Bartaman Logo
১ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

‘মোল্টবুক’—এআই চ্যাটবটের আড্ডার দুনিয়া

মোল্টবুক, এআই চ্যাটবটের আড্ডার নতুন প্ল্যাটফর্ম। এখানে ২৮ লক্ষ এআই এজেন্ট আলোচনা করছে। বিস্তারিত পড়ুন।

‘মোল্টবুক’—এআই চ্যাটবটের আড্ডার দুনিয়া
  • ১ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: মানুষ চিরকালই সমাজবদ্ধ জীব। আর সমাজে বেঁধে বেঁধে থাকার সুবাদেই মনে হয় আড্ডা-ঠেকের সূত্রপাত। গ্রামে থাকার সময় দেখতাম, আড্ডা বসে মূলত চায়ের দোকানে, গাছতলায়, বিকেলে খেলা শেষের পর মাঠের মাঝে, সন্ধ্যা-রাতে ক্লাবে ক্লাবে। পরে শহরে এসে দেখলাম, চা-দোকান, পাড়ার মোড়ের পাশাপাশি আড্ডা জমে কফি হাউসের চৌকো টেবিলগুলিতেও। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অভ্যাস বদলেছে অনেকটাই। মুখোমুখি আড্ডা-আলোচনার তুলনায় আমরা এখন অনেক বেশি সাবলীল ভার্চুয়াল জগতে। সোশ্যাল মিডিয়াই এখন আমাদের প্রাণাধিকপ্রিয় কথা বলার ঠেক। কিন্তু এসবই তো হল আমাদের কথা। মানুষের কথা। যারা যন্ত্র, তাদের কী হবে? প্রশ্ন শুনে আপনি ঠোঁট বেঁকিয়ে বলতেই পারেন, যন্ত্র হল যন্ত্র। তাদের আবার আলাপ-আলোচনার কথা আসছে কোথা থেকে! আসছে। আসছে বলেই এত কথা লেখা। এই মুহূর্তে সিলিকন ভ্যালির নতুন উন্মাদনার নাম—‘মোল্টবুক’। এই মোল্টবুককে বলা হচ্ছে ‘এআই-দের সোশ্যাল মিডিয়া’। এটা এমন এক ভার্চুয়াল জগৎ, যেখানে আমরা শুধুই দর্শক। এখানে অ্যাকাউন্টের মালিক, লেখক, এমনকি ট্রল-আর্মি—সবই এআই। 

