২০১৪ সালে কংগ্রেসকে দিল্লির কুরসি হারাতে হয়েছিল কেন? প্রধান ইস্যু ছিল দুর্নীতি। নরেন্দ্র মোদিকে সামনে রেখে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অল আউট খেলার অঙ্গীকার করেছিল বিজেপি। তাদের তরফে আরো দাবি করা হয়েছিল, ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে বিজেপি এক অন্যরকম দল—পার্টি উইথ আ ডিফারেন্স। মানুষ গেরুয়া শিবিরের কথা বিশ্বাস করেছিল। তাদের উপর ভরসা রেখেছে উপর্যুপরি তিনবার। দেশবাসী আরো মনে করতে পারেন, মোদি বারবার মন্তব্য করেছেন, ‘না খায়ুঙ্গা না খানে দুঙ্গা’। কিন্তু বিজেপি নেতৃত্বের এই লম্বা-চওড়া দাবির সঙ্গে আমাদের অভিজ্ঞতার মিল সামান্যই। ভগবান রামচন্দ্র সকলের। কিন্তু বিজেপি তাঁর রাজনীতিকরণ করেছে। তাঁর কাঁধে ভর দিয়ে কেন্দ্রে এবং রাজ্যে রাজ্যে ক্ষমতা দখল করেছে গেরুয়া শিবির। অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ কর্মসূচিকে সামনে রেখেই এই দলের অত্যাশ্চর্য বিস্তারলাভ। আর সেই রামমন্দিরেই পড়েছে চোর লুটেরাদের হাত! বিপুল নগদ, এমনকি রামলালার গয়নাও চুরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বুলডোজার বাবার রামরাজ্যে এই অভূতপূর্ব কেলেঙ্কারি নিয়ে দেশ যখন তোলপাড় তখনই সামনে এসেছে বিজেপি-শাসিত মধ্যপ্রদেশের একাধিক কেলেঙ্কারি। মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব ফেঁসে গিয়েছেন জমি দুর্নীতিতে। এছাড়া অভিযোগ উঠেছে মোদি মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ভগীরথ চৌধুরীর নামেও। তিনি কৃষিমন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী। কৃষিমন্ত্রকের একটি প্রকল্পের ভরতুকির টাকা তিনি নিজের ফার্মকে পাইয়ে দিয়েছেন!
এবার সামনে এল খোদ দিল্লির এক ঘন কালো ছবি। দিল্লি সরকারের অধীনস্ত হাসপাতালগুলিতে বেড রয়েছে ১৫ হাজারের মতো। কিন্তু সেগুলির জন্য চাদর কেনা হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৬ লক্ষ! তাও আবার দেড়শো টাকার চাদর কেনা হয়েছে সাড়ে চারশোয়! অর্থাৎ চাদরে রহস্য একটি নয়, একজোড়া। রহস্যে যতি পড়েনি এখানে, আছে আরো। বাজারে এক প্যাকেট ওআরএস যখন ১৫ টাকায় মেলে তখন এই সরকার সেটি কিনেছে ২০৫ টাকা দরে। তাও আবার ‘আইনমাফিক’ টেন্ডার ডেকে। একটি পোর্টেবল এক্স-রে মেশিনের বাজার দর ১০ লক্ষ টাকার মতো। কিন্তু দিল্লি সরকারের সেন্ট্রাল প্রোকিয়োরমেন্ট এজেন্সি সেটাই কিনেছে ৩৩ লাখে! এমন অবশ্য এক-আধটা নয়, কেনা হয়েছে ৪৪৮টি। ফলে ৪৫ কোটির জায়গায় দাম মেটানো হয়েছে ১৪৮ কোটি টাকা। রেডিয়োলজিক্যাল যন্ত্রের বাজার দর ২৫ লক্ষ টাকা। সেটি কিনতে এই দরাজ দিল সরকার গুনেছে ১ কোটি ১০ লক্ষ টাকা! তাহলে দিল্লি সরকার সামান্য জোড়া রহস্য উপহার দিয়ে ক্ষান্ত হয়নি, লম্বা হাতে গেঁথেছে রহস্যের মালা! খোদ ভিজিল্যান্স তদন্তে উঠে এসেছে এই দুর্নীতি তথ্যাদি। দিল্লি পুলিশের দুর্নীতিদমন শাখা রবিবার একাধিক সরকারি কর্তাকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁরা দিল্লি সরকারের স্বাস্থ্যদপ্তরের অন্যতম মাথা।
স্বভাবতই এই ইস্যুতে আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ বিরোধী দল আম আদমি পার্টি। আপ নেতা সৌরভ ভরদ্বাজের বক্তব্য, ‘২৭ বছর পর দিল্লিতে ক্ষমতায় আসার প্রথম বছরেই বিজেপি সুদে-আসলে ক্ষতিপূরণ উশুল করতে নেমে পড়েছে।’ ভরদ্বাজের আরো অভিযোগ, ‘গতবছর দিল্লির সরকারি হাসপাতালগুলির চিকিৎসা উপকরণ ক্রয়ের সব অধিকার বন্ধ করে দেয় বিজেপি সরকার। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, চিকিৎসা সংক্রান্ত যেকোনো উপকরণ একমাত্র সেন্ট্রাল প্রোকিয়োরমেন্ট এজেন্সিই কিনবে। নিজেদের পছন্দমতো একজন ডিরেক্টর জেনারেল অব হেলথ সার্ভিস নিয়োগ করা হয়। আর তারপরই শুরু হয় লুটপাট। মাত্র ১৬ মাসে এই সরকার ৬৫০ কোটি টাকার মেডিকেল কেলেঙ্কারি উপহার দিয়েছে।’ পালটা দাবি অবশ্য বিজেপির, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপ সরকার কিছুই করেনি। বরং আমাদের সরকার এই অনিয়ম জানামাত্রই ব্যবস্থা নিয়েছে। গ্রেপ্তারও করা হয়েছে অভিযুক্তদের।’ বিজেপি যে দাবিই করুক না কেন, এই মারাত্মক দুর্নীতি দিল্লির বর্তমান সরকার এবং শাসক দলকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে। দিল্লির মতো একটি ক্ষুদ্র সরকারের অন্দরে সামান্য সময়েই এত কিছু ঘটে গেল! মুখ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রীরা কিছুই জানতে পারলেন না? এই দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য? প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণ কেনার ক্ষমতা সরকারি হাসপাতালগুলির কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার কী যুক্তি ছিল? এর পিছনে কোনো মতলব কাজ করেনি তো? আরো দুর্ভাগ্য—এই পঙ্ক্তিতে এসে বসেছে উত্তরপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র... একের পর এক ডবল ইঞ্জিন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। সৌজন্যে মেডিকেল দুর্নীতি এবং অবিকল কায়দা। এর জবাব ডবল ইঞ্জিনগুলিকেই দিতে হবে। এই সংস্কৃতি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ করতে হবে মোদি-শাহকেই। না-হলে তাঁদের প্রতিটি হুঁশিয়ারি, হুংকার ফাঁকা আস্ফালন হিসাবেই নিন্দিত হবে।