তারপর বলছেন, ‘সমাধি অনেক প্রকার। হৃষীকেশের সাধুর কথার সঙ্গে আমার অবস্থা মিলে গিছলো।’ সমাধিতে মনটা যখন যায় বিভিন্ন রকম অনুভূতি হয়। ‘কখন দেখি শরীরের ভিতর বায়ু চলছে যেন পিঁপড়ের মত।’ এগুলি যোগীদের কথা—পিপীলিকাবৎ, সর্পবৎ, পক্ষীবৎ, যার হয় সেই জানে। এগুলি বোঝানো আছে শাস্ত্রের কথা দিয়ে কিন্তু কথা দিয়ে তো মানুষের অনুভব হয় না। এইজন্য বললেন, ‘যার হয়, সেই জানে। জগৎ ভুল হ’য়ে যায়।’ তারপরেই বলছেন, ‘মনটা একটু নাম্লে বলি, মা! আমায় ভাল কর, আমি কথা কব।’ ভাল কর মানে, আমি কথা বলতে পারি এমন অবস্থায় রাখ। লোকের সঙ্গে কথা বলতে চান কেন? না, তিনি তো আত্মসংস্থ হয়ে থাকবার জন্য আসেননি, এসেছেন জগৎকে ভগবৎ কথা শোনাবার জনয, তত্ত্বজ্ঞানের পথ দেখাবার জন্য। কাজেই তিনি সমাধিস্থ হয়ে থাকতে চান না, তিনি চান সকলের কাছে সেই পথ উন্মুক্ত করতে। তাই বলছেন, ‘মা! আমায় ভাল কর।’
তারপর বলছেন, ‘ঈশ্বরকোটী না হ’লে সমাধির পর ফেরে না।’ অবশ্য এটা সর্ববাদিসম্মত সিদ্ধান্ত নয়। কেউ মানে, কেউ মানে না। যারা মানে তাদের মত এই যে, সমাধির পর মানুষ আর ফেরে না। বলছেন, ‘তিনি যখন নিজে মানুষ হ’য়ে আসেন, অবতার হন, জীবের মুক্তির চাবি তাঁর হাতে থাকে, তখন সমাধির পর ফেরেন। লোকের মঙ্গলের জন্য।’ মুক্তির চাবি তাঁর হাতে। তিনি সেই চাবি খুলে দিলে মুক্তির পথ সকলে দেখতে পায়, মুক্তির দরজা তাদের জন্য উন্মুক্ত হয়। অবতার নিজে না দেখিয়ে দিলে, সেই পথ কে দেখাবে? শাস্ত্রে লেখা থাকে কিন্তু সেই লেখার মন লোকে বুঝতে পারে না অবতার নিজের জীবনের ভিতর দিয়ে সেই মর্ম সকলকে বুঝিয়ে দেন।
হাজরা এই সময় বলছেন, ‘ঈশ্বরকে তুষ্ট করতে পারলেই হলো। অবতার থাকুন আর না থাকুন।’ অর্থাৎ আবার একজন মধ্যবর্তী পুরুষকে আনবার দরকার কি? স্বয়ং ঈশ্বরই যখন রয়েছেন। ঠাকুর বলছেন, ‘হাঁ, হাঁ। বিষ্ণুপুরে রেজিষ্ট্রারীর বড় অফিস, সেখানে রেজেষ্টারী করতে পাল্লে, আর গোঘাটে গোল থাকে না।’ যদি তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক হয় তখন আর অবতারের প্রয়োজন হয় না। ঠিকই কথা, কিন্তু সেই সম্পর্ক করা তো সোজা কথা নয়। তাই অবতারের প্রয়োজন, জীবের সঙ্গে সেই সম্বন্ধ করিয়ে দেবার জন্য। বিষ্ণুপুর হল মহকুমা, আর গোঘাট হল একটা থানা। কাজেই গোঘাটে ছোট আদালত, তার চেয়ে বড় আদালত হচ্ছে বিষ্ণুপুর। তারও চেয়েও বড় আদালত আছে বাঁকুড়া—জেলার হেড-কোয়ার্টার। তাই ঠাকুর বললেন, বিষ্ণুপুরে রেজেষ্টারী করলে আর গোঘাটে গোল থাকে না।
স্বামী ভূতেশানন্দের ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত-প্রসঙ্গ’ থেকে