Bartaman Logo
৩০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দেওয়ানি বিধির বাঁধন

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর হলে রাজ্যে আইন ও সামাজিক পরিবর্তন আসবে। বিজেপির পরিকল্পনার প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন।

দেওয়ানি বিধির বাঁধন
  • ৩০ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: তিনটি এজেন্ডা। প্রথম, অযোধ্যায় রামমন্দির স্থাপন। দ্বিতীয়, কাশ্মীরে ৩৭০ অনুচ্ছেদের অবলুপ্তি। এবং তৃতীয়, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এই তিন এজেন্ডা ভারতের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে পাক খাচ্ছে। নজর করে দেখলে, তিনটিই একসূত্রে বাঁধা। হিন্দুরাষ্ট্র। প্রথম দু’টি কার্যকর হয়ে গিয়েছে। এবার তৃতীয়টির পালা। মনে হতেই পারে, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড তো প্রশাসনিক বিষয়। এর সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক কী? 

Advertisement

রাজনীতিই ভিত, প্রশাসন ভবিষ্যৎ
উত্তরটা খানিক পিছন থেকে শুরু করা যাক। ডঃ বি আর আম্বেদকর সংবিধান প্রণয়নের সময় ধর্মের অধিকার দিলেন ২৫ নম্বর ধারায়। আর ধর্মীয় আচার ও নিয়ম পালনের অধিকার দিলেন ২৬ নম্বর ধারায়। এখানেই শেষ নয়। সংবিধানের ২৯(১) ধারায় বললেন, সংখ্যালঘুরা তাঁদের ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি স্বাধীনভাবে পালনের অধিকার পাবেন। আইন এবং নিয়ম সবার জন্য এক হওয়া উচিত... তাঁর এই মতে কোথাও ভুল নেই। কিন্তু ভারতের বিপুল বৈচিত্রের কথা মাথায় রেখে সেই পথে হাঁটলেন না আম্বেদকর। তাঁর মনে হল, এই বিষয়টা সময়, সমাজ এবং সরকারের উপর ছাড়া উচিত। তাই রাষ্ট্রীয় নীতি বা ডিরেক্টিভ প্রিন্সিপালস অব স্টেট পলিসির ছাতার তলায় তিনি স্থান দিলেন অভিন্ন দেওয়ানি বিধিকে। ধারা, ১৪৪। সংঘ হাতিয়ার করল এই ধারাকেই। বক্তব্য, সংবিধানে তো আছে। তাহলে কার্যকর হবে না কেন? আসলে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর হয়ে গেলে একটা বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে—এক দেশ এক আইন। কোন আইন? ফৌজদারি নয়। সে তো সবার জন্য সর্বদাই সমান (অভাবশালীদের জন্য)। ধর্মের ভিত্তিতে যার নানা রূপ, তা হল সিভিল আইন। বিয়ে, বিচ্ছেদ, সম্পত্তির অধিকার...। হিন্দু সমাজের এই সংক্রান্ত নির্দিষ্ট প্যাটার্ন আছে। আগে বাল্য বিবাহ চালু থাকলেও এখন নেই। বলা যায়, সংবিধান এবং আইন অনুযায়ী হিন্দু সমাজ নিজেদের অনেকটা গড়েপিটে নিয়েছে। সংঘ এবং বিজেপির প্রশ্ন হল, তাহলে বাকিরা করবে না কেন? সংখ্যাগুরু হয়ে হিন্দু সমাজ যদি ১৮ বছর বয়সের আগে মেয়ের বিয়ে দিতে পারে, শরিয়তি আইন অনুযায়ী মুসলিমরা কেন ১৫ বছর বয়সের কিশোরীকে পরদার পারে বসাবে? হিন্দু সমাজে যদি একাধিক বিয়ে অপরাধের শামিল হয়, অন্য ধর্মে কেন হবে না? প্রশ্ন যুক্তিযুক্ত। কিন্তু উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় কেন্দ্রের বিজেপি সরকার নেই। কারণ, সংবিধান... মৌলিক অধিকার তার হাত-পা বেঁধে রেখেছে। উপরন্তু সামাজিক অসন্তোষ, মুসলিম-খ্রিস্টানদের বেঁকে বসা, বিরোধীদের তীব্র প্রতিবাদ। তাহলে উপায় কী? দেওয়ানি বিধি রয়েছে যৌথ তালিকার ৭ নম্বর তফসিলে। এই ধরনের বিধি রাজ্য ঠিক করতেই পারে। আর তা নাগরিকরা মানতে বাধ্য। গোয়ায় কিন্তু এই ধরনের আইন কার্যকর ছিলই। নামটা শুধু ইউনিফর্ম সিভিল কোড ছিল না। কিন্তু সেখানকার বাসিন্দারা সেই পর্তুগিজদের সময় থেকে আসা কমন সিভিল কোডের অধীনে স্বচ্ছন্দেই আছেন। বিজেপি সেই সমীকরণটাই নিল—স্টেট পলিসি। যে রাজ্যগুলিতে বিজেপি সরকারে আছে, সেখানে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করে দেওয়া হবে। মামলা হবে? হোক। তাতে পদক্ষেপ থেমে থাকবে না। ১৭টি রাজ্যে ক্ষমতায় আছে বিজেপি। তার মধ্যে তিনটি রাজ্যে এই আইন কার্যকর হয়ে গিয়েছে। এবার পশ্চিমবঙ্গের পালা। ধীরে ধীরে যদি সিংহভাগ রাজ্যে এই আইন কার্যকর হয়ে যায়, তখন তার সাফল্য সামনে রেখে সংসদেও চাপ দেবে বিজেপি। আইনেরও গেরুয়াকরণ হবে। তাহলে কি সিদ্ধান্তটা শুধুই প্রশাসনিক বলা যায়? একেবারেই রাজনৈতিক নয়?
