ব্রতীন দাস, মালদহ: অভাবের তাড়নায় দেড় বছরের শিশুপুত্রকে ভরা তিস্তায় ছুড়ে দিয়েছিলেন মা! দেখামাত্র জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল নদীতে ঝাঁপিয়ে ওই শিশুকে উদ্ধার করে জলপাইগুড়ির দুই কিশোরী। বেঁচে যায় শিশুটি। গত জুন মাসে ওই ঘটনায় অসম সাহসিকতার জন্য রাজ্যের তরফে ‘বীরাঙ্গনা’ পুরস্কারে সম্মানিত করা হচ্ছে মল্লিকা পাল ও পৌলমী কীর্তনীয়াকে। আজ, বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক শিশু সুরক্ষা দিবসে মিশন ফর প্রোটেকশন অব চাইল্ড রাইটসের পক্ষ থেকে মালদহের দুর্গাকিঙ্কর সদনে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে ওই সম্মান। এর আগে গত ১৪ আগস্ট কন্যাশ্রী দিবসে কলকাতায় রাজ্যের তরফে সম্মান জানানো হয় এই দুই স্কুলছাত্রীকে।
পৌলমী ও মল্লিকার বাড়ি জলপাইগুড়ির দোমোহনি তিস্তা সেতু সংলগ্ন মরিচবাড়ি এলাকায়। দু’জনেই দোমোহনি পলহয়েল উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী। পৌলমীর বাবা গৌতম কীর্তনীয়া কৃষি শ্রমিক। মল্লিকার বাবা সুফল পাল টোটো চালান। মেয়েদের জন্য গর্বিত দু’জনেই। বললেন, ‘মেয়েরা বীরাঙ্গনা সম্মান পাচ্ছে, এতে তো বাবা হিসেবে গর্ব হচ্ছেই। কিন্তু তার চেয়েও বেশি আনন্দ হয়েছিল সেদিন, যেদিন ওরা তিস্তায় ঝাঁপ দিয়ে একরত্তি শিশুটাকে বাঁচাতে পেরেছিল।’
জলপাইগুড়ি জেলা শিশু সুরক্ষা আধিকারিক সুদীপ ভদ্র বলেন, ‘পৌলমী ও মল্লিকা আমাদের জেলার গর্ব। ওরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিশুটিকে বাঁচিয়েছিল। শুধু নিজেদের পাড়া কিংবা স্কুল বা জেলায় নয়, ওই দুই কিশোরী রাজ্যের গর্ব। আন্তর্জাতিক শিশু সুরক্ষা দিবসে ওরা বীরাঙ্গনা সম্মান পাচ্ছে, এটা সত্যিই খুব আনন্দের।’
সেদিন ঠিক কী হয়েছিল? মল্লিকা বলে, ‘আমি ও পৌলমী তিস্তার পাড়ে বসে গল্প করছিলাম। আচমকা নদীতে ঝপাৎ করে কিছু একটা পড়ার শব্দ শুনি। ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখি, এক মহিলা কিছু একটা ছুড়ে হনহন করে চলে যাচ্ছেন। বিষয়টি বুঝে ওঠার আগেই শিশুর কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। এক মুহূর্ত দেরি না করে ছুটে যাই। নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিশুটিকে উদ্ধার করি।’ পৌলমীর কথায়, ‘তখন ভরা তিস্তা। আমাদেরও বিপদ হতে পারত। কিন্তু সেই মুহূর্তে নিজেদের কথা না ভেবে শিশুটিকে উদ্ধার করাই লক্ষ্য ছিল। একটু দেরি হলে শিশুটিকে হয়তো বাঁচানো সম্ভব হত না।’
ঘটনাটি ঘটে গত ৬ জুন। তিস্তার পাড়েই বাস দিনমজুর দম্পতির। একে তো সংসারে অভাব। তার উপর দু’টি সন্তান। ফলে মাঝেমধ্যে অশান্তি লেগে থাকত। এর জেরে দেড় বছরের শিশুপুত্রকে তিস্তা নদীতে ফেলে দেওয়ার মতো চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন মা। পরে অবশ্য ভুল বুঝতে পেরে অনুতাপ করেন তিনি। ঘটনার পরই ওই পরিবারের পাশে দাঁড়ায় জেলা প্রশাসন। নানাভাবে সাহায্য করা হয় তাঁদের। পাশাপাশি, পরিবারের শিশু দু’টির যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, সেব্যাপারে নজর দেওয়া হয় জেলা শিশু সুরক্ষা কমিটির তরফে। পৌলমী কীর্তনীয়া ও মল্লিকা পাল।-নিজস্ব চিত্র