ভারতে খনিজ তেলের দাম নির্ধারিত হয় খোলা বাজারের নিরিখে। দেশীয় বেসরকারি তেল কোম্পানিগুলি তো বটেই সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির ক্ষেত্রেও অভিন্ন নিয়ম। পেট্রল এবং ডিজেলের দাম নির্ধারণ করা হয় একটি বাজার-নিয়ন্ত্রিত (ডিরেগুলেশন) মূল্যের ভিত্তিতে। ২০১০ সালের জুনে পেট্রলের এবং ২০১৪ সালের অক্টোবরে ডিজেলের দামের উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ নীতি তুলে নেওয়া হয়। এই পদক্ষেপের পক্ষে ছিল জনকল্যাণের দোহাই। বলা হয় যে, এর ফলে সাধারণ মানুষ আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যের সুবিধা পাবে। বাতলে দেওয়া হল রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলি (ওএমসি), যেমন—আইওসিএল, বিপিসিএল, এইচপিসিএল প্রভৃতি এই দাম নির্ধারণ করবে। দৈনিক দাম নির্ধারিত হবে আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) দাম এবং ডলার-রুপির বিনিময় হারের ভিত্তিতে। ভারতে অপরিশোধিত তেলের বেশিরভাগটাই আমদানিকৃত। এজন্য সাধারণত ট্রেড প্যারিটি প্রাইস নীতি ব্যবহার করা হয়। সেখানে গ্রহণ করা হয় আমদানি এবং রপ্তানি মূল্যের গড় অনুপাত। মূল্য গঠন পদ্ধতি এইরকম—চূড়ান্ত খুচরো মূল্যের মধ্যে কয়েকটি উপাদান থাকে: (১) আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের মূল্য ও পরিশোধনের খরচ। (২) কেন্দ্রীয় সরকারের এক্সাইজ ডিউটি। (৩) রাজ্য সরকারের ভ্যাট। (৪) তেল কোম্পানির মার্জিন এবং ডিলারের কমিশন। রাজ্যভেদে ভ্যাট এবং অন্যান্য স্থানীয় কর পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন শহরে জ্বালানির চূড়ান্ত দামে কিছুটা তফাত হয়ে থাকে।
মানুষ সবটাই মেনে নেয়। বরং বলা ভালো নির্বিবাদে মেনে নিতে বাধ্য হয়। একইসঙ্গে কিছু সময় ক্ষোভ জমে এবং তৈরি হয় প্রতিবাদের মানসিকতা। এটা তখনই হয় যখন দেখা যায় যে, সরকার কথা রাখছে না। নিজের তৈরি নীতি থেকে সরে আসছে এবং পরিণামে মানুষ বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যেমন ২০২৬-এ পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা ভোট মিটতেই পেট্রল, ডিজেলের লাগাতার দামবৃদ্ধিই হয়ে ওঠে দস্তুর। একে যথার্থই ‘ডাকাতি’ বলছেন অনেকে। বিশেষত কংগ্রেসের দাবি, ইউপিএর ২০০৪-১৪ সালের জমানায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১৭৫.৩৪ শতাংশ বেড়েছিল। মোদির আমলে বৃদ্ধি অনেক কম (পেট্রলে ৪৩.০১ শতাংশ এবং ডিজেলে ৬৭.৮৭ শতাংশ)। তার ফলে গত ১২ বছরে মোদি সরকার শুধু খনিজ তেল বাণিজ্যেই ৪৩ লক্ষ কোটি টাকা ‘লুট’ করেছে! কোভিডকালেও রেহাই দেওয়া হয়নি। এত বড়ো দেশ চালাতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন অবশ্যই। কিন্তু তার জন্য রাজস্ব উৎসের বিকেন্দ্রিকরণই কাম্য। মোদি সরকার সেই পথে না হেঁটে একবগ্গা মতো লক্ষ্যবস্তু করে তুলেছে কেবল খনিজ তেল বা জ্বালানিকেই। সরকারের রাজস্বের সীমাহীন চাহিদা মেটাতে নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছে জ্বালানি ক্ষেত্রের। সরকারের এই দৃষ্টিভঙ্গির বদল না-হলে সুরাহা মিলবে না ‘ট্রিপল ইঞ্জিনেও’। অগ্নিমূল্য তেলের গুঁতোয় বারোটা বাজবে দেশীয় অর্থনীতির। বাংলাও তার বাইরে থাকবে না।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধপরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। আলোচনার রাস্তায় ফিরেছে আমেরিকা ও ইরান। বিশ্ব বাজারে অশোধিত তেলের দামও চলে এসেছে যুদ্ধ শুরুর আগের স্তরে। মানুষকে এবার অন্তত সুরাহা দেওয়ার কথা। এটা তাদের ন্যায্য প্রাপ্য। নাগরিকরা কি শুধু দিয়েই যাবেন? বিনিময়ে কিছু প্রত্যাশা করবেন না, কিছুই পাবেন না তাঁরা? সত্যিই তো সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য জ্বালানিতে সুরাহার নামগন্ধ নেই। পেট্রল, ডিজেল এবং গৃহস্থের রান্নার গ্যাসের দর আকাশছোঁয়া। নাজেহাল অবস্থা গৃহস্থ থেকে গৃহিণীর। তাঁদের স্বস্তির ব্যবস্থা করার আগেই—বুধবার ঘটা করে বিমানে ব্যবহার্য ‘ভিভিআইপি’ জ্বালানির দাম ৫ টাকা কমাল কেন্দ্র। এভিয়েশন টার্বাইন ফুয়েলের (এটিএফ) দাম লিটার প্রতি ১১৫ টাকা থেকে কমে হয়েছে ১১০ টাকা। ফলে বিমানভাড়া খানিক কমতেই পারে, কিন্তু তাতে রামা কৈবর্ত, গফুর মিয়াঁদের কী আসে যায়? তাঁদের আসে যায় যে জ্বালানিতে রান্না হয় কিংবা বাস, ট্রাক, ভুটভুটি, ইঞ্জিন ভ্যান, মোপেড-মোটর বাইক প্রভৃতি চলে, সেটার দাম কমলে। অথচ কলকাতায় পেট্রলের দাম ১১৩ টাকা ৫১ পয়সা। অর্থাৎ, মোদি সরকারের এই আজগুবি পদক্ষেপের ফলে পেট্রলের থেকে সস্তা এখন বিমানের তেল! স্বভাবতই মোদির ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ স্লোগান হাস্যকর হয়ে উঠেছে। কবির (খছরুজ্জামান্) ভাষায় বলা যায়: ‘‘আচ্ছে দিন আনতে যেয়ে দিনের মন্দ এল/ রামরাজত্বের ধন্দে পড়ে পুরো দেশটাই গেল!/ হা-হা-হা, হেসে হেসে, স-বা-ই গেছে ফেঁসে/ একপেশে ওই উল্টো রাজার দেশে!’’ পেট্রল, ডিজেল ও রান্নার গ্যাসের দাম কমানোর দাবিতে সরব এখন গোটা দেশ। সরকারের উচিত, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম নিয়ে বাস্তবোচিত পদক্ষেপ করা। নয়তো লাগাম টানার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে। বারোটা বাজবে সারা দেশের অর্থনীতির। তার চরম মূল্য গুনতে হবে গরিব ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে।