১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের শর্তই ছিল ভারতভাগ। দেশভাগের ভিত্তি ছিল ধর্ম। অখণ্ড ভারতবর্ষে সংখ্যাগুরু হিন্দুর অধীনতার ভয় দেখিয়েছিলেন কিছু মুসলিম রাজনীতির কারবারি। তাঁরা এই প্রচার করেছিলেন যে, ইংরেজ ভারত ছেড়ে গেলেও এই উপমহাদেশের মুসলমান জনগণ কোনোভাবেই ‘স্বাধীন’ হবেন না। তাঁরা অধীন হয়ে পড়বেন সংখ্যাগুরু হিন্দুর, অর্থাৎ ‘নতুনভাবে পরাধীন’ হবেন মুসলমান ভারতবাসীরা। তাই ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ আওয়াজ তুলেছিলেন মহম্মদ আলি জিন্না অ্যান্ড কোং। জিন্নাদের দাবি মতোই ভারত তিন টুকরো হয়েছিল। পশ্চিম এবং পূর্ব—দুই প্রান্তের দুটি পৃথক ভূমিভাগ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল ইসলামিক রিপাবলিক অফ পাকিস্তান। জিন্না সাহেবের সাধের মুসলিম রাষ্ট্রের আয়ু সিকি শতকও পেরোয়নি। তার আগেই পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীনতা ঘোষণা করল। স্বাধীন রাষ্ট্র নাম গ্রহণ করল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলনের ভিত্তি ছিল ভাষা—বাংলা ভাষা এবং বাঙালি জাতিসত্তা। সোজা কথায়, রাষ্ট্রগঠনে ধর্মের ভিত্তি, ইসলাম রক্ষার জিগির প্রভৃতি ভুল প্রমাণ করল ব্যর্থ পাকিস্তান। তবে কোনও শান্তির পথে পাকিস্তানের জল্লাদ বাহিনীকে দমানো যায়নি। তারা পূর্ব বাংলার ৩০ লক্ষ মানুষের প্রাণ এবং অসংখ্য নারীর ইজ্জত নিয়েছিল।
নিরীহ প্রতিবেশীর মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্ব এড়াতে পারেনি ভারত। ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে আপামর ভারতবাসী বাঙালি বীরযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। তাঁদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলেন ভারতীয় সেনারা। শেষমেশ পর্যুদস্ত হয় পাকিস্তান। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতের ইস্টার্ন কমান্ড চিফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করেন পূর্ব পাকিস্তানের সেনা কমান্ডার এএকে নিয়াজি। ভারতীয় সেনার কাছে নিয়াজির সঙ্গে নতজানু হয়েছিল ৯৩ হাজার পাকসেনাও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনও পরাজিত দেশের তরফে সেনার আত্মসমর্পণের ওটাই ছিল বৃহত্তম নজির। যাই হোক, পাকিস্তানের পক্ষে এই লজ্জা, অসম্মান হজম করা কখনোই সম্ভব নয়। সেই বদহজমের ঢেকুর তারা অহরহ তোলে। পাকিস্তানের এক হতাশ রাষ্ট্রনায়ক তো ভারতের বিরুদ্ধে হাজার বছরের যুদ্ধের হুংকার দিয়ে রেখেছেন। ভারতের চোখে চোখ রেখে লড়াই করে জয়ী হওয়ার সামর্থ্য, হিম্মত পাকিস্তানের নেই। তাদের এই অপরাগতা থেকেই পাকিস্তান দশকের পর দশক ভারতের বিরুদ্ধে তস্করসুলভ ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত। মানুষের স্মৃতি বড়োই দুর্বল। এরই সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশের ‘বন্ধু’ সাজার ফন্দি এঁটেছে পাকিস্তান। বাঙালি হয়েও একাত্তরে স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল রাজাকার। তাদের সাহায্য নিয়ে পাকিস্তান এই প্রচারে জোর দিয়েছে যে, আমরা তো ভাই ভাই! ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ কোন সংসারে নেই? জল্লাদের নয়া আহ্বান, ‘আমরা আবার এক হয়ে উঠি।’ তারা বোঝানোর চেষ্টা করছে, একাত্তরে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ তৈরি হয়নি, উপমহাদেশে মুসলমানের মুক্তির কেন্দ্র পাকিস্তান দু-ভাগ হয়েছিল এবং জন্ম নিয়েছিল ‘ভারতের এক কলোনি রাষ্ট্র’ মাত্র। এই মারাত্মক ভুল সংশোধনের এটাই শেষ সুযোগ। শেখ মুজিবুর রহমানকে আগেই খতম করা হয়েছে। তাঁর কন্যা শেখ হাসিনাও এখন বিতাড়িত। এবার রাজাকারদের রুখবে কে?
চলছে পাকিস্তানের মন্ত্রণা, অতএব বাংলাদেশকেই করে তুলতে হবে ভারত-বিরোধী চক্রান্তের সর্ববৃহৎ ঘাঁটি। ইতিমধ্যেই পাকিস্তানের সেনা এবং গোয়েন্দা বাহিনীর (আইএসআই) যাতায়াত বেড়ে গিয়েছে বাংলাদেশে। ‘হিন্দু ভারত’কে জব্দ করার নয়া নয়া প্ল্যান তাদের মাথায়। কোনও কোনও বড়ো পাককর্তা বস্তুত এখন ইলসামাবাদ-ঢাকার ডেইলি প্যাসেঞ্জার! ভারতের সফল অপারেশন সিন্দুরেই বুক কেঁপে গিয়েছে আসিম মুনিরের। নষ্ট রাষ্ট্র পাকিস্তানের মতলবি কর্মকাণ্ডকে ভারতের পক্ষে সহজভাবে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। তাই দেশের অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক শান্তি-সুস্থিতি রক্ষায় ভারতকে সক্রিয় হতেই হবে। তারই অঙ্গ হিসেবে পূর্ব সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি লক্ষণীয়। ৫৪ বছর পর বাংলাদেশ লাগোয়া পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে নদীয়ার চাপড়ায় ‘পাকাপোক্ত’ সেনাঘাঁটি তৈরিরও পরিকল্পনা নিয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। বাংলাদেশের মাটিতে পাক সেনা ও আইএসআই মানিকজোড়ের ক্রমবর্ধমান গতিবিধি রুখতেই এই পালটা পদক্ষেপ। কারণ তাদের এই নষ্টামির লক্ষ্য ভারতের সর্বনাশ ছাড়া কিছু হতে পারে না। বৃহস্পতিবার সেনার শিখ লাইট ইনফ্যান্ট্রির অফিসার ও জওয়ানদের একটি দল চাপড়ার সীমান্ত গ্রাম পঞ্চায়েত হাটখোলার বিভিন্ন অংশ পরিদর্শন করেন। প্রয়োজনীয় ছবিও তুলে নিয়ে গিয়েছেন তাঁরা। বাসিন্দাদের পাশাপাশি পঞ্চায়েত স্তরীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গেও কথা বলেছেন সেনাকর্তারা। সীমান্তের এই অংশে খুব শীঘ্রই ভারতীয় সেনাঘাঁটি তৈরিরও ইঙ্গিত মিলেছে সেনার তরফে। জাতীয় স্বার্থে রাজ্য সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদেরও উচিত এই প্রশ্নে প্রতিরক্ষা বিভাগকে সর্বতোভাবে সাহায্য করা।