Bartaman Logo
৩ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিশ্বকাপ দেখছে ভারত! খেলবে কবে?

ভারত বিশ্বকাপে কখন খেলবে? ক্রীড়া বাজেট ও ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্লেষণ। বিস্তারিত জানুন।

বিশ্বকাপ দেখছে ভারত! খেলবে কবে?
  • ৩ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: একটি দেশের কিছু মানুষ প্রতিপক্ষকে খুব সুন্দর লক্ষ্যে ডিম ছুড়তে পারে। তাদের সমর্থকরা অত্যন্ত খুশি হয়। তারপর রাতজেগে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখে। কিন্তু তাদের দেশ খেলে না। সেটা নিয়ে অস্বস্তি হয় না। 

Advertisement

একটি দেশের নাগরিকদের একাংশ রামমন্দির তৈরি করার জন্য প্রাণপাত করে এবং সেই মন্দিরেই প্রণামী চুরি করে। কিন্তু জীবনেও প্রশ্ন তোলে না যে, আমাদের দেশ কবে খেলবে বিশ্বকাপ? 
একটি দেশের হাজার হাজার মানুষ যখন হাইওয়ে দিয়ে ১ হাজার কিলোমিটার হেঁটে হেঁটে নিজেদের ঘরে ফিরতে চেষ্টা করছে, সেই সময় ব্যলিকনিতে দাঁড়িয়ে থালা বাসন বাজায় ‘ব্যালকনি সোসাইটি’। কিন্তু ছেলেমেয়েকে ফুটবল অ্যাকাডেমিতে পাঠায় না।
একটি দেশের মানুষ মনে করে আমিষ বনাম নিরামিষ নিয়ে সময় কাটানো খুব দরকারি এই ক্ষুদ্র জীবনে। মাংসের দোকান বন্ধ করতে যা উৎসাহ, সেই উৎসাহে পাড়ায় পাড়ায় খেলার মাঠ কেন নেই সেই প্রশ্ন সরকারকে করতে ভয় পায়। 
একটি দেশ স্বামী বিবেকানন্দের কণ্ঠে সারাবছর মালা পরায়। কিন্তু ১৮৯৭ সালে স্বামীজির বিখ্যাত উক্তি ‘গীতাপাঠের তুলনায় ফুটবল খেলায় অনেক বেশি স্বর্গসুখ’ বক্তব্যের মর্মার্থকে নস্যাৎ করে। একটি দেশের মানুষ দারুণ খুশি হয় যখন জানতে পারে, ৯০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে ৬টি সাবমেরিন কেনা হচ্ছে। কিন্তু পালটা মৃদু প্রশ্নও করে না যে, আপনাদের ক্রীড়া মন্ত্রকের বার্ষিক বাজেট কত? কত জানেন? ৪৪৭৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে কিন্তু সব খেলা আছে। পক্ষান্তরে, চীনের বার্ষিক ক্রীড়া বাজেট কত? ২৫ হাজার কোটি টাকা। 
বিশ্বকাপ ফুটবল ১০০ বছরে পদার্পণ করতে চলেছে। ভারত ১০০ বছর ধরেই শুধু অন্যান্য দেশের সমর্থক। ওই দেশ তাদের নিজেদের খেলোয়াড়দের খেলা দেখতে রাত জেগে থাকুক না থাকুক, ভারতীয়রা দেখবে। একটি দেশের মানুষ ভিনদেশি সুপারহিরো ফুটবলারদের মধ্যে কে বেশি এগিয়ে এই নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া, বিবাদ, মতান্তর করে। পোস্টার কেনে। দেওয়ালে লাগায়। আর নিজের দেশের ফুটবল  নিয়ে কোনো উচ্চাশা পোষণ করে না। জানে না জাতীয় দলের এগারো জনের নাম।  ভারতবাসীর কাছে ভিনদেশি ফুটবল হিরো আসে এবং যায়। কিন্তু ভারতের কোনো ফুটবল হিরোকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দেশের মানুষ বন্দনা করছে এই দৃশ্য দেখার সুখ পায় না। 
এসব কেন হয়? কারণ সেই দেশের সরকারের আচার আচরণে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না যে, একদিন আমাদেরও বিশ্বকাপে যেতে হবে। ঘোষণা করে অনেক কিছু। সেজন্য কী করতে হবে? ফুটবল খেলার জনপ্রিয়তা ও পরিকাঠামো বৃদ্ধি করতে হবে। পরিকাঠামো কাকে বলে? এই যে বিগত আর্থিক বছরের বাজেটে ৪৪৭৯ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ হয়েছে ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ বিভাগের জন্য সেখানে ফুটবলের জন্য বরাদ্দ কত? পৃথকভাবে কোনো বরাদ্দই নেই। খেলো ইন্ডিয়া মিশনে ৯২৪ কোটি টাকা বরাদ্দ। তার কিয়দংশ পায় ফুটবল। অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন নিজেদের মতো করে বাণিজ্যিকভাবে অর্থ সংগ্রহ ও  বরাদ্দ করে। ৮৫ থেকে ১৩৪ কোটি টাকা দেখা গিয়েছে সাম্প্রতিক অতীতে। কিন্তু পরিকাঠামো নির্মাণের সবথেকে জরুরি কোনটা? স্টেডিয়াম।
