মৃণালকান্তি দাস: পশ্চিম এশিয়ার কূটনীতিতে এক বিশেষ ধরনের বিপদ লুকিয়ে আছে, যা কোনো সমঝোতা স্মারক বা চুক্তি দিয়ে পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। আর সেই বিপদ হল, এমন এক নেতা, যাঁর হারানোর কিছুই নেই। আছে শুধু জমি দখলের প্রবল আকাঙ্ক্ষা। আছে ‘গ্রেটার ইজরায়েল’ গড়ার স্বপ্ন। সেই নেতার নাম বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু!
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেফ্রি ডি স্যাক্স লিখছেন, এটা ইজরায়েল রাষ্ট্র নয়, বরং তার এক ভয়ংকর সম্প্রসারণবাদী কল্পনা। এই ধারণাই ইরাক, গাজা, লেবানন, সিরিয়া এবং ইরানের যুদ্ধগুলির অনুঘটক। এই ধারণা অনুযায়ী, ইজরায়েলের বিস্তার হওয়া উচিত ঐতিহাসিক প্যালেস্তাইনের গোটা ভূখণ্ড জুড়ে। অর্থাৎ জর্ডন নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত এবং তার বাইরেও প্রতিবেশী দেশগুলির অংশবিশেষ পর্যন্ত। ইজরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবির কথায়, এই ‘গ্রেটার ইজরায়েল’ নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত বিস্তৃত। এই বিপজ্জনক ধারণার দু’টি প্রধান উৎস রয়েছে। প্রথমত, নেতানিয়াহুর মতো কট্টরপন্থীরা মনে করেন, নিরাপত্তার জন্য ইজরায়েলের জর্ডন নদী থেকে সাগর পর্যন্ত গোটা ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি। তাতে সেখানে বসবাসকারী প্রায় ৮০ লাখ প্যালেস্তিনীয়র ভবিষ্যৎ যাই হোক না কেন। দ্বিতীয়ত, ইজরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোৎরিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের মতো নেতাদের একধরনের ধর্মীয় আধিপত্যবাদী বিশ্বাস রয়েছে। সেই বিশ্বাস অনুযায়ী— এই ভূমি কেবল ইহুদিদের জন্যই ঈশ্বরপ্রদত্ত। স্মোৎরিচ তো সরাসরি বলেছেন, ‘অন্যদের খুশি করতে আমরা আত্মহত্যা করতে পারব না।’
এই প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু দু’টি শক্তিশালী মার্কিন গোষ্ঠীকে ব্যবহার করেছেন। একদিকে রয়েছেন ইহুদি জায়নবাদীরা, যাঁরা ইজরায়েলকে নিঃশর্তভাবে সমর্থন করেন। অন্যদিকে রয়েছেন খ্রিস্টান জায়নবাদীরা, যাঁরা শেষ যুগের ভবিষ্যদ্বাণী ও যিশুর পুনরাগমনের বিশ্বাসকে বাস্তব মানুষের জীবন থেকেও বেশি গুরুত্ব দেন; অর্থাৎ প্যালেস্তিনীয় কিংবা ইজরায়েলি জীবনের চেয়েও। এখানে একটি বিভ্রম আরেকটি বিভ্রমের জন্ম দিয়েছে। আর এই পথ ধরে একের পর এক যুদ্ধ হয়েছে। ৩০ বছর ধরে এই সংকট চলছেই। ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক যুদ্ধ ছিল এই ‘গ্রেটার ইজরায়েল’ ভাবনারই আরেকটি রূপ। একদিনেই ৯ কোটি মানুষের একটি রাষ্ট্রের পতন ঘটানো যাবে— এমন কল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজরায়েল ও আমেরিকার হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হলেও কাঙ্ক্ষিত পতন ঘটেনি। তার বদলে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গিয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে তেলের সংকট তৈরি হয়েছে।
