Bartaman Logo
৪ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ!

ভারতের সরকারি ঋণ জিডিপির ৮২% ছাড়িয়েছে। আয় না বাড়লে ঋণের ফাঁদে পড়ার আশঙ্কা। বিস্তারিত জানুন।

ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ!
  • ৪ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ধারের টাকায় দেশ বা সংসার চালানো ভালো না খারাপ? বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলেন, কী কারণে ধার নেওয়া হচ্ছে, কত সুদ দিতে হচ্ছে, ধার শোধ করার ক্ষমতা আছে কি না— মূলত এর উপর নির্ভর করে ধার নেওয়াটা মঙ্গল না অমঙ্গলের। বলা হয়, পরিবারের ক্ষেত্রে ব্যবসা, পড়াশোনা, বাড়ি কেনা, চিকিৎসার মতো কারণে ধার বা ঋণ নেওয়া হয়তো ভালো, কারণ তাতে জরুরি প্রয়োজন মেটানো যায় অথবা ভবিষ্যতে বেশি লাভের আশা আছে। একইভাবে দেশের ক্ষেত্রে রাস্তা, বন্দর, বিদ্যুৎ, হাসপাতাল, স্কুলের মতো স্থায়ী পরিকাঠামো ক্ষেত্র, যেখানে কর আদায়, জিডিপি বাড়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে, সেখানে ঋণ করা একেবারেই খারাপ নয়। এর উলটোটাও সমান সত্য। কোনো পরিবার ক্ষমতা না থাকলেও টিভি, মোবাইল কেনা, ভ্রমণ, বিয়ে বা দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্যের খরচ মেটাতে ধার করলে অনেকসময়েই তার পরিণতি ভালো হয় না। কারণ এর থেকে কোনো আয় তৈরি হয় না। অথচ সুদের বোঝা বাড়তেই থাকে। দেশের ক্ষেত্রেও ভরতুকি, বেতন, সুদ মেটানোর মতো অনুৎপাদনশীল খরচের জন্য ধার করলে ঋণের ফাঁসে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। যেমন, ভারতের এই মুহূর্তে সরকারি ঋণ মোট জিডিপির ৮২ শতাংশ। অর্থাৎ, সংসারের ক্ষেত্রে আয় বৃদ্ধি বা সম্পদ তৈরির কারণে ঋণ নিলে এবং দেশের ক্ষেত্রে জিডিপি ও কর্মসংস্থান বাড়ায় এমন কারণে ঋণ নেওয়া মঙ্গলজনক। কিন্তু দুর্ভাগ্যের হলেও সত্যি যে, এই মুহূর্তে পরিবার ও দেশ— দুই জায়গাতেই ‘ভালো’ ঋণের তুলনায় ‘খারাপ’ ঋণের পাল্লা ভারী! 

Advertisement

ছবিটা পরিষ্কার হয় রিজার্ভ ব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত রিপোর্টে। গত ৩০ জুন সর্বোচ্চ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৬-এর মার্চ মাসে ভারতের পারিবারিক ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে জিডিপির ৪৫.৫ শতাংশ। গৃহঋণ বাদ দিয়ে অন্যান্য খুচরো ভোগব্যয়ে ঋণের চাহিদার মাথা তোলাই এর কারণ। রিপোর্ট বলছে, সাধারণ কেনাকাটায় ধার করার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। সম্পদ তৈরির জন্য ঋণের প্রবণতা সবচেয়ে কম। দেখা যাচ্ছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গৃহ, কৃষি ও ব্যবসায়িক ঋণকে ছাপিয়ে যাচ্ছে এই অনুৎপাদনশীল ঋণের পরিমাণ। এই প্রবণতায় স্পষ্ট, মানুষের হাতে টাকা কমছে, যা বিপজ্জনক। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রক রিজার্ভ ব্যাংকের রিপোর্ট উল্লেখ করে সংসদে জানিয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২৫—এই পাঁচ বছরে দেশে পরিবার পিছু ঋণ টাকার অঙ্ক ৭.৭ লক্ষ থেকে বেড়ে ১৫.৭ লক্ষ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ দ্বিগুণ হয়েছে। পাশাপাশি, এই সময়কালে পরিবারের সঞ্চয় অনেকটা কমেছে। আরবিআই-এর রিপোর্টেই দেখা গিয়েছে, ক্রেডিটকার্ড পার্সোনাল লোন, বিদেশ লোনের মতো ধারের বহর দৈনন্দিন বাড়ছে। 
দেখা যাক, সরকারের ঋণের চেহারাটা। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষ শেষে কেন্দ্রীয় সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ১৯৭.১৮ লক্ষ কোটি টাকা। ২০২৭-এর মার্চ মাসের শেষে এই অঙ্ক বেড়ে ২১৪ লক্ষ কোটি টাকা দাঁড়াবে বলে অনুমান। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ১৭.৬ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ বৃদ্ধি পাবে। ঋণ-জিডিপির অনুপাত ৫৫.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে হতে পারে ৫৬.১ শতাংশ। এরমধ্যে সরকারের নেওয়া বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৬.৭৪ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু রিজার্ভ ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকারি, বেসরকারি, কর্পোরেট, ব্যাংক মিলিয়ে গত বছরের মার্চের তুলনায় চলতি বছরের মার্চে ভারতের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ২ হাজার ৬৩০ কোটি ডলার। ফলে সব মিলিয়ে এখন বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৩ লক্ষ কোটি টাকা। ঋণ-জিডিপির অনুপাত গত এক বছরে এক শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০.৮ শতাংশ। এই তথ্যে পরিষ্কার, কেন্দ্রীয় সরকার সিংহভাগ ঋণই নিচ্ছে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে। আর্থিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কী পারিবারিক, কী সরকারের ঋণ বৃদ্ধির মূল বিপদ হল, যদি আয় না বাড়ে অথচ ইএমআই/সুদের মতো খরচ বাড়তেই থাকে, তাহলে সেটা মস্ত বড়ো ফাঁদ। প্রশ্ন উঠেছে, ক্রমেই সেই ফাঁদে আমরা আটকে যাচ্ছি না তো? আরও প্রশ্ন, সরকার কি সেই মান্ধাতার আমলের ‘ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ’ নীতি নিয়েই চলবে? আর ঋণের ফাঁসে হাঁসফাঁস করবে দেশবাসী?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