শান্তনু দত্তগুপ্ত: বাঙালি জন্ম-জন্মান্তরের রহস্যপ্রেমী। তাদের ছেলেবেলা শুরু হয় পাণ্ডব গোয়েন্দা দিয়ে। তারপর ফেলুদা আসে। আর সবশেষে শার্লক হোমস এবং ব্যোমকেশ। তাঁরাই বাঙালিকে শেখান, সব ইট উলটে দেখবে। একটাও বাদ দেবে না। কোনও ছোট বিষয়কে অবজ্ঞা করবে না। এইসব শিক্ষা স্কুল বয়স থেকেই বাঙালির অস্থিমজ্জায় ঢুকে যায়। সংসারের থালা হোক বা রাজনীতির পালা... সর্বত্র বাঙালি রহস্য খোঁজে। কেউ প্যাটির মধ্যে চিকেন খোঁজে, কেউ সহিষ্ণুতার মধ্যে ধর্মবিরোধী গন্ধ, কেউ বাড়তি ছুটিতে ‘পাওনা’ এড়িয়ে যাওয়ার ফিকির। নিত্যদিন বাঙালি তাই হ্যাপেনিং কিছু খুঁজে নিতে পারে। এই মাগ্গিগন্ডার বাজারেও। ওটাই তার রোজকার রিল্যাক্সেশন। এই মুহূর্তে যেমন ভাবনার ভাণ্ডার টইটম্বুর ইডি ইস্যুতে। মানে, আইপ্যাকে কেন্দ্রীয় এজেন্সির হানা নিয়ে আর কী। বিষয়টা এই পর্যায়ে পৌঁছাত না। কিন্তু গেল... কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ইডি এর আগেও তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীদের ঘরে হানা দিয়েছিল। কোনওবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে যাননি। এবার গেলেন। আর তাতেই বাঙালি ছুরি-কাঁচি নিয়ে কাটাছেঁড়া করতে বসে পড়ল, কেন গেলেন তিনি? নেপথ্য রহস্যটা কী? অনেকরকম ন্যারেটিভ বাজারে চালু হয়ে গেল। প্রথম, নিশ্চয়ই দুর্নীতি সংক্রান্ত কোনও ফাইল ছিল, সেটা গিয়ে তিনি সরিয়ে নিয়ে এসেছেন। ওই সবুজ ফাইল... ওটাই আসল। কী আছে তাতে? কাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন মুখ্যমন্ত্রী? দ্বিতীয় ন্যারেটিভ, ভোটের আগেই ইডি-সিবিআই অতিসক্রিয় হয়ে ওঠে। এবার পালটা চাল দিয়েছেন মমতা। আইপ্যাক তো বহু বছর ধরে তৃণমূলের হয়ে কাজ করছে। তাহলে পাঁচ বছরের পুরানো মামলায় হঠাৎ ভোটের আগে তাদের ঘরে হানা দেওয়ার দরকার কী ছিল? এ তো চেনা গল্প! তৃতীয়, এসআইআরে কিছু লাভ করতে পারেনি বিজেপি। তাই তৃণমূলের স্ট্র্যাটেজি লুট করতে এজেন্সি নামিয়েছে। কয়লা-টয়লা বাজে ব্যাপার। লোক দেখানো। আসলে তৃণমূলের ভোট-প্ল্যানিং ওদের লক্ষ্য। চতুর্থ এবং বাঁদিক ঘেঁষা চেনা থিয়োরি, ওসব তো সেটিং! ভোটের আগে এটা বিজেপি আর তৃণমূল করেই থাকে।
ন্যারেটিভ আরও থাকতে পারে। আপাতত এই ন্যারেটিভগুলো একটু নেড়েঘেঁটে দেখা যাক। প্রথম প্রশ্ন, মুখ্যমন্ত্রী সত্যিই কাউকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন কি? ক্রোনোলজিটা একবার বুঝে দেখি! সকাল ৬টা ১০ মিনিটে ইডি আধিকারিকরা লাউডন স্ট্রিটে প্রতীক জৈনের আবাসনে ঢুকেছিলেন। একযোগে তল্লাশি শুরু হয়েছিল আইপ্যাকের সেক্টর ফাইভের অফিসেও। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লাউডন স্ট্রিট পৌঁছান সকাল সাড়ে ১১টায়। সেটাও শেক্সপিয়র সরণি থানায় অভিযোগ করে এবং পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মাকে জানিয়ে। খুব স্বাভাবিকভাবেই নির্ধারিত সূচির বাইরে মুখ্যমন্ত্রী কোথাও গেলে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নাড়াচাড়া পড়ে যায়। সেদিনও গিয়েছিল। কমিশনার সাহেবও ছুটে গিয়েছিলেন সেখানে। সেটা এখানে প্রায়োরিটি নয়! বরং দেখতে হবে, ইডি প্রতীক জৈনের ফ্ল্যাটে যাওয়া এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৌঁছানো—এর মধ্যে ফারাক প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার। এই দীর্ঘ সময়ে ইডি কী করছিল? যদি দুর্নীতি সংক্রান্ত তেমনই তথ্য-প্রমাণ হত, তাহলে তদন্তকারী অফিসাররা নিশ্চিতভাবে তা এই সময়ের মধ্যে ডিজিটাইজ করে ফেলেছেন বা পাঠিয়ে দিয়েছেন দিল্লিতে। আর সবচেয়ে বড় কথা, আজকের এই হাইটেক যুগে কেউ গুরুত্বপূর্ণ ফাইল (যাতে কেস খাওয়ার ন্যূনতম সম্ভাবনা আছে) ফেলে ছড়িয়ে রাখে না। গোপন কোনও ডিভাইসে রাখে বা সার্ভারে। সেখানেও কঠিন পাসওয়ার্ডের পাশাপাশি এমনভাবে ভুলভাল ডেটার সঙ্গে সেই ফাইল রাখা হয়, যা গুলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আইপ্যাকের মতো প্রফেশনাল সংস্থা যদি প্রতীক জৈনের বাড়ি বা নিজেদের অফিসে সেইসব তথ্য জমা করে রেখেই থাকে, তা নিশ্চয়ই কোনও সবুজ ফাইলে হবে না! আর যতদূর ইডি সূত্রেই জানা যাচ্ছে, ২০২২ সালে আইপ্যাক সংক্রান্ত ‘মানি ট্রেইল’ হাতে এসেছিল ইডির। সেই সূত্রে ‘অভিযান’। কিন্তু সেটা সাড়ে তিন বছর পর কেন? ততদিন কি আইপ্যাক সেই তথ্য-প্রমাণ ইডির জন্য ডালিতে করে সাজিয়ে রেখে দিয়েছে? তাহলে আসলে কীসের খোঁজে এসেছিল ইডি? নির্দিষ্ট কিছু? বিশেষ কিছু? একটা মহল বলছে, এসআইআরে কোন বুথে কতজন বাদ যেতে পারে, তার সম্পূর্ণ হিসাব আইপ্যাকের কাছে রয়েছে। সেইমতো ভোটের প্ল্যানিংও করেছে তৃণমূল। সেটাই ছিল লক্ষ্য। প্রশ্ন হল কেন? এই পুরো তথ্য তো বিজেপি চাইলে কমিশনের থেকেই পেতে পারে। আর তারা বিভাজনের রাজনীতির অধ্যায় ছাড়া সিলেবাসের আর কিছু পড়ায় না। নাম দেখেই তো যোগ-বিয়োগের অঙ্ক সেরে ফেলতে পারত। তাহলে আইপ্যাকের ঘরে হানা দেওয়ার প্রয়োজন কোথায়? হ্যাঁ, এই বাদের ভিত্তিতে তৃণমূলের প্ল্যানিংটা একটা বিষয় বটে। কিন্তু এত তলিয়ে কি বাংলার জন্য বিজেপি ভাবে? তাহলে ডবল ইঞ্জিন রাজ্যগুলিতে লাগাতার বাঙালি ঠেঙানোর কর্মসূচি তারা নিত না। শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে শীতের রাতে বাঙালিদের পুশব্যাক করত না। এই মুদ্রার উলটো পিঠ হিসাবে একটা ওভার কনফিডেন্স অবশ্য কাজ করতেই পারে। বিজেপি হয়তো ভাবছে, সংগঠন বা ভাবমূর্তির