গত মার্চ মাস থেকে গোটা পশ্চিম এশিয়াকে গ্রাস করে রাখা সংঘাতের অবসান ঘটাতে ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি সমঝোতা স্মারকে (অন্তর্বর্তী চুক্তি) সই করেছে। তবে এই চুক্তিতে ইজরায়েল কোনো পক্ষ ছিল না। নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি এই চুক্তির শর্ত মেনে চলতে কোনোভাবেই বাধ্য নন। নেতানিয়াহুর প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজরায়েল কাৎজ আরও এক ধাপ এগিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) লেবানন, সিরিয়া ও গাজা থেকে সরবে না। আসলে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ‘গ্রেটার ইজরায়েল’ ভাবনায় জড়িয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং তিনি তা বুঝতে পেরেছেন। তিনি বুঝতে পারছেন, ইরানের সঙ্গে নতুন চুক্তি তাঁর জন্য যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ এবং একটি অর্থহীন যুদ্ধ থেকে মুক্তির সুযোগ। আর ‘গ্রেটার ইজরায়েল’ সমর্থক নেতারা এই চুক্তিকে নস্যাৎ করতে চাইছেন। কারণ, ইরানের সঙ্গে শান্তি মানেই এই ধারণার পরাজয়। তাই চুক্তির পরেই ইজরায়েল লেবাননে হামলা চালিয়েছে। তারা একদিনে ৪৭ জন এবং পরদিন আরও ৩২ জনকে হত্যা করেছে। অথচ চুক্তি অনুযায়ী, সেখানে যুদ্ধবিরতি জারি হওয়ার কথা ছিল!
ইজরায়েলের বৃহৎ সংবাদসংস্থা হারেৎজ–এর সামরিক বিশ্লেষক অ্যামোস হারেল লিখেছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে ইরানের সমঝোতা ছিল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড়ো নিরাপত্তা ব্যর্থতা। এই ক্ষতে আরও নুন ছিটিয়ে ট্রাম্প মার্কিন সংবাদসংস্থা নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, নেতানিয়াহুর তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কারণ, ‘ইরানের যদি পারমাণবিক অস্ত্র থাকত, ইজরায়েল দু’ঘণ্টাও টিকত না।’ ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনে সাংবাদিকদের তিনি আরও বলেন, ‘আমেরিকা না থাকলে ইজরায়েল বলে কিছু থাকত না।’ এটাই পরিহাস, হোয়াইট হাউসে ইজরায়েলের সবচেয়ে বড়ো বন্ধু হিসেবে পরিচিত ডোনাল্ড ট্রাম্পই শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড়ো স্বপ্ন নষ্ট করে দিয়েছেন। রীতিমতো কোণঠাসা হয়ে ইজরায়েলের ডানপন্থী শক্তিগুলি এখন ‘একাই এগোতে হবে’ ধারণা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। ডানপন্থী বিরোধী দল ইজরায়েল বেইতেনু-র নেতা আভিগডর লিবারম্যান বলেছেন, ইজরায়েলের উচিত নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী গঠন করা এবং মোসাদকে শুধু ইরানের সরকার উৎখাতের কাজে নিয়োজিত করা। অতি ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ঘোষণা করেছেন, ইরানের সরকার উৎখাতের অভিযান ‘সৃজনশীল উপায়ে’ চালিয়ে যেতে হবে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানকে বলেছেন, ‘ইরানের সরকারকে বলতে চাই, আমি হব তোমাদের সবচেয়ে ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন।’ অর্থাৎ কে কত বড়ো ইরান বিরোধী— সেটা দেখানোই এখন ইজরায়েলের রাজনীতির মুখ্য রসায়ন!