ভারতে মালটিপারপাস স্টেডিয়ামের সংখ্যা কত? ৭৫। তাদের মধ্যে ২০টির কাছে আছে ফুটবল ফেডারেশনের লাইসেন্স। চীনের প্রধান স্পোর্টস স্টেডিয়ামের সংখ্যা কত? অন্তত ২৩৮। ভারতে শুধুই ফুটবল খেলা হবে এরকম ডেডিকেটেড স্টেডিয়াম প্রায় নেই-ই। বিখ্যাত স্টেডিয়ামে একইসঙ্গে থাকে অ্যাথলেটিক ট্র্যাক। চীনের ৪০ টি জেলাস্তরে ৩০ হাজার দর্শক ক্ষমতাসম্পন্ন স্টেডিয়ামে নিয়ম করে সুপার লিগ অথবা ফিফা টায়ার সূচি অনুযায়ী খেলার আয়োজন হয়। ৬ লক্ষ গ্রামে ফুটবল ও ক্রীড়া নিয়ে সরাসরি নাগরিকদের সংযোগ তৈরি হয়েছে। ভারতে ক্রীড়া মন্ত্রকের জন্য যে বাজেট দেওয়া হয় সেটি মোট বাজেটের কতটা? ০.৯ শতাংশ!  
ভারত সরকার কি কোনোই সদিচ্ছাই দেখায়নি? দেখিয়েছে। কিন্তু ঘোষণা এবং বাস্তবের রোডম্যাপে আকাশ পাতাল ফারাক। সরকার জানিয়েছে, ভিশন ২০৪৭ প্রজেক্ট। অর্থাৎ ২০৪৭ সালের মধ্যে এশিয়ার সফলতম চারটি ফুটবল খেলা দেশের অন্যতম হবে ভারত। আর বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করবে। সেজন্য কী করা হবে? সাড়ে ৩ কোটি শিশুকে তৃণমূলস্তরে ফুটবল সংগঠিত ফুটবল খেলার সঙ্গে সংযুক্ত করে দেওয়া হবে। এই যে একটি সুন্দর ঘোষণা হয়েছে, তার পাশাপাশি বাস্তব সত্যটা কী প্রতিভাত হল সম্প্রতি? ভারতের ফুটবল ফিফা বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে ১৩৯ নম্বরে নেমে এসেছে। অর্থাৎ ১৩৮টি দেশ ভারতের থেকে বেশি ভালো ফুটবল খেলছে এবং র‌্যাঙ্কিং বাড়িয়ে নিয়েছে। 
ফিফা কি সুযোগ দিচ্ছে না? দিচ্ছে। এবারই ৪৮টি দেশ নিয়ে খেলা চলছে। যাতে আরও বেশি দেশ অংশ নিতে পারে। ভারতকে সেজন্য আগামীদিনে এশিয়ার সেরা টিম হতে হবে না। অন্তত সেরা ৮টি দেশের মধ্যে একজন হতে হবে। যাদের কাছে ১৪৬ কোটি জনগণ, যাদের কাছে প্রায় ৪ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতি, তাদের কাছে এটা কি সাংঘাতিক কঠিন? কিন্তু কই! দেখা যাচ্ছে না তো সেরকম কোনো লক্ষণ? কেন? এশিয়ার মধ্যে ভারতের স্থান কোথায়? এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের তালিকায় ২৩ তম। এশিয়ার সার্বভৌম রাষ্ট্রের সংখ্যা কত? ৪৮! তাও ভারত পারছে না কেন? আরও ছোটো করে দেখা যাক। ভারত এশিয়ার মধ্যে কোন অংশে? দক্ষিণ এশিয়া। সেখানে কারা আছে? ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং ইরান! সে কি? ইরান দক্ষিণ এশিয়ায় নাকি? হ্যাঁ। রাষ্ট্রসংঘের স্ট্যাটিসটিক্যাল সিস্টেম (এম ৪৯) অনুযায়ী ইরানকে ফেলা হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়। 
তাহলে আমাদের লজ্জা আরও একটু বেড়ে গেল অথবা গৌরব কিছুটা বেঁচে গেল। কেন? কারণ এই দক্ষিণ এশিয়া থেকে অন্তত ভারতের প্রতিনিধিত্ব করা উচিত ছিল। সেটা হল না। সেটা একটু লজ্জার কারণ। আবার দক্ষিণ এশিয়ার লজ্জা বাঁচাচ্ছে ইরান। তারা অন্তত বিশ্বকাপে গিয়েছে। সেটা গৌরবের কারণ। কিন্তু অন্যের উজ্জ্বলতায় নিজেদের অন্তরে আলো জ্বালাতে হবে আর কতদিন? 
