Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

প্যাটেলনামা

আবার এই সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলই গান্ধী-হত্যার পর নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন আরএসএসকে।

প্যাটেলনামা
  • ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

অনিরুদ্ধ সরকার: ‘আধুনিক ভারতের স্থপতি’! কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর পাঁচশোরও বেশি ছোটো বড়ো দেশীয় রাজা-মহারাজা-নিজামের রাজ্যকে ভারত সরকারের অধীনে আনতে, ঐক্যবদ্ধ দেশ গঠনে তাঁর ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। তিনি ‘লৌহপুরুষ’ বল্লভভাই প্যাটেল, যিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হলে হয়তো দেশের ইতিহাস অন্য খাতে বইত। বারদোলিতে সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সময় স্থানীয় গুজরাতি মহিলারা তাঁকে ‘সর্দার’ উপাধি দেন। রাজনীতি নয়, প্রাচীন ভারতের ঐতিহ্য এবং হৃতগৌরব ফিরিয়ে আনতে সোমনাথ মন্দির সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আবার এই সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলই গান্ধী-হত্যার পর নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন আরএসএসকে। পরে কিছু শর্তের বিনিময়ে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন।

Advertisement


১৯৪০ সাল। রামগড়ে কংগ্রেসের অধিবেশন চলছিল। সেখানে মৌলানা আজাদ জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভারত ছাড়ো আন্দোলন এবং বেশিরভাগ কংগ্রেস নেতা কারাগারে থাকার কারণে ১৯৪৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন তিনিই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ভারতের স্বাধীনতা অর্থাৎ ‘ক্ষমতার হস্তান্তর’ আর খুব বেশি দূরে নয়। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস ভালো ফল করায় এটাও স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, কংগ্রেসের সভাপতিই হবেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী।


এই পরিস্থিতিতে ঘোষণা হয় কংগ্রেস সভাপতি পদের নির্বাচন। মৌলানা আজাদ পুনরায় মনোনয়ন পেশের ইচ্ছাপ্রকাশ করলেও গান্ধীজি অনুমতি দিলেন না। ফলে দিল্লির রাজনীতি বেশ জটিল হয়ে ওঠে।
২৯ এপ্রিল, ১৯৪৬। কংগ্রেস সভাপতি পদে মনোনয়নের শেষ দিন। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, গান্ধীজি নিজের পছন্দ হিসেবে একমাত্র জওহরলাল নেহরুর নাম প্রস্তাব করেন। কিন্তু তারপরেও ১৫টি প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির মধ্যে ১২টিই মনোনীত করে সর্দার প্যাটেলকে। বাকি তিনটি কমিটি মনোনয়ন প্রক্রিয়া থেকে বিরত ছিল। গান্ধীজি তখন তাঁকে স্পষ্টভাবে বলেন, ‘ওয়ার্কিং কমিটির কয়েকজন সদস্য ছাড়া কোনও প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি তোমার নাম প্রস্তাব করেনি।’ উত্তরে জওহরলাল ‘সম্পূর্ণ নীরব’ থাকেন আর গান্ধীজি...? প্যাটেলকে নাম প্রত্যাহার করার জন্য রাজি করান। 
কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জে বি কৃপালানি লিখছেন, ‘গান্ধীজি প্রদেশগুলির প্রস্তাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন, কারণ ১৯৪৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ইঙ্গিত অনুসারে ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত ছিল এবং গান্ধীজি যে কোনও মূল্যে নেহরুকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। গান্ধীজির অস্থিরতার কারণে, প্যাটেলের বিপুল সমর্থন থাকা সত্ত্বেও, তিনি বাস মিস করেছিলেন।’ ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ দুঃখপ্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আরও একবার গান্ধীজি তাঁর আস্থাভাজন সেনানীকে বিসর্জন দিলেন ‘গ্ল্যামারাস নেহরু’-র জন্য।’ জওহরলালের পিতা মতিলাল নেহরু ছিলেন গান্ধীজির ঘনিষ্ঠ এবং বিশেষ আস্থাভাজন। নেহরুর জন্য সর্দার প্যাটেলকে আরও দু’বার ‘পদ’ থেকে থেকে বঞ্চিত করেছিলেন তিনি। ১৯২৯ এবং ১৯৩৭ সালে। মূলত এ কারণেই রাজেন্দ্র প্রসাদের ‘আরও একবার’ শব্দযুগল ব্যবহার। 
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেহরুর প্রতি গান্ধীজির চিরন্তন মুগ্ধতার কারণ তাঁর আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি। তুলনায় প্যাটেল ছিলেন কিছুটা সনাতন ও গোঁড়াপন্থী। গান্ধীজি ভাবতেন, ভারতের মতো দেশের বিকাশের নেতৃত্বে নেহরুর মত একজন আধুনিকমনস্ক ব্যক্তিকেই প্রয়োজন। তাছাড়া তিনি একথা জানতেন যে, সর্দার প্যাটেল কখনও তাঁর অবাধ্য হবেন না, বা তাঁর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়াবেন না। কিন্তু নেহরু তেমনটা নন। আর জওহরলাল যখন সরাসরি বলে দিলেন যে, ‘কারও অধীনস্থ থাকতে পারব না’। তখন গান্ধীজি আশঙ্কা করলেন, নেহরু বিদ্রোহী হয়ে উঠলে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ ক্ষতি হবে, যা সেই মুহূর্তে দেশের জন্য ক্ষতিকর। 


