Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কাগজের নোট যখন অস্ত্র হয়ে ওঠে!

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করেন, আমেরিকা শুধু আমেরিকানদের জন্য। কিন্তু ডলার গোটা দুনিয়ার জন্য।

কাগজের নোট যখন অস্ত্র হয়ে ওঠে!
  • ৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করেন, আমেরিকা শুধু আমেরিকানদের জন্য। কিন্তু ডলার গোটা দুনিয়ার জন্য। ট্রাম্প ট্যুইট করে হুমকি দিয়েছিলেন, যদি উদীয়মান অর্থনীতির জোট ব্রিকস নতুন মুদ্রা চালু করে অথবা ‘মার্কিন ডলারের বিকল্প হিসেবে অন্য কোনও মুদ্রাকে সমর্থন দেয়’, তাহলে সেই জোটের সকলের পণ্য আমদানিতে ১০০ শতাংশ শুল্ক বসানো হবে।

Advertisement

আসলে অর্থনীতি এবং রাজনীতির মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্ক কখনও দৃশ্যমান, কখনও অদৃশ্য। কখনও শান্তিপূর্ণ, আবার কখনও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জন্ম দিয়েছে। তবে ইতিহাসের সবচেয়ে চতুর কৌশল বোধ হয় একটা কাগজের মুদ্রাকে বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার প্রতীক বানানো। ডলার হল সেই মুদ্রা। ধীরে ধীরে সে গোটা পৃথিবীকে তার শিকলে জড়িয়েছে। এটি কীভাবে সম্ভব হল? এর পিছনে রয়েছে এক দীর্ঘ পরিকল্পনা। এর শিকড় ছড়িয়ে আছে যুদ্ধ, তেল, ঋণ এবং কূটনীতির গভীরে।
১৯৪৪ সাল। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রায় শেষের দিকে। যুদ্ধে ইউরোপ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ব্রিটেন আর্থিক সংকটে জর্জরিত। জার্মানি ও জাপানের অর্থনীতি চূর্ণ–বিচূর্ণ। এমন অবস্থায় বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার জন্য আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারে ব্রেটন উডস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক লেনদেনের ভিত্তি হবে মার্কিন ডলার। আর তা সোনার সঙ্গে যুক্ত থাকবে। অর্থাৎ, প্রতিটি ডলার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সোনার সমতুল্য হবে। আর বিশ্বের অন্যান্য মুদ্রাগুলি তাদের মান নির্ধারণের জন্য ডলারের উপর নির্ভর করবে। ডলারের বিশ্বজয়ের শুরু সেদিন থেকেই। কারণ, বিশ্বের অন্যান্য দেশকে নিজেদের মুদ্রার মান ঠিক রাখতে হলে ডলারের রিজার্ভ রাখতে হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও লেনদেনে ডলার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। তবে আমেরিকার একটি সীমাবদ্ধতা ছিল। যেহেতু ডলার সোনার সঙ্গে যুক্ত, তাই আমেরিকা চাইলে ইচ্ছেমতো ডলার ছাপাতে পারত না। কারণ, প্রতিটি ডলারের বিপরীতে সমপরিমাণ সোনা মজুত রাখতে হত।
কিন্তু ১৯৬০-এর দশকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। আমেরিকা তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়িয়ে। ফলে বাজারে প্রচুর ডলার ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সেই অনুপাতে সোনার মজুত ছিল না। এরই মধ্যে ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ আমেরিকার কাছে দাবি করে, তারা তাদের হাতে থাকা ডলারের বিনিময়ে সোনা নিতে চায়। এটি ছিল ব্রেটন উডস চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী তাদের বৈধ অধিকার। কিন্তু আমেরিকা বুঝতে পারে, যদি সবাই সোনা দাবি করতে থাকে, তাহলে তাদের ভাণ্ডারে থাকা সোনায় টান পড়বে। তৈরি হবে অর্থনৈতিক সংকট। এই পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ঘোষণা করেন, ‘এখন থেকে ডলার আর সোনার সঙ্গে যুক্ত থাকবে না।’ অর্থাৎ, আমেরিকা এখন থেকে ইচ্ছেমতো ডলার ছাপাতে পারবে এবং এর কোনও নির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকবে না। বিশ্ব অর্থনীতিতে এটি ছিল এক বিশাল ধাক্কা। এই সিদ্ধান্ত ইতিহাসে ‘নিক্সন শক’ নামে পরিচিত। এই ঘোষণার মাধ্যমে ডলার এক সম্পূর্ণ নতুন রূপে আবির্ভূত হয়। এবার সে শুধু একটি কাগজের মুদ্রা নয়, বরং এক রকম বিশ্বাসের প্রতীক। মানুষ যত দিন বিশ্বাস করবে যে ডলার মূল্যবান, তত দিন এটি চলবে। নিক্সন যখন ডলারকে সোনার মান থেকে মুক্ত করেন, তখন আমেরিকার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশ কেন এখনও ডলার গ্রহণ করবে? কারণ, এখন এটি তো শুধু একটি কাগজ, যার পিছনে কোনও বাস্তব সম্পদ নেই।
