সংবাদদাতা, বোলপুর: শান্তিনিকেতনের বেহাল পিয়ারসন মেমোরিয়াল হাসপাতালের হাল ফেরাতে উদ্যোগ নিলেন বিশ্বভারতীর নতুন উপাচার্য ডঃ প্রবীরকুমার ঘোষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব এই হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরেই অপ্রতুল ডাক্তার। নার্সের সংখ্যাও হাতে গোনা। ন্যূনতম চিকিৎসা ব্যবস্থা দিয়েই কোনওরকম কাজ চালানো হচ্ছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে। কোটি টাকা খরচে নির্মিত হলেও নতুন ভবনটি পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। এই বিষয়গুলো জানতে পেরেই নতুন উপাচার্য তৎপর হন। যোগদানের পরপরই তিনি হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। এরপর সেখানে ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্য কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেন। নতুন বিল্ডিং চালু করার পাশাপাশি, শূন্যপদে নিয়োগ ও অন্যান্য সমস্যাগুলি দ্রুত মেটাতে হাসপাতাল ও কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। উপাচার্যের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বিশ্বভারতীর পড়ুয়া, কর্মী ও অধ্যাপকরা। শীঘ্রই গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালটিতে পরিষেবা আগের মতোই হবে বলে তাঁরা আশাবাদী।
বিশ্বভারতীর ইতিহাস সূত্রে জানা গিয়েছে, উইলিয়াম উইনস্ট্যানলি পিয়ারসন ছিলেন বিশিষ্ট রবীন্দ্র অনুরাগী। কবিগুরুর বেশ কিছু রচনা ইংরেজিতে অনুবাদ করেন পিয়ারসন। ১৯১৬ সালে তিনি রবীন্দ্রনাথের সচিব হন। পরে জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকবির যাত্রায় সঙ্গীও হন। ১৯২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ইতালির মিলান থেকে ফ্লোরেন্স যাওয়ার পথে ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনায় পিয়ারসনের অকালমৃত্যু হয়। তাঁর স্মৃতিতেই ১৯২৭ সালে শান্তিনিকেতনে গড়ে ওঠে পিয়ারসন মেমোরিয়াল হাসপাতাল। এই হাসপাতালে তৈরিতে আরেক রবীন্দ্র অনুরাগী চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুজের বিশেষ অবদান ছিল। শতবর্ষ থেকে মাত্র দুই বছর দূরে এই ঐতিহাসিক হাসপাতাল। অথচ প্রাক্তন উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর আমল থেকে এই হাসপাতালের বেহাল অবস্থা। ২০০২ সালে শেষ ডাক্তার নিয়োগ করা হয়। তখন মোট ১৬ জন ডাক্তার ছিলেন। নার্স ও অন্যান্য ফার্মাসিস্ট শেষ নিয়োগ হয় ২০১২ সালে। কিন্তু অবসরের কারণে বর্তমানে ডাক্তারের সংখ্যা মাত্র ছয়জন। ১৪ নার্স ও অ্যাসিস্ট্যান্ট মেট্রন থাকার কথা। কিন্তু রয়েছেন মাত্র সাতজন। স্থায়ী প্যাথলজি টেকনিশিয়ান, ইসিজি টেকনিশিয়ান ও ড্রেসার নেই। অস্থায়ীদের দিয়ে কাজ চলছে। সাতজন ফার্মাসিস্ট থাকার কথা, অথচ মাত্র একজন কাজ চালাচ্ছেন। এই করুণ অবস্থার জন্য তিনটে শিফটে দায়িত্বভার বণ্টন করতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
পাশাপাশি, ওই ক্যাম্পাসেই ২০০৮ সালে সুপারস্পেশালিটি পরিকাঠামোর হাসপাতাল বানানোর পরিকল্পনা নেয় বিশ্বভারতী। ২০১০ সালে কাজ শুরু হয়। প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে সেই হাসপাতালে ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০১৯ সালে। সেখানে কার্ডিওলজি, আইসিইউ, ট্রমাটোলজি বিভাগ খোলার ভাবনা নিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু প্রাক্তন উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তী তাতে আমল দেননি বলে কর্তৃপক্ষের অভিযোগ। সেজন্য অব্যবহৃত নতুন ভবনটি পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। উপাচার্য পদে বসার পর সেই বিষয়টি প্রবীরবাবু জানতে পারেন। তার প্রেক্ষিতে গত শুক্রবার তিনি ওই হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। ডাক্তার ও আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করে দ্রুত সমস্যা মেটানোর নির্দেশ দেন। এছাড়া তিনি শূন্যপদ পূরণের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে।
পিয়ারসন মেমোরিয়াল হাসপাতালের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক শশাঙ্কশেখর দেবনাথ বলেন, ইতিবাচক বৈঠক হয়েছে। নতুন উপাচার্য হাসপাতালের হাল ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়ায় আমরা খুশি।