বৈরাগী চূড়ামণি সনাতন গোস্বামীর জীবনে এইরকম তীব্র বৈরাগ্যের কথা আছে। তিনি তাঁর ঠাকুরকে বলছেন, আজ তুমি নুন চাইছ, কাল বলবে মাখন দাও, তারপর বলবে আরও কিছু দাও—ওসব আমার দ্বারা হবে না। আমার যা আছে তাই-ই তোমায় নিতে হবে। এরই নাম বৈরাগ্য। আবার আছে, যখন সনাতন গোস্বামীর স্পর্শে ব্যাপারীর নৌকা ভেসে উঠল, ব্যাপারী ঠাকুরের মন্দির করে দিলেন। তখন সনাতন গোস্বামী বলছেন, ঠাকুর, বুঝেছি, এখন তোমার ভোগের বাসনা হয়েছে। তা, তোমার ভোগ নিয়ে তুমি থাক আমার ওসব পোষাবে না। আমি চললাম। তীব্র বৈরাগ্য হলে ভগবানের জন্যও কোনো ভোগের আয়োজন ভক্ত সহ্য করতে পারে না।
তীব্র ভাবাবেগের ফল
তারপর কেশবের সঙ্গে কথাপ্রসঙ্গে বলছেন, ‘তোমার অসুখ হ’য়েছে কেন তার মানে আছে। তাই ঐরকম হয়েছে।’ শরীরের ভিতর দিয়ে অনেক ভাব চলে গেছে, ঠাকুরের নিজের জীবনে এর অনুভব তো আছেই, শ্রীচৈতন্যের জীবনেও আছে—ভাবের বেগে তাঁর শরীরের রোমকূপ দিয়ে রক্তপাত হোত। খুব উচ্চ শক্তিসম্পন্ন (high volt এর) বৈদ্যুতিক তার স্পর্শ করলে যেরকম হয়, সমস্ত শরীরে সেরকম ভাবের প্রবাহ বয়ে যায়। সেজন্য ভাবের বেগ সত্ত্বগুণের দেহ না হলে সহ্য করতে পারে না। ভাবের প্রভাব শরীরের উপর কতটা পড়ে তা সাধারণ মানুষও কিছুটা অনুভব করতে পারে। যখন মানুষের তীব্র শোকের বা আনন্দের অনুভব হয় তখন তার দেহের উপর প্রতিক্রিয়া হয়। অনেক সময় শোনা যায় কোনো লোক একটা দুর্ঘটনার খবর শুনে অজ্ঞান হয়ে গেল। ভাবের বেগ সহ্য করতে পারেনি তাই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। আর ভগবৎ অনুভবের আনন্দ এত তীব্র যে খুব শুদ্ধসত্ত্ব শরীর না হলে ধারণা করতে পারে না। নিজের অনুভূতি থেকে বলছেন ঠাকুর, এই ভাব যখন আসে তখন বোঝা যায় না কিন্তু পরে শরীরের উপর এর প্রভাব বোঝা যায়, একটা যেন তোলপাড় ঘটে যায়। কেশবকে বলছেন, রোগের একটু বাকি থাকলে ডাক্তার যেমন হাসপাতাল থেকে ছাড়ে না, তেমনি শুদ্ধির একটু বাকি থাকলে তিনিও ছাড়েন না। ভগবানের পথে গেলে সমস্ত বেগ, সমস্ত কষ্ট সহ্য করতে হবে। উপায় নেই। ঠাকুর বলছেন, ‘হৃদু বোল্তো, এমন ভাবও দেখি নাই! এমন রোগও দেখি নাই।’ আসল কথা তখনতো আর দেহবুদ্ধি ছিল না, দেহের উপর দিয়ে কি হচ্ছে না হচ্ছে সে প্রশ্নই মনে আসছে না। মন তখন সূক্ষ্ম তত্ত্বেতে স্থির। পরে কেশবকে বলছেন, ‘শিশির পাবে ব’লে মালী বসরাই গোলাপের গাছ শিকড় শুদ্ধ তুলে দেয়’, অর্থাৎ এই রোগভোগ এ যেন ভবিষ্যতের একটা বিরাট কিছু সম্ভাবনার সূচনা।
স্বামী ভূতেশানন্দের ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত-প্রসঙ্গ’ থেকে