এই সংকট সমাধানে আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যের দিকে নজর দেয়। ১৯৭৩ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি গোপন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেখানে বলা হয়— সৌদি আরব তেল বিক্রির ক্ষেত্রে শুধু ডলার গ্রহণ করবে। এর পরিবর্তে আমেরিকা সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা ও নিরাপত্তা দেবে। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য ওপেক (অর্গানাইজেশন ফর পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ) দেশগুলিও এই চুক্তি অনুসরণ করে। ফলে, বিশ্বের সব দেশকে তাদের প্রয়োজনীয় তেল কেনার জন্য ডলার সংগ্রহ করতে হয়। যারাই তেল কিনতে চায়, তাদেরই ডলারের প্রয়োজন হয়। ফলে, দেশগুলি তাদের রিজার্ভে ডলার জমাতে বাধ্য হয়। এভাবেই ডলার সোনার পরিবর্তে ‘তেলের মানদণ্ডে’ পরিণত হয়। যাকে বলা হয় ‘পেট্রোডলার ব্যবস্থা’। এই কৌশল আমেরিকাকে আরও শক্তিশালী করে। কারণ, এখন তারা যত খুশি ডলার ছাপাতে পারে। বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলিকে তা ব্যবহার করতে বাধ্যও করতে পারে।
ডলার কেবল লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে বিশ্বকে শাসন করেনি, এটি ভয়ংকর ঋণের ফাঁদও তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) উন্নয়নশীল দেশগুলিকে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ডলারে ঋণ দিতে শুরু করে। এই ঋণের সঙ্গে কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হত, যেমন—সরকারি সম্পদ বেসরকারিকরণ, সামাজিক খাতের বাজেট কমানো, মার্কিন কোম্পানিগুলিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া ইত্যাদি। অনেক দেশ এই ঋণের জালে আটকে পড়ে। এভাবেই ডলার শুধু একটি মুদ্রা নয়, বরং এটি অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মার্কিন ডলার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল মুদ্রা হিসেবে রাজত্ব করে আসছে। বিশ্বব্যাপী আমদানি-রপ্তানি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ, জ্বালানি লেনদেন— সবকিছুতেই ডলারের একচেটিয়া আধিপত্য।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে একাধিক দেশ ও জোট ডলারের বিকল্প ব্যবস্থার দিকে এগোতে শুরু করেছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে শক্তিশালী পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতে ডলারের আধিপত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের উত্থান গত দুই দশকে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ২০২০-র পর দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়। চীন শুধু উৎপাদনশীলতার দিক থেকে নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তাদের নিজস্ব মুদ্রা ইউয়ানের ব্যবহার বাড়িয়ে ডলারের আধিপত্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। চীন বিভিন্ন দেশে ট্রেনলাইন, বন্দর, সড়ক এবং শিল্প–কারখানা নির্মাণ করছে। এর বিনিময়ে চীন ওই দেশগুলির সঙ্গে ইউয়ানে লেনদেন করছে। ফলে এসব দেশেও ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ছে এবং ডলারের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে উঠছে। এ ছাড়া চীন বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলির সঙ্গে মুদ্রা বিনিময় চুক্তি করেছে। এর ফলে দেশগুলি চাইলে ডলারের পরিবর্তে সরাসরি ইউয়ানে লেনদেন করতে পারে। বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলির মধ্যে অন্যতম রাশিয়া ও ইরান ইতিমধ্যেই চীনের সঙ্গে তেল ও গ্যাস লেনদেনে ডলারের পরিবর্তে ইউয়ান গ্রহণ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিও এখন চীনের সঙ্গে ইউয়ানে বাণিজ্য করার পরিকল্পনা করছে।