প্রয়োজন নেই। বিভাজন আমরা করে ফেলেছি, কমিশন আমাদের পকেটে, আর আধাসেনায় ভোট হবে। এভাবেই বাজিমাত করে ফেলব। আর প্ল্যানমাফিক যদি এক দফায় করা যায়, তাহলে তো কথাই নেই। বেশি দফায় ভোট হলে তৃণমূল তাদের ভোট মেশিনারি গোটা রাজ্যে ঘোরানোর সুযোগ পায়। এক দফায় হলে সেটা আর পাবে না। কিন্তু দুটো ফ্যাক্টর বিজেপি ভুলে যাচ্ছে—১) ভোট মানুষ দেবে। আর বিভাজন যতই দানা বাঁধুক না কেন, মহিলা ভোটে ভাঙন এখনও গেরুয়া শিবির ধরাতে পারেনি। এমনকি, সংখ্যালঘু ভোটের একাংশও যদি বাবর-হুমায়ুনের নামে দ্বিতীয় বোতামের কথা ভাবে, তাদের ঘরের মহিলারা কিন্তু এখনও ভাবছেন না। ২) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফ্যাক্টর। কোনও কথা তিনি না ভেবে বলেন না। কোনও কাজ তিনি না ভেবে করেন না। তাঁর কোনও একটা বাক্য বা কাজে সমাজের ছোট্ট একটা অংশ তাঁকে ট্রোল করতে পারে, কিন্তু ততক্ষণে তিনি বাকি বড় অংশটাকে কানেক্ট করে ফেলেন। ইডি ইস্যুই দেখে নেওয়া যাক। কয়লা, তদন্ত, টাকা, দুর্নীতি... এসব এখন পিছনের সারিতে চলে গিয়েছে। গোটা দেশে আজ একটাই আলোচনা—বিজেপি সরকারের ইডি অস্ত্রকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী রাজনীতির ময়দানে নামিয়ে এনেছেন। এখানে আর অ্যাডভান্টেজ বিজেপি হচ্ছে না। বরং ইডি এই মুহূর্তে ব্যাকফুটে। আইপ্যাকে হানা দিয়ে কী তথ্য তারা সংগ্রহ করেছে, কী পারেনি... সেসব আপাতত দূরের গ্রহ। পলিটিক্যাল মাইলেজ পুরোটাই খেয়ে নিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এসআইআরের শেষ পর্ব এবং বিধানসভা ভোটের প্রাক পর্বে এটাই একমাত্র ডিভিডেন্ড। তৃণমূল যে মারাত্মক রণকৌশল মেনে রাজনীতি করে না, সেটা তাঁর থেকে ভালো আর কেউ জানে না। কাজেই কোন আসনে কোন কোন প্রার্থীর নাম প্রাথমিকভাবে চিন্তা করা হয়েছে, তা ভোটের আগে অমূলক হয়ে যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইনস্টিংক্টই শেষ কথা। তার উপর ভরসা করে তিনি চুরাশি সালে যুবনেত্রী হিসাবে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়েছিলেন, পায়ের নীচের জমি কতটা শক্ত, তা না ভেবে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল গঠন করেছিলেন এবং কার্যত একাই গদিচ্যুত করেছিলেন সিপিএমকে। এবং প্রত্যেকবার তাঁর ঝুলি থেকে বেরিয়েছে নতুন, অপ্রত্যাশিত কোনও স্ট্র্যাটেজি। তার বিন্দুমাত্র হদিশ দলীয় কর্মী থেকে শীর্ষস্তরের আমলা কারও ছিল না। এখনও থাকে না। ইডির ঘরে পালটা হানা দেওয়াটাও তেমনই কৌশলের অঙ্গ। মামলা হবে? হোক। কিন্তু তাঁকে জেলবন্দি করা বা রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির মতো মিসঅ্যাডভেঞ্চার বিজেপি করবে না। তারা জানে, এই দু’টি পদক্ষেপ নিলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২২৫ পেরিয়ে যাবেন। খুব বেশি হলে তারা কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে দিয়ে শীর্ষ আদালতে মামলা করাবে। তাতে মুখ্যমন্ত্রীকে পার্টিও করবে। ব্যাস। এটুকুই। আর এর মধ্যে কোনও রহস্য নেই। সত্যি বলতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কাউকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন না। ভুল পদক্ষেপও নিচ্ছেন না। পুরোটাই রাজনৈতিক প্ল্যানিং। বাঁচার চেষ্টা নয়, উলটে তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন গেরুয়া শিবিরে—তোমরা বেঁচে দেখাও দেখি এবার! কারণ, পুরো বিষয়টাই এখন পলিটিক্যাল। এসআইআর, এজেন্সি, দুর্নীতি, চাকরি... সব চলে গিয়েছে পিছনের সারিতে। থেকে গিয়েছে শুধু একটাই সমীকরণ—মমতা বনাম কেন্দ্র। আর সিপিএম। তারা এখনও দ্বিতীয় হওয়ার লড়াইয়ের কথাই ভাবছে। বস্তুত এই পার্টির আজও একটাই এজেন্ডা—যেভাবে হোক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাতে হবে। তাতে বামের ভোট যদি রামেও পড়ে, কুছ পরোয়া নেই। অদ্ভুত এক থিয়োরি তাদের, আগে অন্য কেউ তৃণমূলকে সরাক। তারপর আমরা তাদের সরাব। করবেই বা কী? না আছে তাদের মুখ, না প্রচার করার মতো ইস্যু। শ্রীশ্রী সারদা মায়ের একটা ঘটনা মনে পড়ছে। একবার তাঁর এক বৃদ্ধা ভক্ত বেলুড় মঠ ঘুরে মায়ের কাছে এসেছেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হ্যাঁ গো, কী দেখলে ওখানে?’ সেই বৃদ্ধা উত্তর দিলেন, ‘আহা-মা ! কি বলব। বেলুড় মঠে কি বড়ো বড়ো গোরু গো! ওরকম গোরু আমাদের দেশে নেই।’ মা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জিজ্ঞাসা করে গেলেন, তিনি ঠাকুরের ব্যবহার করা জিনিসপত্র দেখেছেন কি না, তরুণ সাধু-সন্তদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন কি না এবং আরও অনেক কিছু। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই হ্যাঁ বলে মাথা নাড়লেন বৃদ্ধা। কিন্তু শেষে বললেন, ‘সবই দেখেছি, কিন্তু ওরকম বড়ো গোরু কোথাও দেখিনি।’ সিপিএমও শুধু ওই বড়ো গোরুতেই আটকে আছে। আরে ভাঙা রেকর্ডের মতো শুধু সেটিং তত্ত্ব আউড়ে গেলে বাংলার মানুষের মন পাওয়া যাবে না। সেটা ৩৪ বছর রাজত্ব করার পরও তারা বুঝল না। বুঝছে না বিজেপিও। বাংলার পালস। বাঙালির পালস। ইডি-সিবিআই, ধর্ম, অনুপ্রবেশ দিয়ে বাংলায় ভোট হয় না। হবেও না। বাংলার মনের সঙ্গে যে কানেক্ট করতে পারে, এই রাজ্য সবসময়ই তার হয়ে এসেছে। কাজেই এখনও কিন্তু অ্যাডভান্টেজ একজনই—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যন্ত্রে কারসাজি না হলে বিজেপিকে লড়তে হবে সেই দু’নম্বর স্পটের জন্যই।