এখন একবার দেখা যাক, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বাংলায় কার্যকর হলে কী কী ফারাক আসতে পারে। 
বিয়ের নিয়ম, বিচ্ছেদেরও
 রাজ্যে ইউসিসি কার্যকর হয়ে গেলে প্রাথমিকভাবে যে বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে যাবে তা হল, মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ এবং ছেলেদের ২১’এ বেঁধে ফেলা। কোনো যুক্তিতেই এই বিধি খণ্ডন করা যাবে না। তাহলে জেল-জরিমানা হওয়ার সম্ভাবনা। মুসলিম পার্সোনাল ল অনুযায়ী, ১৫ বছর হল মেয়েদের বিয়ের বয়স। কিন্তু অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর হওয়া মাত্র রাজ্যে মুসলিম বা যে কোনো ধর্মীয় আইন বাতিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ, সেই আইন অনুযায়ী আদালতে দরবার করেও অন্যরকম সিদ্ধান্তে আসা যাবে না। 
 একজন নাগরিক একটির বেশি বিয়েও করতে পারবে না। বিচ্ছেদের সময়ও সম্পূর্ণভাবে আইন মেনে চলতে হবে। তিন তালাক তো বাতিল হয়ে গিয়েছেই, তালাক-ই-হাসান (প্রতি মাসে একবার তালাক বলবেন পুরুষ। তিন মাসে তিনবার), নিকাহ হালালা বা ইদ্দতের মতো প্রথাও রাজ্য থেকে অবলুপ্ত হয়ে যাবে। একইভাবে খ্রিস্টানদের বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রেও চার্চের আইন আর কার্যকর থাকবে না। 
 অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর হলে হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্ট (১৯৫৫) কিন্তু আর দিনের আলো দেখবে না। 
 রক্তের সম্পর্কের মধ্যে বিয়ে সম্পূর্ণ অবৈধ হয়ে যাবে আইনের চোখে। অর্থাৎ, নিজের কাকা-মামার ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিয়ের প্রথা বন্ধ হয়ে যাবে। উত্তরাখণ্ডে যেমন ৩৭টি সম্পর্কের তালিকা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই সম্পর্কগুলির মধ্যে বিয়ে ‘নিষিদ্ধ’। ছাড় পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে শুধু আদিবাসী সমাজের। যেহেতু তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং প্রথা রয়েছে। 
 লিভ-ইন সম্পর্কে গেলেও তা সরকারের ঘরে নথিভুক্ত করতে হবে। একমাসের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন না করলে অন্তত তিন মাসের জেল ও দু’জনেরই ১০ হাজার টাকা করে জরিমানার পথ খোলা রেখে দেবে সরকার। 
সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার
 ইউনিফর্ম সিভিল কোডে লিঙ্গভেদে সম্পত্তি কম বেশি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এই আইনে সবথেকে বেশি গুরুত্ব উইলের। কেউ যদি মৃত্যুর আগে আইনি পদ্ধতি মেনে উইল করে যান, তাহলে সেখানে যা লেখা আছে, সেটাই হবে। 
 উইল না থাকলে সম্পত্তি সমানভাবে ভাগ হবে বাবা-মা, স্ত্রী (অথবা স্বামী) ও ছেলেমেয়ের মধ্যে। এই সম্পর্কগুলিকে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে ‘ক্লাস ওয়ান’ বলে ধরা হয়। ধরে নেওয়া যাক, কোনো ব্যক্তি মৃত্যুর সময় ১০ লক্ষ টাকা রেখে গেলেন। যদি তিনি উইল করে না যান, তাহলে তাঁর স্ত্রী, ছেলে এবং মেয়ে প্রত্যেকে পাবেন আড়াই লক্ষ টাকা। আর বাবা-মা মিলে আড়াই লক্ষ। বাবা-মায়ের মধ্যে একজন আগেই মারা গিয়ে থাকলে অন্যজন পুরো আড়াই লক্ষ টাকা পাবেন। আর দু’জনই না থাকলে ওই টাকাটা বাকি তিনজনের মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে। 
