নিজস্ব প্রতিনিধি, আসানসোল: দলের বুথ সভাপতির নাবালিকা কন্যাকে মাদক খাইয়ে বেহুঁশ করে ধর্ষণ। সেই ছবি মোবাইলে তুলে ব্ল্যাকমেল। তারপর একাধিকবার যৌন নির্যাতন। এমন গুরুতর অভিযোগ উঠতেই বেপাত্তা। দীর্ঘ পাঁচ বছর আত্মগোপন করেও শেষরক্ষা হল না। মঙ্গলবার ভোরে সেই কীর্তিমান যুবক সহদেব ঘোড়ুইকে গ্রেফতার করে কাঁকসা থানার পুলিশ। ঘটনার সময় সহদেব ছিলেন বিজেপির যুবনেতা। তাঁর কাকা লক্ষ্ণণ ঘোড়ুই ছিলেন দলের দাপুটে জেলা সভাপতি। বর্তমানে তিনি বিজেপির দুর্গাপুর পশ্চিমের বিধায়ক লক্ষ্মণ ঘোড়ুই। দুর্গাপুরে গণধর্ষণ-কাণ্ডে গেরুয়া বাহিনীর প্রথম সারির প্রতিবাদী মুখ। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ভাইপো গ্রেফতার হতেই গোটা শিল্পাঞ্চল তোলপাড়।
কাঁকসার আইসি প্রসুন খান এদিন বলেন, ‘নাবালিকা ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত পলাতক ছিলেন। তাঁকে গ্রেফতার করে আদালতের জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করা হয়েছে।’ পাঁচ বছর অভিযুক্ত পদ্ম শিবিরের প্রাক্তন যুবনেতা কোথায় ছিলেন, সে বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি আইসি সাহেব। তবে, সহদেবের আত্মগোপনের প্রশ্নে চাপানউতোর শুরু হয়েছে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে। শাসক দলের অভিযোগ, বিধায়ক নিজের ভাইপোকে বিজেপি শাসিত ত্রিপুরায় লুকিয়ে রেখেছিলেন। গোপনে এলাকায় ফিরতেই পুলিশ গ্রেফতার করে। যদিও বিজেপি বিধায়কের দাবি, ভাইপো বাড়িতেই ছিল।
জানা গিয়েছে, কাঁকসা থানার বামনাবেড়া গ্রামে আদি বাড়ি বিধায়ক লক্ষণ ঘোড়ুইয়ের। সেখানেই থাকতেন তাঁর ভাইপো সহদেব। অভিযোগ ওঠার পর থেকেই পলাতক ছিলেন তিনি। দুর্গাপুর মহকুমা আদালত তাঁর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পাশাপাশি সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছিল। মূল অভিযুক্তকে পলাতক দেখিয়েই মামলার চার্জশিট জমা করেছিল পুলিশ। মঙ্গলবার ভোরে হঠাৎ স্থানীয় বাসিন্দাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। তাঁরা দেখেন কাঁকসা থানার আমলাজোড়া ক্যানেল পাড় এলাকায় প্রাতঃভ্রমণ করছেন ফেরার সহদেব। সূত্রের খবর, তাঁরাই সহদেবের ঘরে ফেরার খবর জানিয়ে দেন থানাকে। তড়িঘড়ি পুলিশ সেখানে গিয়ে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে। এদিনই তাকে দুর্গাপুর মহকুমা আদালতে তোলা হয়। অভিযুক্তের জেল হেপাজতের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।
সালটা ২০২০। আমলাজোড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের ধোবিঘাট এলাকার বিজেপির বুথ সভাপতি থানায় গিয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ করেন। পুলিশকে তিনি লিখিতভাবে জানান, তাঁর নাবালিকা কন্যাকে ভুল বুঝিয়ে দুর্গাপুরের একটি পার্কের ঘরে নিয়ে যান সহদেব। সেখানেই মেয়েকে নেশার দ্রব্য পান করিয়ে ধর্ষণ করেন। সেই ছবি মোবাইলেও তুলে রাখে। সেটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে পরে একাধিকবার তাঁর মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়। ঘটনাটি জানাজানি হতেই ঘর ছেড়ে পালিয়ে যান তৎকালীন বিজেপির যুবনেতা। সেই সময় তৃণমূলের ব্লক সভাপতি ছিলেন দেবদাস বক্সি। সহদেবের গ্রেফতারের খবর শুনে তিনি এদিন বলেন, ‘নির্যাতিতার বাবা প্রথমে বিজেপির কাছে সুবিচারের আর্জি রেখেছিলেন। কিন্তু ওদের দলের নেতারা কর্ণপাত করেননি। তাতে পরিবারটি ভেঙে পড়ে। আমরা পাশে দাঁড়াতে তিনি অভিযোগ দায়ের করার সাহস পেয়েছিলেন।’
পুলিশ তদন্তে নেমে দুর্গাপুরের সেই পার্কে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করে। নির্যাতিতার গোপন জবানবন্দিও নথিভূক্ত করা হয়। তার ডাক্তারি পরীক্ষা করানো হয়। সহদেবের বিরুদ্ধে পকসো ধারায় ধর্ষণের মামলা রুজু করা হয়। পুলিশ সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে চার্জশিটও দিয়ে দেয়। এবার মূল অভিযুক্ত গ্রেফতার হওয়ায় মামলার ট্রায়াল শুরু হবে।
ক’মাস পরেই রাজ্যে বিধানসভার ভোট। তার আগে বিজেপি বিধায়কের ভাইপো গ্রেফতার হতেই ময়দানে নেমে পড়েছে তৃণমূল। দলের জেলা সভাপতি নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বলেন, ‘কয়েকদিন আগেই লক্ষ্ণণবাবুর অশালীন ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। এবার নাবালিকা ধর্ষণে তাঁর ভাইপো গ্রেফতার হলেন। এটাই বিজেপির প্রকৃত চরিত্র। ত্রিপুরায় ভাইপোকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।’ লক্ষণ ঘোড়ুই অবশ্য বলেন, ‘আমার সঙ্গে ভাইপোর ২০ বছর কোনও যোগাযোগ নেই। ও বাড়িতেই ছিল। পুলিশ কেন গ্রেফতার করেনি জানি না।’