Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

আচার পালনে মনসার পাত্রে যৎসামান্য ভক্তদের আনা দুধে পুষ্টি পায় গরিব শিশুরা

শিবরাত্রি হোক বা মনসা মায়ের আরাধনা। গোরুর দুধে পুজোবিধি এই বাংলায় বেশ প্রাচীন

আচার পালনে মনসার পাত্রে যৎসামান্য ভক্তদের আনা দুধে পুষ্টি পায় গরিব শিশুরা
  • ১৬ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

দীপন ঘোষাল, রানাঘাট: শিবরাত্রি হোক বা মনসা মায়ের আরাধনা। গোরুর দুধে পুজোবিধি এই বাংলায় বেশ প্রাচীন। কিন্তু, সেই দুধ কী অপচয়? নাকি আধ্যাত্মিক রীতির ধারক ও বাহক? এমন প্রশ্নে আড়াআড়ি ভাগ হয়ে রয়েছে সমাজ। মাঝেমধ্যেই তর্কবিতর্কও চলে সোশ্যাল মিডিয়ায়। শানানো যুক্তিবান নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে গুঁতোগুঁতি করেন। বিবদমান এই দু’পক্ষকে অবশ্য রানাঘাটের তারাপুরের মনসা পুজো। আসলে কথায় রয়েছে, ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহদূর।’ সম্ভবত বাংলার এই একমাত্র পুজোয় ‘বস্তু’ দুধ মিলিয়ে যায় বিশ্বাসে। আর ‘তর্ক’ থেমে যায় আচারে। কীভাবে? মনসা মায়ের মন্দিরে শত শত ভক্ত আসেন লিটার লিটার দুধ নিয়ে। সেই দুধ ঢেলে নষ্ট করা হয় না। খাওয়ানো হয় এলাকার সব শিশুদের। উদ্যোক্তাদের মতে, এটাই আমাদের পুজোর মূল আচার। জীবসেবাই হল শিব সেবা। 

Advertisement

রানাঘাটের তারাপুর অঞ্চলের কালিবাজার থেকে কিছুটা গেলেই দক্ষিণপাড়া। সেখানেই হয় শতবর্ষ ছুঁই ছুঁই মনসা পুজো। আদতে তা বাড়ির পুজো হলেও বিশ্বাস আর ভক্তিতে হয়ে উঠেছে সার্বজনীন। বিনয় রায়ের মনসা পূজো বলেই খ্যাত। বিনয়বাবুর জ্যাঠামশাই বলাই রায় শুরু করেছিলেন এই পুজো। তখন এলাকায় ছিল প্রচণ্ড সাপের উৎপাত। তা ঠেকাতে শুরু মা মনসার আরাধনা। দুধ আর কলা নিয়ে দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসতেন। পুজোর পাত্রে জমা পড়ত লিটার লিটার দুধ। আজও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু এত দুধ কী হবে? সবটাই কী পুজোয় নিবেদন করার পর ভাসিয়ে দেওয়া হবে জলে? মানতে পারেননি বৃদ্ধ বলাইবাবু। তিনি বিধান দেন, পুজোর জন্য সমস্ত দুধ একত্রিত করা হবে একটি বড় পাত্রে। তার নামমাত্র অংশই ব্যবহার হবে পুজোয়। তাতে মায়ের পুজোর আচারে ত্রুটি রইল না। বাকি পরিমাণ দুধ পুজোর শেষে গরম করে পৌঁছে দেওয়া হবে গোটা গ্রামের সমস্ত অভাবী পরিবারের শিশুদের কাছে। এটাও হবে আমাদের জীব সেবার মধ্যে দিয়ে ঈশ্বরের সাধনা। সেই শুরু। এরপর নয় দশকেরও বেশি সময় ধরে গোটা গ্রাম অক্ষরে অক্ষরে পালন করে আসছে বলাইবাবুর বিধান।  
মঙ্গলবার ছিল নাগ পঞ্চমী তিথি। বাংলার তেরো পার্বণের অন্যতম। দেবী মনসার আরাধনার দিন। সেখানে দেখা গেল, আজও বলাই রায়ের সময় শুরু হওয়া সেই ব্যতিক্রমী রীতির। বিনয়বাবু বলছিলেন, ‘প্রায় ৯০ বছরেরও বেশি আগে তাঁর জ্যাঠামশাই শুরু করেছিলেন এই পুজো। সেই সময় গ্রামের সাপের উপদ্রব ঠেকাতেই মা মনসার আরাধনা হয়। কিন্তু পুজোয় লিটার লিটার দুধের অপচয় মানতে পারেননি জ্যাঠামশাই। আবার পুজোতেও লাগবে দুধ। তাই, আচার আর মানবিকতাকে তিনি গাঁথলেন এক সূত্রে। পুজোয় আসা অঢেল দুধ তিনি খাওয়ানোর বন্দোবস্ত করলেন গ্রামের কচিকাঁচাদের। সে সময় মূলত অভাবী পরিবারে পৌঁছে দেওয়া হতো এই দুধ। এখনও সেটাই হয়।’ গ্রামের বাসিন্দা বহুরূপা মল্লিক বলছিলেন, ‘বিয়ের পর থেকেই আমি এখানে পুজো দিতে আসছি। বিরাট বড় একটি হাড়িতে দেখি দুধ জমানো হতো। তারপর বিকেলে সমস্ত বাচ্চাদের এক জায়গায় করে সেই দুধ ভাগ করে দেওয়া হতো। এখনও আমরা এসে প্রথমেই পুজোর দুধ দেবী মূর্তির পাশে রাখা নির্দিষ্ট পাত্রে ঢেলে দিই।’ 
আজ, বলাইবাবু বেঁচে থাকলে তাঁর এমন বিধান হয়তো আন্দোলনের রূপ নিত বাংলা ছাড়িয়ে গোটা ভারতে। আসলে, ক’জনই বা মানেন, স্বামীজির সেই মহান উক্তিকে—‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’ -নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