নেহরু ও প্যাটেল উভয়কেই ভারতের নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে দেখতে চাইতেন মহাত্মা। তাই তার মনে হয়েছিল, প্রথমজনকে প্রধানমন্ত্রী হতে দিলেই বোধহয় সব দিক থেকে মঙ্গল। কেননা একবার যদি তিনি বেঁকে বসেন তাহলে কংগ্রেসে ভাঙন অবশ্যম্ভাবী। আর তা দেখে ব্রিটিশরাও ভারতকে ক্ষমতা হস্তান্তর করার ক্ষেত্রে বেঁকে বসত। গান্ধীজি ভেবেছিলেন, একজন নবীন প্রজন্মের প্রধানমন্ত্রীকে সাহায্য করবে প্রবীণ অভিজ্ঞ এক রাজনীতিক প্যাটেল। নতুন ভারত, বিকশিত ভারত তৈরি হবে! 
সর্দার প্যাটেল সম্ভবত তিনটি কারণে দ্বিতীয় স্থান গ্রহণ করতে রাজি হন। প্রথমত, গান্ধীজির প্রতি শ্রদ্ধা। দ্বিতীয়ত, পদের কোনও লোভ ছিল না তাঁর।  তৃতীয়ত, নেহরু যদি বিরোধী হয়ে যায়, তাহলে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া আরও পিছিয়ে যাবে। নেহরুর জীবনীকার মাইকেল ব্রেচার লিখেছেন—‘প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটিগুলির মধ্যে প্যাটেল ছিলেন সর্বাধিক পছন্দের। নেহরুর ‘নির্বাচন’ গান্ধীর হস্তক্ষেপের কারণে হয়েছিল। যদি গান্ধী হস্তক্ষেপ না করতেন, তাহলে প্যাটেল ১৯৪৬-৪৭ সালে কার্যত ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হতেন।’
মৌলানা আবুল কালাম প্রথমদিকে নেহরুপন্থী থাকলেও পরে নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল ছিল সর্দার প্যাটেলকে সমর্থন না করা। তিনি কখনও জওহরলালের মতো ভুল করতেন না। এখন ভাবি যে এই ভুলগুলি যদি না করতাম, তাহলে সম্ভবত গত দশ বছরের ইতিহাস অন্যরকম হত। এর জন্য আমি নিজেকে কখনও ক্ষমা করতে পারি না।’ চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী সঙ্গে প্যাটেলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল ঠিকই। কিন্তু বল্লভভাইয়ের মৃত্যুর প্রায় ২২ বছর পর ‘ভবনস জার্নালে’ তিনি লিখছেন, ‘নিঃসন্দেহে নেহরুকে বিদেশমন্ত্রী হতে বলা হলে এবং প্যাটেলকে প্রধানমন্ত্রী করা হলে ভালো হত। আমিও এই ভুলের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম যে, জওহরলাল দু’জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোকিত ব্যক্তি। এটি একেবারেই একটি ভুল ধারণা ছিল।’ 
১৯৪৮ সালে হত্যা করা হল মহাত্মা গান্ধীকে। সর্দার প্যাটেল তখন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। গান্ধী-হত্যার প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ(আরএসএস) নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন তিনি। এমনকি এও লেখেন, ‘ওদের (আরএসএস) সমস্ত বক্তৃতা সাম্প্রদায়িক বিষে ভরা ছিল। বিষের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে, দেশকে গান্ধীজির অমূল্য জীবনের বলিদান ভোগ করতে হয়েছিল।’