রাশিয়া ডলারের আধিপত্য ভাঙতে সবচেয়ে আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর আমেরিকা ও ইউরোপ রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। রাশিয়ার ব্যাংকগুলিকে আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম সুইফট সিস্টেম থেকে বাদ দেওয়া হয়। এর ফলে রাশিয়া ডলারভিত্তিক লেনদেন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা শুরু করে। রাশিয়া তার প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে রুবল ও ইউয়ানভিত্তিক লেনদেন চালু করে। ভারত ও চীনের সঙ্গে রাশিয়া তেলের দাম রুবল ও ইউয়ানে নিচ্ছে, যা ডলারের জন্য বড়ো একটি ধাক্কা। ফলে ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে দুর্বল হতে শুরু করেছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা) জোটের শক্তিশালী হয়ে ওঠা। ২০২৩ সালে ব্রিকস সম্মেলনে নতুন সদস্য হিসেবে সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, মিশর ও ইথিওপিয়া যোগ দেয়। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ। ২০২৪ সালে কাজান শহরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে প্রথম ‘ব্রিকস’-এর বিকল্প মুদ্রা তৈরির প্রস্তাব দেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। আমেরিকার ‘চিরশত্রু’ রাশিয়ার এই ঘোষণার পরেই ওয়াশিংটনের মাথাব্যথা শুরু হয়। বিশ্বের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপির অনেকটাই দখলে রয়েছে ‘ব্রিকস’-ভুক্ত দেশগুলির কাছে। সেই কারণে এই গোষ্ঠীর মুদ্রা তৈরি নিয়ে আতঙ্কে ভুগছে আমেরিকা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতিমধ্যেই এই মুদ্রা-যুদ্ধকে বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। প্রশ্ন হল, ১০ বিদ্রোহীর খাঁড়ার কোপে শেষ হবে মার্কিন অর্থনীতির দাদাগিরি? তারা যদি ডলারের বদলে ব্রিকস মুদ্রা বা ইউয়ানে লেনদেন শুরু করে, তাহলে তা ডলারের উপর সরাসরি আঘাত হানবে। ব্রিকস দেশগুলি নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি বিকল্প আন্তর্জাতিক মুদ্রা বা ডিজিটাল মুদ্রা চালুর পরিকল্পনা করছে। যদি তারা তা বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে তা ডলারের জন্য সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। ডলারের আধিপত্য হারানো আমেরিকার জন্য বিশাল অর্থনৈতিক ধাক্কা হতে পারে। এমনই মনে করছেন মার্কিন অর্থনীতিবিদ জেরাল্ড সেলেন্ট। মার্কিন ডলারের ভবিষ্যৎ অন্ধকার বলেও ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন সেলেন্ট। মার্কিন মুদ্রার পতনকে ‘ডলারের মৃত্যু’ বলে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘যা ঘটছে তা আমেরিকার অর্থনীতির পতন। ডলারের মৃত্যুর কাল ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে।’
রাতারাতি হয়তো কিছু ঘটবে না। তবে ইতিহাস বলছে, একসময় ব্রিটিশ পাউন্ড বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বিস্তার করেছিল। এখন তার সেই দাপট আর নেই। ডলারের ক্ষেত্রেও কি একই ঘটনা ঘটতে চলেছে? আগামীর বিশ্বে কোন কাগজের নোট হয়ে উঠবে 
নতুন অস্ত্র? নতুন বছরে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে গোটা দুনিয়া।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