Bartaman Logo
৩০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভাবিয়া করিও কাজ

জি রাম জি প্রকল্পের অধীনে ১২৫ দিনের কাজের নতুন আইন কার্যকর হতে চলেছে। রাজ্যগুলির উদ্বেগ ও আপত্তির কারণে বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিস্তারিত পড়ুন।

ভাবিয়া করিও কাজ
  • ৩০ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শোনা যায়, গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ার পর মৃত্যুর আগে তাঁর মুখ দিয়ে একটিই শব্দ উচ্চারিত হয়েছিল, ‘হে রাম’। জাতির জনক সেই মহাত্মা গান্ধীর নামাঙ্কিত ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প (মনরেগা)-র নাম বদলে ১২৫ দিনের যে নতুন প্রকল্পটি ১ জুলাই থেকে গোটা দেশে যাত্রা শুরু করছে, মোদি সরকার এর নাম রেখেছে বিকশিত ভারত রোজগার ও আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ), সংক্ষেপে ‘জি রাম জি’ প্রকল্প। ২০২৫ সালের মধ্যে ডিসেম্বরে যেদিন সংসদে এই নতুন প্রকল্পের বিল ধ্বনি ভোটে পাস হয়েছিল, সেদিনই জাতির জনকের নাম বাদ দিয়ে তাঁকে অসম্মান করা হয়েছে বলে সরব হয়েছিল প্রায় সব বিরোধী দল। অভিযোগ উঠেছিল, গ্রামীণ গরিব মানুষের নিশ্চিত কর্মসংস্থানের লক্ষ্যকে সামনে রেখে ২০০৫ সালে, ইউপিএ-এর আমলের মনরেগা প্রকল্পে যে মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলির কথা বলা ছিল, জি রাম জি প্রকল্পে তা নির্মমভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার অবশ্য বিরোধীদের যাবতীয় অভিযোগ উড়িয়ে দাবি করেছে, নতুন আইন কার্যকর হলে গ্রামের লোকের হাতে বাড়তি অর্থ আসবে। গ্রামীণ অর্থনীতিও চাঙ্গা হবে। কিন্তু ঘটনা হল, জি রাম জি প্রকল্প নিয়ে একাধিক বিজেপি শাসিত ডবল ইঞ্জিন সরকারের দিক থেকেও অসন্তোষের খবর পৌঁছেছে দিল্লির দরবারে। 

Advertisement

খবরে প্রকাশ, ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন ফর পিপলস রাইট টু ইনফরমেশন নামের একটি সংস্থার পক্ষ থেকে আরটিআই-এ করা একটি আবেদনের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রক যে তথ্য জানিয়েছে, তাতে দেখা গিয়েছে জি রাম জি নিয়ে বিজেপির ঘরের মধ্যেই আগুন লেগেছে! নতুন প্রকল্পে রূপান্তর নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যগুলির আলোচনার নথি চাওয়া হয়েছিল ওই সংস্থাটির তরফে। জবাবে গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রক মাত্র ১৩টি রাজ্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে! কিন্তু তাতেই নতুন প্রকল্পের ছবিটা বেআব্রু হয়ে পড়েছে। কীরকম? এক) পুরানো আইনে শ্রমিকদের মজুরির ১০০ শতাংশ অর্থ ব্যয় করত কেন্দ্র। নতুন আইনে ৪০ শতাংশ অর্থ ব্যয় করতে হবে রাজ্যকে। এই নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে তিনটি রাজ্য, তার মধ্যে বিজেপি শাসিত মধ্যপ্রদেশ ও বিহার রয়েছে। অন্যটি ঝাড়খণ্ড। মধ্যপ্রদেশ স্বয়ং কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রীর রাজ্য। তিনটি রাজ্যই ৪০ শতাংশ অর্থ ব্যয়ের বাড়তি বোঝা বহন করতে অক্ষম বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দুই) পুরানো আইনে বছরে ১০০ দিনের নিশ্চিত কাজ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। নতুন আইনে বর্ষার সময়ে ৬০ দিন প্রকল্প বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। ১৩টি রাজ্যের মধ্যে ৪টি রাজ্য এই নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। তিন) অন্তত পাঁচটি রাজ্য মজুরির হার পুনর্বিবেচনার দাবি তুলেছে। যেমন বিহার বলেছে, ২৫৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে মজুরি করা হোক ৪১৩ টাকা। জম্মু-কাশ্মীরের দাবি, ২৭২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩১১ টাকা করা হোক। চার) প্রায় সব রাজ্যই মজুরি ও সরঞ্জাম কেনার বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে কেন্দ্রের দীর্ঘসূত্রতায় অসন্তোষ জানিয়েছে। পাঁচ) পুরানো আইনে রাজ্যগুলিকে কাজের হিসাবে অর্থ বরাদ্দ করত কেন্দ্র। নতুন আইনে বছরের গোড়াতেই বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ জানিয়ে দেবে কেন্দ্র। এর অর্থ, কাজের দিন বেঁধে দেওয়া। একাধিক রাজ্যের আপত্তি এই নিয়েও। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের বক্তব্য, নতুন আইন কার্যকর হলে একদিকে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়বে, অন্যদিকে রাজ্যের ঘাড়ে বাড়তি অর্থের বোঝা চাপবে। তাই ঠেলায় পড়ে এখন বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিও আপত্তি তুলতে শুরু করেছে। 
জি রাম জি প্রকল্প চালুর আগেই বিভিন্ন রাজ্যে যেভাবে অসন্তোষ-আপত্তির ঝড় উঠেছে, তাতে পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকার কী করবে—তা এখনও স্পষ্ট নয়। এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন যে কঠিন, তা মেনে নিয়েছেন খোদ কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী শিবরাম সিং চৌহানই। তাঁর কথায়, কোনো প্রকল্প ঘোষণা করে ফাইলে আটকে রাখা লক্ষ্য নয়। বাস্তবায়নই টার্গেট। এই কাজ কঠিন। তাই প্রকল্পটি নিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য উভয়কেই ভাবতে হবে। মন্ত্রী নিজেই জানিয়েছেন, চলতি অর্থবর্ষে এই প্রকল্পের জন্য কেন্দ্র-রাজ্য মিলিয়ে ১ লক্ষ ৫১ হাজার ২৮২ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। তার মানে, এর ৪০ শতাংশ অর্থ, অর্থাৎ ৬০ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ রাজ্যগুলিকে ব্যয় করতে হবে। এটা রাজ্যগুলির বাড়তি খরচ। পশ্চিমবঙ্গে ৮ লক্ষ কোটি টাকার বেশি অর্থ ঋণের বোঝা নিয়ে পথচলা শুরু করেছে নতুন সরকার। কাঁধে এই বাড়তি বোঝা নিয়ে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের জন্য বাড়তি খরচের চাপ সামলানো মুখের কথা নয়। ফলে বিহার, মধ্যপ্রদেশের মতো এরাজ্যও অসন্তোষের কথা জানিয়ে কেন্দ্রকে কোনো বার্তা দেয় কি না— সেটাই দেখার। শোনা যাচ্ছে, এই প্রকল্প নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আদালতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে কংগ্রেস শাসিত রাজ্য তেলেঙ্গানা। তাতেও কোনো লাভ হবে কি না— তাও দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ফলে ১০০ দিনের পরিবর্তে ১২৫ দিন নিশ্চিত কাজের বিষয়টি যতটা আশা জাগিয়েছিল তার সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