মৃত্যুর আগে শেষবার বল্লভভাইয়ের সঙ্গেই কথা বলেছিলেন গান্ধীজি। প্রার্থনা সভায় বাপুকে হত্যার পর আরএসএসের লোকেরা আনন্দ প্রকাশ এবং মিষ্টি বিতরণ করলে প্যাটেল রেগে যান এবং কড়া সিদ্ধান্ত নেন। সেবছরই ১৮ জুলাই হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে চিঠি লিখে অভিযোগ তোলেন, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে আরএসএস।
১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরে সংঘপ্রমুখ এমএস গোলওয়ালকরকে একটি চিঠি দেন প্যাটেল। তিনি লেখেন, ‘হিন্দুদের সংগঠিত করা এবং তাদের সাহায্য করা এক জিনিস। কিন্তু নিরীহ ও অসহায় পুরুষ, মহিলা এবং শিশুদের উপর তাদের দুর্দশার প্রতিশোধ নেওয়া একেবারেই অন্য জিনিস।’ আরএসএসের বক্তব্য অনুযায়ী, নেহরুর চাপে পড়ে প্যাটেল এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ঐতিহাসিকদের মতে কিন্তু  তা একেবারেই নয়। উলটে প্যাটেলের শর্ত মেনে ‘ভারতের সংবিধান’ এবং ‘জাতীয় পতাকা’র প্রতি অনুগত থাকার প্রতিশ্রুতি দেয় আরএসএস। এরপরই ১৯৪৯ এর ১১ জুলাই, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় সরকার। 
সেপ্টেম্বর, ১৯৫০। কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচনে মুখোমুখি হন জে বি কৃপালানি এবং পি ডি ট্যান্ডন। প্রথম জন নেহরু ঘনিষ্ঠ এবং অন্যজন প্যাটেলের সমর্থিত। ফলাফলে দেখা গেল, ট্যান্ডন পেয়েছেন ১৩০৬ ভোট। আর কৃপালানি ১০৯২ ভোট। নেহরুর প্রার্থী পরাজিত।  সেবছরই ১৫ ডিসেম্বর বোম্বেতে হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হন বল্লভভাই প্যাটেল। হাজার বিরোধকে দূরে সরিয়ে নেহরু হাজির ছিলেন শেষকৃত্যে। দেশজুড়ে সাতদিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হয়। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় ‘প্যাটেল লবি’ ধীরেধীরে নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে। তাঁর অনুগত ট্যান্ডনকেও বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হতে হয়। টানাপোড়েনের জেরে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ১৯৫১ সালের অক্টোবরে কংগ্রেসের সভাপতি হন নেহরু। প্রধানমন্ত্রী ও কংগ্রেস সভাপতি দু’টি পদই তাঁর দখলে চলে যায়, যা গান্ধীজি কখনও চাননি। ১৯৫২ সালের সাধারণ নির্বাচনে নেহরু পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে ফিরে আসেন। আর বাদ দিয়ে দেন প্যাটেলপন্থীদের। সমাপ্তি হয় ‘প্যাটেল যুগে’র।
অনেক বিশেষজ্ঞ আজও মনে করেন, সর্দার প্যাটেল ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হলে অনেক কিছু পালটে যেত। হয়তো ১৯৬২ সালে চীন যুদ্ধে চরম লজ্জার সম্মুখীন হতেও হত না দেশকে। মৃত্যুর কয়েকদিন আগেও প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে চীনের ব্যাপারে সাবধান করেছিলেন তিনি। কিন্তু কর্ণপাত করেননি নেহরু।
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : উজ্জ্বল দাস

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