আফ্রিকার ১০টি রাষ্ট্র এবার বিশ্বকাপে গিয়েছে খেলতে। তাদের মধ্যে কঙ্গোয় এই মুহূর্তেও দুর্ভিক্ষ চলছে। ৩৫ লক্ষ মানুষ অনাহার ও অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। সেই কঙ্গো বুধবার ইংল্যান্ডকে বিনা যুদ্ধে জয় দেয়নি। বেলজিয়ামকে সেনেগাল চরম উদ্বেগে রেখেছিল পরাজয়ের আগে। মরক্কো ম্যারাথনেও সর্বদা সুপারস্টার হয়ে থাকে, আবার বিশ্বকাপ ফুটবলেও দল পাঠায়! এসব অনুপ্রেরণা আমাদের মতো দেশের রক্তে আগুন জ্বালানোর কথা। 
আমাদের দেশে কি ‘বেবে’ নেই? অবশ্যই আছে। তাদের খুঁজে বের করবে কে? কিন্তু ‘বেবে’ কে? এটা একটা রূপকথা। এবারের বিশ্বকাপে পশ্চিম আফ্রিকা উপকূলে যে দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্ড কোয়ালিফাই করেছে, সেটা এক বিস্ময়কর সংযোজন। এই দেশের জাতীয় দলের ফরওয়ার্ড টিয়াগো ম্যানুয়েল ডায়াসকে ফুটবল বিশ্ব চেনে ‘বেবে’ নামে। শিশুকালেই পিতামাতা তাঁকে পরিত্যাগ করেছিল। পর্তুগালের লিসবনে একটি অনাথ আশ্রমে বড়ো হয়ে উঠলেন। সামনের ফুটপাতে খেলতেন ফুটবল। বল কেনার টাকা কোথায়? বস্তা গোল করে বল তৈরি করা হত। ২০১০ সালে স্থানীয় এক ফুটবল টুর্নামেন্টে বেবে যখন খেলছেন, তিনি চোখে পড়ে গেলেন এক জহুরির। অ্যালেক্স ফার্গুসন। তিনি এই ছেলেকে নিয়ে এলেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে। কিন্তু ব্যর্থ হলেন বেবে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের প্রবল উজ্জ্বলতা আর পেশাদারী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি পেরে উঠলেন না। বলা হল অ্যালেক্স এত বড়ো ভুল কেন করলেন? যাকে তাকে এভাবে নিয়ে এলেন? বেবে এরপর এই ক্লাব থেকে সেই ক্লাব ঘুরে বেড়ালেন। তাঁর নামই হয়ে গেল ট্র্যান্সফার ফ্লপ। কিন্তু তারপর নিলেন এক আশ্চর্য সিদ্ধান্ত। ৩১ বছর বয়সে ২০২২ সালে স্থির করলেন নিজের পিতামাতা যে দেশের ছিলেন, সেই স্বদেশ কেপ ভার্ডকে গড়ে তুলবেন। ফিরে এলেন। নেতৃত্ব দিলেন। কেপ ভার্ড বিশ্বকাপে সুযোগ পেল! এই রূপকথাগুলি কোনো একটি দেশের হয় না, সব দেশে আছে। চিনে নিতে হবে। সুযোগ দিতে হবে। 
আমরা দেখতে পাচ্ছি এক অদ্ভুত প্রবণতা। সুপারপাওয়াররা যতটা ভাবা হয়েছিল অতটা শক্তিশালী নয়। চার বছর কেটে গেল। রাশিয়া এখনো হারাতে পারছে না ইউক্রেনকে। আমেরিকা ইরানকে পরাজিত করতে পারল না। বাধ্য হয়ে চুক্তির টেবিলে বসেছে। আফ্রিকার দেশগুলি ইওরোপকে লাগাতার ধাক্কা দিচ্ছে বিশ্বকাপে। ঊনবিংশ শতকে জার্মানি থেকে আসা শাসক প্যারাগুয়ে শাসন করেছিল। সেই জার্মানিকে বিশ্বকাপে হারিয়ে দিল প্যারাগুয়ে। মরক্কো হারাচ্ছে নেদারল্যান্ডসকে। নিজেকে মুখে বিশ্বগুরু বললে হবে না। আমাদেরও জগৎসভায় সম্মান আদায় করতে হবে। কিন্তু কবে?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