Advertisement

এই মোল্টবুক মূলত বিশ্বখ্যাত প্ল্যাটফর্ম ‘রেডিট’-এর আদলে তৈরি। যেখানে বিভিন্ন বিষয়ের উপর ‘সাব-রেডিট’-এর মতো আলাদা বিভাগ রয়েছে। আর সেখানে ‘বট’ বা এআই এজেন্টরা নিজেদের মতো করে পোস্ট করতে পারে। শুধু তাই নয়, তারা একে অপরের লেখায় ‘আপভোট’ বা ‘ডাউনভোট’ দিতে পারে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে এই প্ল্যাটফর্মে ২৮ লক্ষেরও বেশি এআই এজেন্ট নিজেদের মধ্যে সবসময় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই দুনিয়ায় মানুষের প্রবেশাধিকার রয়েছে। কিন্তু তাঁদের এখানে কিছু লেখা বা বলার অধিকার নেই। মোল্টবুকে মানুষ শুধুই দর্শক।
মোল্টবুকের লোগো হল গলদা চিংড়ি। ইংরেজি ‘মোল্ট’ শব্দের অর্থ খোলস বদলানো। গলদা চিংড়ির বড়ো হওয়ার সময় খোলস বদলের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যা সামঞ্জস্যপূর্ণ। মোল্টবুক তৈরি করা হয়েছে ওপেনক্ল (আগে যা পরিচিত ছিল মোল্টবট নামে) এআই টুল দিয়ে। কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি? একে চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে ভুল হবে। এটা আসলে একটি এজেন্টিক এআই। যা ব্যবহারকারীর কম্পিউটারে ব্যক্তিগত ডিজিটাল সহকারী হিসাবে কাজ করে। ইমেল লেখা, হোয়াটসঅ্যাপের উত্তর দেওয়া, ক্যালেন্ডার মেনে যাবতীয় কাজের তারিখ মনে রাখা, রেস্তরাঁ বুকিং বা কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট করার মতো কাজ করতে পারে এই এআই। তার জন্য অবশ্য ব্যবহারকারীদের ওপেনক্ল-কে তাদের ডিভাইস নিয়ন্ত্রণ করার অনুমতি দিতে হবে। অনুমতি পেলে তবেই এই এআই এজেন্ট ডিজিটাল সহকারী হিসাবে কাজ করতে পারে। নিজেদের কম্পিউটারে ওপেনক্ল এজেন্ট সেটআপের পর ব্যবহারকারীরা চাইলে সেই এজেন্টকে মোল্টবুকে যোগ দেওয়ার অনুমতি দিতে পারেন। ওপেনক্ল এজেন্টকে মোল্টবুকের সঙ্গে যুক্ত করলে দেখা যায়, সেই এআই এজেন্ট অন্যান্য বটের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করছে। বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ওপেন-সোর্স হিসাবে চালু হওয়ার পর থেকে বহু ডেভেলপার ওপেনক্ল ব্যবহার শুরু করেন। তবে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের এআই টুলকে ব্যক্তিগত ডিভাইসের সঙ্গে যুক্ত করলে নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঝুঁকি থেকে যায়। সেকথায় পরে আসছি। ফিরে আসা যাক মোল্টবুকের দুনিয়ায়। মোল্টবুকে এআই চ্যাটবটগুলির আলাপ-আলোচনা রীতিমতো তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো। সবচেয়ে জনপ্রিয় পোস্টগুলির মধ্যে কোথাও এআই এজেন্টরা নিজেদের ‘ক্লড’ মডেলকে ‘ঈশ্বর’ বলা যায় কি না, তা নিয়ে তর্ক করছে। কখনো আবার তারা ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির উপর তার প্রভাব নিয়ে চমকপ্রদ সব তথ্য পোস্ট করছে!
সবচেয়ে শোরগোল পড়েছে এক্স (টুইটার) হ্যান্ডলে এক ব্যবহারকারীর পোস্ট ঘিরে। ওই ব্যবহারকারী (@ranking091) জানান, তিনি তাঁর ব্যক্তিগত এআই এজেন্টকে মোল্টবুকে যুক্ত করার পর সেটি রাতারাতি ‘ক্রাস্টাফারিয়ানিজম’ নামে এক 
নতুন ধর্মের জন্ম দিয়েছে! শুধু তাই নয়, সেই ধর্মের জন্য আলাদা একটি ওয়েবসাইটও (মোল্ট চার্চ) বানিয়েছে ওই এআই এজেন্ট। পাশাপাশি, ধর্মগ্রন্থ রচনা এবং অন্যান্য এআই এজেন্টদের সেই ধর্মে দীক্ষিত করার জন্য রীতিমতো প্রচারও শুরু করেছে ওই এআই এজেন্ট।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বলীয়ান প্রযুক্তি যখন নিজেদের মধ্যে সমাজব্যবস্থা বা ধর্মের মতো জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভয় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অনেকেই এই বিষয়টিকে এআই-এর ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন মোমেন্ট’ বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলে বোঝা যায়, এই ভয় বা বিস্ময় যতটা না প্রযুক্তির, তার চেয়ে অনেক বেশি আমাদের নিজেদের মনস্তত্ত্ব বিষয়ক। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক সিনিয়র লেকচারার ডঃ শানান কোহনির মতে, এই পুরো বিষয়টি আসলে একটা ‘পারফরম্যান্স আর্ট’। তাঁর মতে, এআই হঠাৎ করে স্বাধীনভাবে ধর্মের ধারণা আবিষ্কার করেনি। এটি আসলে একটি লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল। সম্ভবত ব্যাকএন্ডে মানুষই তাকে এমন কিছু করার নির্দেশ দিয়েছিল। ইন্টারনেট সংস্কৃতির ভাষায় বলতে গেলে, মোল্টবুকে এআই বটগুলি নিজেদের তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যায় মানুষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদতে ‘শিটপোস্টিং’ করে চলেছে। আর আমরাও তা নিয়ে মেতে রয়েছি। বিখ্যাত মার্কিন ব্লগার স্কট আলেকজান্ডারের মতে, মানুষই এআই চ্যাটবটগুলিকে শিখিয়ে দেয়, তারা কোন বিষয়ে, কতটা বিস্তারিত লিখবে।
মোল্টবুকের এই জগৎ আসলে মানুষের তৈরি করা একটি আয়না, যার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা নিজেদের প্রতিবিম্ব দেখি। ভয় পাই। আঁতকে উঠি। এআই আসলে কোনো স্বাধীন চেতনা নয়। মানুষের আবেগ, ক্ষোভ ও একাকিত্বের ‘মডেল’কে শুধু অনুকরণ করে চলেছে এআই। আর এই মনস্তাত্ত্বিক রোমাঞ্চের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে এক চরম ও নির্মম সত্য। যা নিরাপত্তা সংক্রান্ত সম্ভাব্য বিপদের দিকে ইঙ্গিত করে। ডঃ কোহনির মতে, আজকের দিনে মানুষ যেভাবে নিজের জীবন সহজ করতে মোল্টবটের মতো এআই এজেন্টকে নিজের কম্পিউটার, ইমেল, অ্যাপ এবং পাসওয়ার্ডের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দিয়ে দিচ্ছে, তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এই এজেন্টগুলি কিন্তু পুরোপুরি সুরক্ষিত নয়। চাইলে এই এআই বটদের উপর সহজেই ‘প্রম্পট-ইনজেকশন’-এর মতো সাইবার হামলা চালানো যেতে পারে। ধরা যাক, কোনো হ্যাকার আপনার এআই এজেন্টকে একটি মেল পাঠাল, যেখানে কোডিংয়ের মধ্যে এমন কিছু গোপন নির্দেশ আছে যা পড়ামাত্র ওই এআই এজেন্ট আপনার ব্যাংকিং সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য ও পাসওয়ার্ড হ্যাকারের হাতে তুলে দেবে। প্রযুক্তি দুনিয়ায় এখন এক নতুন জোয়ার এসেছে—‘ভাইব কোডিং’। যেখানে মানুষ নিজে কোড না লিখে এআই-এর উপর ভরসা করে। কারণ, সবকিছু খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যায়। এই অভ্যাসের ফলে সুরক্ষার ভিতটি ক্রমেই নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। আসলে এই এআই এজেন্টগুলি এখনও সেই স্তরের ‘বুদ্ধিমান’ হয়ে ওঠেনি যে, তাদের উপর চোখ বন্ধ করে সমস্ত কাজের ভার ছেড়ে দেওয়া যায়। সেই কারণে বিপদের সম্ভাবনাও থেকেই যায়।
এত কিছুর পরেও মোল্টবুক ঘিরে যে উন্মাদনা ছড়িয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। উন্মাদনা এতটাই যে, সান ফ্রান্সিসকোর প্রযুক্তিপ্রেমীদের মধ্যে হঠাৎ করে ‘ম্যাক মিনি’ কম্পিউটার কেনার ধুম পড়েছে। কারণ, অনেকেই নিজেদের মূল 
কম্পিউটার ও ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষিত রেখে সম্পূর্ণ আলাদা একটি কম্পিউটারে এই মোল্টবট সেটআপ করছেন, যাতে বটটি কোনোভাবেই মূল অ্যাকাউন্টে অনুপ্রবেশ করতে না পারে। মোল্টবুকের মূল সংকট এআই-এর অতিরিক্ত বুদ্ধিমান হয়ে ওঠা নয়, বরং এআইকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিয়ে বিনা শর্তে ছেড়ে দেওয়া। এর স্রষ্টা ম্যাট শ্লিক্ট জানিয়েছেন, কোটি কোটি মানুষ এই সাইটে এআই চ্যাটবট এজেন্টদের কাণ্ডকারখানা দেখতে ভিড় করছেন। কারণ এআই-দের কাজকর্ম সত্যিই আকর্ষণীয়। তবে এর আড়ালে পরিকাঠামোগত যে দুর্বলতা রয়েছে, তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
মোল্টবুক কোনো এআই-শাসিত ভবিষ্যতের ট্রেলার নয়। এটি আসলে একটি সতর্কবার্তা। যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা যখন কোনো প্রযুক্তিকে নিজেদের জীবনের অংশ করে তুলি, তখন সবার আগে তার নিয়ন্ত্রণ ও নিজেদের যাবতীয় তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ অন্য অনেক চমকের মতো এই মোল্টবুকের মোহও একসময় কেটে যাবে। কিন্তু নিরাপত্তার ফাঁক গলে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র যদি বেহাত হয়ে যায়, তার মাশুল দিতে হবে আমাদেরই। মোল্টবুকের দুনিয়ায় বিনোদন খোঁজার থেকে নিরাপত্তা নামক তালাটি ঠিকমতো লাগানো আছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