 ওই ব্যক্তির যদি কেউ ‘ক্লাস ওয়ান’ সম্পর্কের আত্মীয় না থাকে, তাহলে নিজের ভাই-বোনের মধ্যে টাকাটা সমান ভাগ হয়ে যাবে। এই শ্রেণিটিকে অভিন্ন দেওয়ানি বিধিতে বলা হয় ‘ক্লাস টু’। এবং এই সবটাই কার্যকর হবে যদি মৃত ব্যক্তি উইল করে না গিয়ে থাকেন। 
 কোনো অবিবাহিত ভাই-বোন বা শ্বশুর-শাশুড়ি যদি ওই ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল হন, তাহলে তিনি অভিন্ন দেওয়ানি বিধির অধীনে সরাসরি কিছু পাবেন না। মৃত ব্যক্তির স্ত্রী, সন্তান এবং বাবা-মায়ের উপরই নির্ভর করতে হবে। তবে তিনি আদালতে যেতে পারবেন। 
 লিভ-ইন সম্পর্ক বা সারোগেসির মাধ্যমে জন্ম নেওয়া সন্তানকে অভিন্ন দেওয়ানি বিধিতে ‘ক্লাস ওয়ান’ উত্তরাধিকারীর মর্যাদাই দেওয়া হচ্ছে। ‘অবৈধ সন্তান’ বলে কোনো কনসেপ্টই আর থাকছে না এই ছাতার তলায়। সমানাধিকার—এটাই অভিন্ন দেওয়ানি বিধির লক্ষ্য। 
 মুসলিম ধর্মীয় আইনে মৃতের পুত্র সন্তান উত্তরাধিকার সূত্রে যা পায়, কন্যা সন্তানকে দেওয়া হয় তারও অর্ধেক। অর্থাৎ, বাবা মারা গেলে মেয়ে সম্পত্তির তিন ভাগের একভাগ শুধু পায়। সেই প্রথাও বিলুপ্ত হয়ে যাবে অভিন্ন দেওয়ানি বিধিতে। 
 খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে ছেলেমেয়ের মৃত্যু হলে মা সন্তানের সম্পত্তির ভাগ থেকে বঞ্চিত হন। সেই প্রথাও কিন্তু আর থাকছে না। তিনি ‘ক্লাস ওয়ান’ উত্তরাধিকার হিসাবেই মৃত সন্তানের অর্থের সমান ভাগ পাবেন। 
 অভিন্ন দেওয়ানি বিধির জন্য হিন্দু সমাজে যদি কোনো সমস্যা হয়, তাহলে তা হবে যৌথ পরিবারের। পিতৃপুরুষের সম্পত্তির অধিকার বলে এই আইনে কিন্তু কিছু থাকছে না। উত্তরাধিকারের ধারা পুরোটাই বয়ে যাবে সরাসরি রক্তের সম্পর্কের ভিত্তিতে। শরিকি বাড়ি যদি দাদার হয়, তাহলে তার অধিকার দাদার পর যাবে শুধুমাত্র তাঁরই স্ত্রী সন্তানের কাছে। ভাই বা তাঁর সন্তানের জন্য থাকবে না কিছুই। 
 বহু ব্যবসায়ী নিজেদের হিন্দু আনডিভাইডেড ফ্যামিলি বা যৌথ পরিবার হিসাবে দেখিয়ে থাকেন। তাঁদের গোটা পরিবারের নামে একটি প্যান কার্ড ইস্যু হয়। করের ক্ষেত্রে এর জন্য বিভিন্ন ছাড়ও তাঁরা পেয়ে থাকেন। অভিন্ন দেওয়ানি বিধির ক্ষেত্রে এই সুবিধা আর পাওয়ার কথা নয়। তবে রাজ্যের ক্ষেত্রে ইউসিসি চালু হলে হয়তো তাঁরা এখনই বিপদে পড়বেন না। গোটা দেশে কার্যকর হলে কর কাঠামোয় তার প্রভাব পড়ার কথা। 
তবে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে কী হবে, আর কী হবে না... সেটা স্পষ্ট হবে বিল সামনে আসার পরই। সেই বিল পেশ হবে, বিশেষজ্ঞের কমিটিতে যাবে, কাটাছেঁড়া হবে... সবচেয়ে বড়ো কথা, বারবার সে পড়বে প্রশ্নের মুখে—ভারতের চরিত্র ‘বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য’ সংকটে পড়বে না তো? এর উত্তর কিন্তু দেব আমরা। নাগরিকরা। সরকার নয়। ওই মঞ্চে রাজনীতি জিন্দাবাদ।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