুলে দেওয়া হবে। অন্যদিকে, এবার অনুপ্রবেশের দায়ে জেলের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া ‘বিদেশি’ অনুপ্রবেশকারীদেরও স্থান হবে এই হোল্ডিং সেন্টারে। বঙ্গে পালাবদল হতেই তার জোরদার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে। 

Advertisement

দেশে সিএএ আইন চালু হওয়ার পর অনুপ্রবেশকারীর সংজ্ঞাটাই অবশ্য বদলে দিয়েছে মোদি সরকার। নতুন আইন অনুযায়ী, ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে হিন্দু, শিখ, বুদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের কেউ এদেশে প্রবেশ করলেও তিনি ‘অনুপ্রবেশকারী’ নন, শরণার্থী হিসাবে চিহ্নিত হবেন। শুধু তাই নয়, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আগত এই ছ’টি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ব্যক্তিরা সিএএ-তে আবেদন করলে তাঁরা ভারতের নাগরিকত্ব পর্যন্ত পেয়ে যাবেন। প্রশ্ন হল, ভারতে অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা কত? পশ্চিমবঙ্গেই বা এই সংখ্যা কত? কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য বলছে, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ভারতের সীমান্তে বিএসএফ-এর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে ২৩ হাজার ৯২৬ জন। সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তার হয়েছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে। একইভাবে ২০২৩ থেকে ২০২৫-এর জুলাই মাস পর্যন্ত আড়াই বছরে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে ধৃত অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। এদের মধ্যে কতজন অনুপ্রবেশকারীকে পুশ ব্যাক করা গিয়েছে, সেই ছবি স্পষ্ট নয়। গত বছর দেশজুড়ে ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন শুরু হওয়ার অন্যতম কারণ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা বলে জানিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। ঘটনা হল, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার সহ যেসব রাজ্যে ইতিমধ্যে এসআইআর-এর কাজ শেষ হয়েছে—তার মধ্যে কতজন বেআইনি অনুপ্রবেশকারী, তা এখনও জানাতে পারেনি নির্বাচন কমিশন বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। তবে বঙ্গে যে ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম এখনও ‘বিবেচনাধীন’ রয়েছে, তার সিংহভাগ মুসলিম অনুপ্রবেশকারী বলে দাবি বর্তমান শাসকদলের নেতাদের একাংশের। একথা ঠিক, দেশ অনুপ্রবেশকারীতে ভরে যাবে— এটা যেমন ঠিক নয়, ঠিক তেমনই দেশের মানুষও সরকারের কাছে জানতে চায়, এদেশে অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা আসলে কত? সরকার এক্ষেত্রে কোনোরকম ধোঁয়াশা না রেখে প্রকৃত সত্য প্রকাশ করুক। 
আসলে অনুপ্রবেশকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতি বারবার উত্তাল হয়েছে। অমিত শাহদের অভিযোগ হল, অনুপ্রবেশকারী মুসলিমরা বিরোধীদের ‘ভোট ব্যাংক’। এই কারণেই পশ্চিমবঙ্গে বিগত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিতে প্রয়োজনীয় জমি দেয়নি বিএসএফকে। এর পালটা বক্তব্য হিসাবে বিরোধী অর্থাৎ তৎকালীন শাসকদল তৃণমূলের অভিযোগ হল, সীমান্তে অনুপ্রবেশ আটকানোর দায় বিএসএফ-এর, যা শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে। তাই এই ব্যর্থতার দায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরই। এই চাপানউতোরের মধ্যেই অনুপ্রবেশকারীদের নিজ দেশে পাঠাতে খুব দ্রুত কিন্তু ধাপে ধাপে এগচ্ছে এরাজ্যের নব নির্বাচিত ডবল ইঞ্জিন সরকার। ইতিমধ্যে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিতে বিএসএফ-এর হাতে অনেকটা জমি তুলে দিয়েছে রাজ্য। ‘ডিলিট’ মানে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার কাজ প্রায় সম্পন্ন। এরপর ‘ডিপোর্ট’ অর্থাৎ সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে পুশ ব্যাকের স্থায়ী বন্দোবস্ত করা। মাঝে মাসখানেকের জন্য হোল্ডিং, সেন্টারে রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা। একথা ঠিক, ভারত কোনো ধর্মশালা নয়। সুতরাং বেআইনি বসবাসকারীদের চিহ্নিত করে তাঁদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ। কিন্তু এই বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিতকরণের কাজ ঠিকমতো হবে তো? শুধু সন্দেহের বশে কোনো বৈধ নাগরিক শাস্তি পাবে না তো? প্রশ্নগুলো পুরোটা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে যাতে কোনোরকম অবিচার বা হয়রানি না হয় তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। 

সম্পর্কিত সংবাদ