সুমন তেওয়ারি, দুর্গাপুর: দুর্গাপুরের ওই বেসরকারি মেডিকেল কলেজে মূলত পড়তে আসেন আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারের ছেলেমেয়েরা। তাঁদের অসংযমী জীবন-যাপনই এলাকায় দুষ্কৃতী কার্যকলাপ বৃদ্ধির সহায়ক হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। রাত-বিরেতে বান্ধবীদের নিয়ে জঙ্গলে যাওয়া, সেখানে ঘনিষ্ঠ হওয়া, মাদক সেবন—এসবই দুষ্কৃতীদের বাড়তি উপার্জনের পথ খুলে দিয়েছে বলে তাঁদের মত।
বেশ কয়েক বছর আগে দুর্গাপুর পুরসভার শোভাপুরে গড়ে ওঠে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালটি। বিজড়া, শোভাপুর এলাকার বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়। রাজ্যের পাশাপাশি ভিনরাজ্যের পড়ুয়ারা এখানে পড়তে আসেন। অভিযোগ, তাঁদের একটা বড় অংশ প্রিয়জনের সঙ্গে নির্জন স্থানে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ খোঁজেন। সেই মতো তাঁরা চলে যান পরাণগঞ্জ জঙ্গলের নিভৃত স্থানে। সেখানে ওঁত পেতে থাকে এলাকার দুষ্কৃতীরা। অন্তরঙ্গ হতে দেখলেই ব্ল্যাকমেল শুরু করে। ভয় দেখিয়ে দামি মোবাইল, ঘড়ি ছিনতাই করে। টাকা আদায় করে। এতে তাদের বেশ ভালোই রোজগার হয়। কখনও কখনও বাড়তি টাকা দিলে ফেরত দিয়ে দেওয়া হয় মোবাইল। এমন অপকর্ম বহুদিন ধরেই চলছে বলে স্থানীয়দের দাবি। প্রকাশ্যে এল ডাক্তারি পড়ুয়ার নির্যাতন কাণ্ডের পর।
ইতিমধ্যেই ডাক্তারি পড়ুয়াকে ধর্ষণের অভিযোগ পুলিশ বিজড়া গ্রামের পাঁচ দুষ্কৃতীকে গ্রেফতার করেছে। অভিযোগ, তারা প্রথমে মহিলা ও তাঁর পুরুষ বন্ধুর টাকা ছিনতাই করে। তারপরই ছাত্রীর উপর নির্যাতন চালায়। এলাকা সূত্রে খবর, মহিলা নির্যাতনের বিষয়টি আগে না ঘটলেও ছিনতাই কিংবা ব্ল্যাকমেলের ঘটনায় এখানে হামেশাই ঘটে। এমনও জানা গিয়েছে, এই গ্যাংটিই একাধিক ছিনতাই করেছে। কিন্তু, ডাক্তারি পড়ুয়ারা নিজেদের কুকর্ম ঢাকতে পুলিশের কাছে কোনওদিন অভিযোগ করেননি। তাতে দুষ্কৃতীরা আরও বেশি করে বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
মেডিকেল কলেজের একেবারে পাশে পরানগঞ্জ জঙ্গল। যেখানে গণধর্ষণের ঘটনাটি ঘটেছে বলে জানা গিয়েছে। জঙ্গলের একটা নিভৃত স্থানকে ফূর্তির জন্য বেছে নেন ধনী পরিবারের যুবক-যুবতীরা। এইরকম আরও একটি ‘বৃন্দবন’-এর হদিশ দিয়েছেন স্থানীয় লোকজনই। তাঁরা জানিয়েছেন বহু বছর আগে বিজড়ায় একটি রানওয়ে বানানো হয়েছিল। কিন্তু, সেখানে বিমান ওঠানামা কস্মিনকালেও করেনি। ফলে, বহু দশক সেটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে রানওয়ে। তাকে ঘিরে রয়েছে গাছগাছালি। এককথায় নির্জন ও মনোরম পরিবেশ। সেখানেও একান্তে সময় কাটাতে চলে আসেন বহু মেডিকেল পড়ুয়া। ঘনিষ্ঠ হন নিজেদের মধ্যে। সেই মুহূর্তের ছবি তুলে নেয় আড়ালে লুকিয়ে থাকা দুষ্কৃতীরা। পরে তারা হাজির হয়ে সেই ছবি দেখিয়ে টাকা দাবি করে। সেটা না দিলে ভিডিও কিংবা ছবি ভাইরাল করে দেওয়ার হুমকি দেয়। অগত্যা বান্ধবীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার খেসারত হিসেবে খসাতে হয় মোটা টাকা।
কয়েক বছর ধরেই এই অপকর্ম নিয়ে স্থানীয়রা বীতশ্রদ্ধ। কিন্তু, দুষ্কৃতীদের মাথার উপর কিছু প্রভাবশালী নেতার হাত থাকায় কেউ প্রতিবাদ করেন না। এলাকাটি দুর্গাপুর থানার বিজোন ফাঁড়ি এলাকার। ওই ফাঁড়ির কাছে নিউটাউনের এক নেতার অনুগামী এই দুষ্কৃতীরা। তারা বিপাকে পড়লে সেই দাদাই নাকি সব সামলে দেন। তাই দিনের পর দিন ব্ল্যাকমেল করে পড়ুয়াদের কাছে হাজার হাজার টাকা লুট করা হলেও পার পেয়ে যায় দুষ্কৃতীরা। পুলিশেও অভিযোগ জমা পড়ে না।
এদিন ওই মেডিকেল কলেজে এসেছিলেন কলকাতা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক সুজয়া মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়েও এই মেডিকেল কলেজে পড়ে। ও তো কোনওদিন আমাদের নিরাপত্তাহীনতার কথা বলেনি। আমি কী করে বলব রাজ্যে কোন নিরাপত্তা নেই। রাতের অন্ধকারে পড়ুয়াদের নির্জন স্থানে যাওয়া কী খুব প্রয়োজন?’ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুরে প্রশ্ন তুলেছেন সুজয়াদেবীও।