অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: একশো আশি দিনে নিখোঁজ ৪০৮ জন নাবালিকা। অথাৎ, দিনে প্রায় তিনজন কোনও না কোনও কারণে ঘর ছাড়ে। কেউ প্রেমের টানে। কেউ আবার লোভনীয় টোপ গিলে অপহৃত। এই ছ’মাসের আগেও অনেক কিশোরী নিখোঁজ হয়েছিল। নাগাড়ে অভিযানে পুজোর মুখে প্রায় ৩৭৩ জন নাবালিকাকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয় কৃষ্ণনগর জেলা পুলিশ। ‘হারানো’ সন্তানদের ফিরে পেয়ে ‘ঘরে এল উমা’র আনন্দে ভাসছে পরিবারগুলি।
ঘটনা-এক: ২০২৩ সালের ২৮ জুন। কালীগঞ্জ থানার ফরিদপুর গ্রামের এক নাবালিকাকে অপহৃত হয়।তাকে রাজস্থানের জয়পুরে নিয়ে যাওয়া হয়। দীর্ঘ দু’বছর সেখানেই আটকে রাখা হয়েছিল। অভিযুক্ত যুগল ঘোষের কোনও হদিশ মিলছিল না। অবশেষে, গত ২৭ আগস্ট পুলিশ জয়পুরে অভিযান চালিয়ে যুগলকে গ্রেপ্তার করে।উদ্ধার করা হয় নাবালিকাকে।
ঘটনা-দুই: ২০২৪ সালের আগস্ট মাস। নাকাশিপাড়ার এক নাবালিকাসুন্দরবনের বাসিন্দা মফিজুল হালদারের খপ্পরে পড়ে। তাকে তিরুবনন্তপুরমে নিয়ে পালিয়ে যায়। এক বছর খোঁজ মিলছিল না। গত, ২ সেপ্টেম্বর কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার মহিলা বাহিনী তিরুবনন্তপুরমে অভিযান চালিয়ে মফিজুলকে গ্রেপ্তার করে। অপহৃত নাবালিকাকে উদ্ধার করে আনে।
ঘটনা-তিন: ধুবুলিয়ার সিংহাটি এলাকার বাসিন্দা সাজিদ শেখ এক নাবালিকাকে ফাঁসিয়ে কর্ণাটকে নিয়ে পালায়। ১৭ সেপ্টেম্বর ধুবুলিয়া থানার পুলিশ ওই রাজ্যে অভিযান চালিয়ে সাজিদকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি নাবালিকাকে উদ্ধার করে।
উপরের এই তিনটি ঘটনা উদাহরণ মাত্র। পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে এইরকম প্রায় ৩৭৩ জন নাবালিকা ঘরে ফিরল। কাকতালীয় হলেও মর্তে উমার আগমনের সঙ্গে সন্তানদের ঘরে ফিরে আসার কোথাও একটা মিল খুঁজে পাচ্ছের পরিবারের লোকেরা। এক অভিভাবক তো বলেই ফেললেন, ‘যতই হোক নিজের সন্তান তো। ও চলে যাওয়ার পর রাতে ঘুমোতে পারছিলাম না। উৎসবের মুখে সন্তানকে কাছে পেয়ে যেন মনে হচ্ছে, দুর্গা এল ঘরে। পুলিশের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।’কৃষ্ণনগর জেলা পুলিশ অবশ্য এতজন নাবালিকা উদ্ধারে ‘টিম ওয়ার্কে’র উপর বেশি জোর দিয়েছে। তাদেরই দেওয়া পরিসংখ্যান বলছে, গত ছ’মাসে ৩৭৩ জন নাবালিকাকে ঘরে ফেরানো সম্ভব হয়েছে।
জেলা পুলিশের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট—অর্থাৎ ছ’মাসে কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার বিভিন্ন থানায় ৪০৫টি নাবালিকা অপহরণের মামলা নথিভুক্ত হয়। অপহৃত নাবালিকার সংখ্যা ৪০৮ জন। এর মধ্যে এখনও ৩৫ জন নাবালিকার সন্ধান মেলেনি। তাদের খোঁজেও জোর তল্লাশি জারি রয়েছে। কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হেডকোয়ার্টার) মাকওয়ানা মিটকুমার সঞ্জয় কুমার বলছিলেন, ‘নাবালিকা অপহরণের অভিযোগ এলেই থানার তরফে তৎপরতার সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অপহরণকারীদের খুঁজে বের করার পাশাপাশি উদ্ধার কাজে আমরা বিশেষ নজর দিচ্ছি। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেতাতে স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক প্রচারও চালানো হচ্ছে।’
পুলিস সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ৬ মাসে কালিগঞ্জ থানায় অপহৃত ৩৭ জন নাবালিকার মধ্যে ৩৬ জনকে, নাকাশিপাড়া থানার ৫৪ জন অপহৃত নাবালিকার মধ্যে ৫৩ জনকে, ধুবুলিয়া থানার ১৯ জন অপহৃত নাবালিকার মধ্যে ১৯ জনকে, ভীমপুর থানার ১৮ জন অপহৃত নাবালিকার মধ্যে ১৭ জনকে এবংকৃষ্ণগঞ্জ থানার ১৬ জন অপহৃত নাবালিকার মধ্যে ১৬ জনকেই উদ্ধার করা গিয়েছে।
ওরা সকলেই যেন ‘ঘরের উমা’। ফিরল বাপের আলোয়।