বছর দেড়েক আগে মোদি সরকারের নীতি আয়োগ বলেছিল, দেশে আর্থিক অসাম্য উদ্বেগের কারণ। রাষ্ট্রসংঘ যে সুস্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে, তার সূচক অনুযায়ী অসাম্যের মাপকাঠিতে ভারতের মান ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। ২০১৮-তে ভারতের স্কোর ছিল ১০০ তে ৭১। ২০২০-২১-এ ৬৭, ২০২৩-২৪-এ তা আরও কমে হয়েছে ৬৫। অসাম্য শুধু ধনী-গরিবের মধ্যে নয়, নারী-পুরুষের বৈষম্যও এর মধ্যে রয়েছে। এ প্রসঙ্গে চলতি বছরের জুলাই মাসে মোদি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী নীতিন গাদকারি আরও একধাপ এগিয়ে বলেন, দেশে গরিবের সংখ্যা বাড়ছে। সম্পদ মুষ্টিমেয় কিছু ধনী ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। এটা হওয়া উচিত নয়। সম্পদের বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজন আছে এবং সেজন্য অনেক পরিবর্তন করতে হবে। স্বামী বিবেকানন্দকে উদ্ধৃত করে সেদিন তিনি মন্তব্য করেন, ‘খালি পেটে ধর্ম হয় না।’ এই একই সুর শোনা গিয়েছে প্যারিস স্কুল অব ইকনমিক্সের প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাব’-এ গবেষণারত প্রথম সারির অর্থনীতিবিদদের বক্তব্যে। তাঁদের মতে, ব্রিটিশ জমানার থেকেও এখন ভারতে আর্থিক অসাম্য বেশি। একদল আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদের মতে আবার, ভারতে এখন আধুনিক বুর্জোয়া শ্রেণির নেতৃত্বে ‘ধনকুবেরদের রাজত্ব’ চলছে। এর ফলে ধীরে ধীরে ভারতে ‘ধনিকতন্ত্র’ বা ‘প্লুটোক্রেসি’ কায়েম হতে পারে।
এই প্রেক্ষিতে ‘ইনইকুয়ালিটি ল্যাব’ তাদের ২০২৬-এর রিপোর্টে জানিয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের দেশগুলির মধ্যে ভারত অন্যতম। মোদি জমানায় পরিস্থিতির কোনও উন্নতির বদলে অবনতি হয়েছে। ২০১৪-২৪— এই দশ বছরে দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ ও সবচেয়ে গরিব ৫০ শতাংশ মানুষের আয়ের বৈষম্যে কোনও উন্নতি দেখা যায়নি। রিপোর্ট বলছে, ভারতের শীর্ষ ১ শতাংশ ধনকুবেরের বার্ষিক গড় আয় ১ কোটি ৪৯ লক্ষ টাকা, উচ্চবিত্ত ১০ শতাংশের ৩৮ লক্ষ, মধ্যবিত্ত ৪০ শতাংশের ৪ লক্ষ ৪৯ হাজার এবং নিম্নবিত্ত ৫০ শতাংশের গড় বার্ষিক আয় ৯৯ হাজার ৫৯৬ টাকা। একইভাবে গড় মালিকানাধীন সম্পদের মাথাপিছু পরিমাণ যথাক্রমে ১১ কোটি ৯৫ লক্ষ টাকা, ১ কোটি ৯৩ লক্ষ টাকা, ২১ লক্ষ ৩১ হাজার টাকা এবং ১ লক্ষ ৯০ হাজার টাকা। তথ্য আরও বলছে, এদেশে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের উপার্জন জাতীয় আয়ের ৫৮ শতাংশ। অথচ সবচেয়ে গরিব ৫০ শতাংশের উপার্জন জাতীয় আয়ের মাত্র ১৫ শতাংশ। সম্পদের ক্ষেত্রে এই বৈষম্য আরও প্রকট। দেখা যাচ্ছে, ধনী ১০ শতাংশ মানুষ দেশের মোট সম্পদের ৬৫ শতাংশের মালিক। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ সম্পদই রয়েছে মাত্র ১ শতাংশের হাতে। সব মিলিয়ে ২০২৪-এ ভারতের বৈষম্য সূচক ৩৮.২ ইউনিট, যা উদ্বেগজনক। অন্যদিকে নারীশক্তির জয়গান গাওয়া মোদির ভারতে শ্রমশক্তিতে মহিলাদের অংশগ্রহণ উদ্বেগজনক কম, মাত্র ১৫.৭ শতাংশ।
এটাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উবাচ ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’-এর আসল ছবি। মোদি জমানায় উন্নয়ন বোঝাতে শাসকগোষ্ঠী বিপুল জনসংখ্যার কারণে তৈরি জিডিপির পরিমাণ ও বৃদ্ধির হারের তথ্য পেশ করে বাহবা নেওয়ার চেষ্টা করে। উন্নয়ন বোঝাতে কোটিপতির সংখ্যা কত বাড়ল, সেই পরিসংখ্যান দেয়। কিন্তু নীতি আয়োগ থেকে আন্তর্জাতিক সংগঠনের দেওয়া তথ্য বলে দিচ্ছে, অসাম্যের ভিতের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে ভারতের উন্নয়ন। অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন, মোদি জমানায় অসাম্য রকেট গতিতে বেড়েছে। কারণ এই জমানায় মূলধন বা পুঁজি থেকে আয় বড়ো ভূমিকা নিয়েছে। নীচের সারির ৫০ শতাংশ ও মাঝের সারির ৪০ শতাংশ মানুষ অবদমিত থেকে গিয়েছেন। সরকার ‘সকলে’র বদলে ‘এলিট’ সমাজের দিকে নজর দিয়েছে। পাশাপাশি ভারতের কর ব্যবস্থাও সাধারণের উপর বেশি করের বোঝা চাপিয়ে অসাম্য বাড়িয়ে তুলেছে। আসলে মোদি সরকারের আর্থিক নীতি প্রথম থেকেই ঘনিষ্ঠ শিল্পপতিদের আয় ও সম্পদ বৃদ্ধির কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে। এর মূলে রয়েছে সেই বিনিময় সূত্র। একদিকে নির্বাচনী তহবিল সহ নানা পথে শাসকগোষ্ঠীকে ‘খুশি’ করছে নানা কর্পোরেট সংস্থা। অন্যদিকে, বিনিময়ে লুটের ছাড়পত্র মিলছে। এই সীমাহীন লুট বাড়িয়ে তুলছে তাদের আয়-সম্পদ, যার পরিণতিতে আর্থিক বৈষম্য লাগাম ছাড়াচ্ছে। এই যজ্ঞে প্রধান পুরোহিত স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সরকার। সুতরাং ক্ষমতায় মোদির দল থাকলে অসাম্য কমবে— এ হতেই পারে না। শুধু বছর বছর এই তথ্যই সামনে আসবে, দেশের গরিব মধ্যবিত্ত আরও কতটা তলিয়ে গেল। যদিও ‘আচ্ছে দিনের’ স্বপ্ন দেখানো মোদি সরকারের তা নিয়ে আদৌ মাথাব্যথা নেই।