এই চুক্তি ধ্বংস করতে ইজরায়েল বেছে নিয়েছে লেবাননের মাটিকেই। ইরানের বিদেশমন্ত্রী লেবাননে ইজরায়েলি সামরিক অভিযান পুরোপুরি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে ওই রূপরেখা চুক্তি কার্যকর করার সব দায় সরাসরি ওয়াশিংটনের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। একইসঙ্গে ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লা সীমান্ত এলাকায় ইজরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে লড়াই শুরু করেছে। আমেরিকার মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইজরায়েলের মধ্যে স্বাক্ষরিত রূপরেখা চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন হিজবুল্লার প্রধান নাইম কাশেম। তাঁর দাবি, লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইজরায়েলের সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে হবে। লেবাননের ভূখণ্ডে প্রতিরোধ বাহিনীর (হিজবুল্লা) নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে ইজরায়েলের সেনা প্রত্যাহারকে যুক্ত করা অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি প্রস্তাব বলে তিনি মনে করেন। কারণ, ‘এমন পদক্ষেপ আগামীদিনে লেবাননকে শত্রু ইজরায়েলের হাতের পুতুলে পরিণত করবে।’ ফলে, মাসের পর মাস ধরে আলোচনা চলার পর যে চুক্তিটি সই হয়েছে, সেটি বাস্তবে বড়ো পরীক্ষার মুখে পড়েছে। আর এই পরীক্ষাটি নিচ্ছে পশ্চিম এশিয়ার এমন এক পক্ষ, যাকে কখনোই এই চুক্তির বেড়াজালে বাঁধা সম্ভব হয়নি। তারা জানে, লেবানন অশান্ত হলে ইরান এই চুক্তি ছুড়ে ফেলে দেবে। আবার যুদ্ধ শুরু হবে। হয়েছেও তাই। ফের বন্ধ হয়ে গিয়েছে হরমুজ প্রণালী!
যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নেতানিয়াহুর এই একগুঁয়েমি আসলে দেশের মাটিতে তাঁর রাজনৈতিক দুর্বলতার সঙ্গে জড়িত। ইরান যুদ্ধে বিশাল সাফল্য অর্জন করতে পারেননি তিনি। দেশের মাটিতে নেতানিয়াহু এমন এক নির্বাচনের মুখোমুখি, যেখানে আগামী অক্টোবরে ভোটাররা তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাও এখনও রয়ে গিয়েছে। আবার, তাঁর জোট সরকার টিকে আছে এমন কিছু মন্ত্রীদের সমর্থনে, যাঁরা রাজনৈতিকভাবে খোদ নেতানিয়াহুর চেয়েও চরম কট্টরপন্থী। এমন পরিস্থিতিতে একজন প্রধানমন্ত্রীর জন্য ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি মেনে নেওয়া রাজনৈতিকভাবেও আত্মঘাতী হতে পারে। তবে চুক্তিটি ছিঁড়ে ফেলার জন্য নেতানিয়াহুর কোনো প্রকাশ্য পদক্ষেপের প্রয়োজন নেই। তিনি শুধু লেবাননে এখন যে আগ্রাসন চালাচ্ছেন, তা চালিয়ে গেলেই হবে। তাতেই ইরানের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাবে। কূটনীতির ভাষায় এমন কিছু পক্ষ থাকে, যারা কোনো চুক্তিতে বাধ্য নয় এবং যাদের কোনো ভেটো দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ক্ষমতাও নেই, অথচ তারা গোটা একটি চুক্তি তছনছ করে দিতে পারে। এদের বলা হয় ‘স্পয়লার’। নেতানিয়াহু এখন ঠিক সেই ভূমিকাই পালন করছেন!
মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘কুইন্সি ইনস্টিটিউট’-এর নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট, ইরান বিশেষজ্ঞ ত্রিতা পার্সি বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি স্পষ্ট ঘোষণা করেন, ইজরায়েলের কোনো অযৌক্তিক সামরিক উত্তেজনায় আমেরিকা অংশ নেবে না ও তাদের রক্ষাও করবে না, তবে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।’ কিন্তু আমেরিকায় ‘ইজরায়েল লবি’-র চোখরাঙানি উপেক্ষা করা কি ট্রাম্পের পক্ষে সম্ভব?